আমেরিকা আবিষ্কার বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এর মাধ্যমে একদিকে ইউরোপীয়রা বুঝতে পারল পুরনো জ্ঞানের চেয়ে নতুন পর্যবেক্ষণ বেশি জরুরি, অন্যদিকে এই নতুন দেশটাকে ভালো করে জানার প্রবল ইচ্ছা জাগল তাদের মধ্যে। নতুন পাওয়া এই জায়গাটাকে যদি দখলে রাখতে হয়, তাহলে সেই জায়গাটার সম্পর্কে যত বেশি সম্ভব তথ্য জোগাড় করা দরকার। সেখানকার ভূতত্ত্ব, জলবায়ু, গাছপালা, জীবজন্তু, সেখানকার মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস- সব। খ্রিস্টীয় ধর্মগ্রন্থ, ভূগোলের পুরনো বই আর মানুষের মুখে মুখে শোনা গল্প- সব সেখানে অচল।
এরপর থেকে ইউরোপে শুধু ভূগোলবিদ নয়, বিজ্ঞানের সকল শাখার মানুষই তাদের আঁকা মানচিত্রের অজানা অংশটা ফাঁকা রাখতে শুরু করে। তাদের জ্ঞান যে সম্পূর্ণ নয়, তাদের জানার বাইরেও যে আরও কিছু থাকতে পারে- সেটা তারা স্বীকার করে নিতে শুরু করল।
সেই সময় থেকেই মানচিত্রের ফাঁকা জায়গাগুলো ইউরোপের মানুষকে চুম্বকের মতো টানতে থাকে। এই ফাঁকা মানচিত্র পূরণ করার জন্য ইউরোপ থেকে নৌবহর গেল আফ্রিকায়, প্রশান্ত মহাসাগর পার হয়ে ভারত মহাসাগরে, আর সারা পৃথিবীতে নিজেদের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করল। তারাই প্রথম সারা বিশ্ব জুড়ে সাম্রাজ্য তৈরি করে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে শুরু করে। ইউরোপীয় মানুষের এইসব সাম্রাজ্যবাদী অভিযানের ফলেই সারা পৃথিবীর নানা জায়গার বিচ্ছিন্ন মানবগোষ্ঠীগুলো মিলে একটা মানবজাতিতে পরিণত হলো, আর সেখান থেকেই বদলে গেল পৃথিবীর ইতিহাস।

ইউরোপীয়দের এই নতুন জায়গা আবিষ্কার করতে গিয়ে সেটা দখল করে আসার পদ্ধতিটা আমাদের এত পরিচিত যে সেটাকে আমাদের অস্বাভাবিক বলে মনেই হয় না। কিন্তু এরকম ঘটনা এর আগে কখনোই ঘটেনি। এত দূরে দূরে গিয়ে দেশ দখল করাটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। আসলে ইতিহাসের শুরু থেকেই মানুষ নিজের এলাকার যুদ্ধবিগ্রহ নিয়ে এত ব্যস্ত ছিল যে দূরের দেশ জয় করার কথা তাদের মাথায়ই আসেনি। বেশিরভাগ বড় সাম্রাজ্যই কেবল তাদের আশপাশের এলাকাগুলো দখল করে করে বড় হয়েছে। এইজন্য রোমানরা রোমকে রক্ষা করার জন্য ইত্রুরিয়া (Etruria) দখল করে (খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০-৩০০), তারপর ইত্রুরিয়াকে বাঁচাতে দখল করে পো উপত্যকা (খ্রিস্টপূর্ব ২০০), তারপর সেটাকে বাঁচানোর জন্য প্রোভেন্স (খ্রিস্টপূর্ব ১২০), প্রোভেন্সকে বাঁচাতে গল (খ্রিস্টপূর্ব ৫০) আর গলকে রক্ষা করতে তারা ব্রিটেন দখল করে (৫০ খ্রিস্টাব্দ)। এভাবে রোম থেকে লন্ডন পর্যন্ত সাম্রাজ্যবিস্তার করতে তাদের সময় লাগে চারশ বছর। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ সালে কোনো রোমান ভাবেনি যে জাহাজে করে সোজা ব্রিটেন গিয়ে জায়গাটা দখল করে ফেলা যায়।
অনেক সময় অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী সম্রাট দূরের দেশ জয় করতে যেতেন, কিন্তু তার উদ্দেশ্য হতো পুরোপুরি বাণিজ্যিক কিংবা শুধুই জায়গা দখল করা। সম্রাট মহান আলেকজান্ডার কিন্তু নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেননি, জোরপূর্বক পারস্যের শাসনক্ষমতা দখল করেছেন কেবল। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের পূর্বসূরী প্রাচীন অ্যাথেন্স ও কার্থেজ (Athens and Carthage), কিংবা মধ্যযুগের ইন্দোনেশিয়া এলাকার মাজাপাহিতের (Majapahit) ইতিহাসে দেখা যায়, এই তিনটা সমুদ্রভিত্তিক সাম্রাজ্যের মানুষেরা কখনও অচেনা সমুদ্রের দিকে যেত না। তারা আশেপাশের এলাকায় যেটুকু অভিযান চালিয়েছে সেটা পরবর্তী সময়ে ইউরোপ যা করেছে তার তুলনায় কিছুই না।
অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, চীনের মিং সাম্রাজ্য থেকে অ্যাডমিরাল ঝেং হে (Zheng He) যেসব অভিযান চালিয়েছিলেন সেগুলো ইউরোপীয়দের অভিযানগুলোকেও ম্লান করে দিতে পারে। ১৪০৫ থেকে ১৪৩৩ সালের মধ্যে ঝেং সাতটা বিশাল নৌবহর নিয়ে ভারত মহাসাগরের অনেক দূর পর্যন্ত যান। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বহরে প্রায় তিনশ জাহাজ ছিল, আর তাতে মানুষ ছিল ৩০ হাজারের মতো।৭ অনেক জায়গা ঘুরেছিল সেসব জাহাজ- ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত, পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর আর পূর্ব আফ্রিকা। সেসব জাহাজ নোঙর ফেলেছিল হেজাজ (Hejaz) বন্দরের প্রধান প্রবেশপথ জেদ্দায় (Jedda) আর কেনিয়ার উপকূলের মালিন্দিতে (Malindi)। এদিকে কলম্বাসের ১৪৯২ সালের অভিযানে ছিল তিনটা ছোট জাহাজ আর তাতে ১২০ জন মানুষ। ঝেং এর বহরের তুলনায় সেটা অনেকটা একদল ড্রাগনের সামনে তিনটা মশার মতো।৮
কিন্তু এর চেয়েও বড় একটা পার্থক্য ছিল। ঝেং কেবল সমুদ্রে সমুদ্রে ঘুরেছেন, দেশ দখল করার কোনও চেষ্টাই করেননি। তাছাড়া তাঁর অভিযানের পিছনে কোনও রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কারণও ছিল না। অভিযান চলাকালে ১৪৩০ এ যখন চীনের শাসক বদলায়, তখন নতুন রাজা এসেই ঝেং এর অভিযান বাতিল করে দেন। অভিযান ভেস্তে গেলে মানুষেরা নানা দিকে চলে যায়, আর তাদের জোগাড় করা বিপুল পরিমাণ তথ্যও হারিয়ে যায়। অত বড় নৌবহর চীনের কোনো বন্দর থেকে আর কখনও বের হয়নি। এর পরে যত রাজা বসেছেন চীনের সিংহাসনে, তাঁদের কেউই আর এসব নিয়ে মাথা ঘামাননি।