১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই নিল আর্মস্ট্রং আর বাজ অলড্রিন চাঁদের মাটিতে পা রাখেন। এই চন্দ্রাভিযানের কয়েক মাস আগে থেকেই অ্যাপোলো ১১ এর যাত্রীরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমের এক মরুভূমিতে। সেখানে তখন কিছু আদিবাসীর বসবাস ছিল। ওখানকার এক বাসিন্দার সাথে নভোচারীদের কিছু কথাবার্তা হয়েছিল বলে শোনা যায়।
একদিন প্রশিক্ষণের সময় নভোচারীদের সাথে এক আদিবাসী বৃদ্ধের দেখা হয়। বৃদ্ধ নভোচারীদের কাছে জানতে চাইলেন তাঁরা ওখানে কী করছেন। উত্তরে তাঁরা বললেন কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা চাঁদে যাবেন। বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তাঁদেরকে একটা কাজ করে দিতে অনুরোধ করলেন।
“কী কাজ?”, জানতে চাইলেন নভোচারীরা।
“আমাদের গোত্রের লোকেরা বিশ্বাস করে দেবতারা চাঁদে থাকেন। তাই ভাবছি আপনাদের দিয়ে তাঁদের কাছে একটা বার্তা পাঠানো যায় কি না।”
“বলুন, কী আপনার বার্তা?”
বৃদ্ধ তাঁর নিজের ভাষায় কিছু একটা বলে সেটা নভোচারীদের দিয়ে কয়েকবার বলিয়ে নিশ্চিত করলেন যে তাঁদের সেটা মুখস্থ হয়েছে।
“এর অর্থ কী?”, জানতে চাইলেন একজন।
“সেটা তো বলা যাবে না। এটা আমাদের গোপন ভাষা, শুধু আমরা জানি আর দেবতারা জানেন।”
নভোচারীরা ক্যাম্পে ফিরে ওই অনেক খুঁজে ওই ভাষা বুঝতে পারে এমন একজনকে খুঁজে বের করলেন। তাকে বৃদ্ধের শিখিয়ে দেওয়া কথাটা অনুবাদ করে দিতে বললে লোকটা হাসতে শুরু করে। হাসি থামলে লোকটা তাঁদের কথাটা বুঝিয়ে দেয়। এত কষ্ট করে তাঁরা যে কথাটা মুখস্থ করে এসেছেন, তার অর্থ হল, “এরা যা বলছে তার একটা কথাও বিশ্বাস কোরো না, এরা আসলে তোমাদের দেশ দখল করতে এসেছে।”
ফাঁকা মানচিত্র
পৃথিবীর বিভিন্ন সময়ে আঁকা মানচিত্র দেখলে এই ‘আবিষ্কার এবং জয়’ করার ব্যাপারটা ভালোভাবে বোঝা যায়। এই আধুনিক যুগ আসার অনেক আগে থেকেই পৃথিবীর নানা জায়গার মানুষ মানচিত্র এঁকেছে। তবে তাদের কেউই পুরো পৃথিবীর কোথায় কী আছে জানত না। আফ্রো-এশিয়া এলাকার মানুষ আমেরিকার কথা জানত না, আমেরিকার মানুষ আফ্রো-এশিয়া অঞ্চলের কথা জানত না। তাই তাদের মানচিত্রের অজানা অংশটুকু হয় থাকতই না, নয়তো সেখানে কাল্পনিক কোনো কিছুর ছবি আঁকা থাকত। মানচিত্রে কোনো জায়গা ফাঁকা থাকত না। তাই সেটা দেখে মনে হতো পৃথিবীর কোথায় কী আছে সবটাই তাদের জানা।
পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপীয় মানুষেরা যেসব মানচিত্র এঁকেছিল সেগুলোতে অনেক ফাঁকা জায়গা দেখা যেত। এর মধ্যে একদিকে যেমন তাদের বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি তাদের সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাধারাও ফুটে ওঠে। এসব মানচিত্রের ফাঁকা জায়গাগুলো প্রমাণ করে, ইউরোপীয়রা পৃথিবীর সবটুকু তখনও দেখেনি।
১৮৯২ সালে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। ক্রিস্টোফার কলম্বাস তখন স্পেন থেকে পূর্ব এশিয়ায় যাওয়ার জন্য পশ্চিম দিকে যাত্রা করলেন। তিনি তখনও পুরনো অসম্পূর্ণ মানচিত্রকেই ঠিক জানতেন। সেই মানচিত্র অনুযায়ী তিনি হিসাব করে বের করলেন, জাপান স্পেন থেকে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার পশ্চিমে। কিন্তু আসলে দূরত্বটা ২০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি, আর মাঝখানে রয়েছে একটা বিরাট ভূখণ্ড যেটার কথা তখনও কেউ জানত না। ১৪৯২ এর ১২ অক্টোবর দুপুর দুটোর দিকে কলম্বাসের নৌবহর সেই ভূখণ্ডে পৌঁছায়। বহরের ‘পিন্টা’ নামের জাহাজের মাস্তুল থেকে নাবিক হুয়ান রদ্রিগেজ বার্মেজো একটা দ্বীপ দেখে “ডাঙা! ডাঙা!” বলে চেঁচিয়ে ওঠে। সেই দ্বীপটাকে আজ আমরা বাহামা নামে জানি।
কলম্বাসের ধারণা ছিল ওটা পূর্ব এশিয়ার কোনো দ্বীপ। তিনি ঐ দ্বীপের মানুষদের বললেন ‘ইন্ডিয়ান’, কারণ তাঁর ধারণা হয়েছিল জায়গাটা হচ্ছে ‘ইন্ডিজ’- যাকে আমরা এখন ইস্ট ইন্ডিজ বা ইন্দোনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জ বলি। কলম্বাস তাঁর বাকি জীবন এই ভুলের মধ্যেই কাটিয়েছেন। তিনি যে একেবারে নতুন একটা মহাদেশ খুঁজে পেয়েছেন সেটা তাঁর বা তাঁর সময়ের লোকেদের মাথাতেই আসেনি। হাজার হাজার বছর ধরে চিন্তাবিদ, পণ্ডিত, এমনকি ধর্মগ্রন্থগুলোও শুধু ইউরোপ, এশিয়া আর আফ্রিকার কথাই বলে এসেছে। বাইবেল কি আর অর্ধেকটা পৃথিবীর কথা বেমালুম বাদ দিয়ে দিতে পারে? ধরুন ১৯৬৯ সালে চাঁদের দিকে পাঠানো অ্যাপোলো ১১ গিয়ে নামল পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরে চলা অন্য একটা উপগ্রহে যেটা কেউ এতদিন দেখেইনি। তারা কি বুঝতে পারত যে ওটা চাঁদ নয়? মধ্যযুগের মানুষ কলম্বাসের ধারণা ছিল পৃথিবীর সবটাই তাঁর চেনা, যদিও তিনি নিজেই একটা আস্ত অজানা মহাদেশ আবিষ্কার করে বসে আছেন!

ইতালির নাবিক আমেরিগো ভেসপুচি (Amerigo Vespucci) ১৪৯৯ থেকে ১৫০৪ সালের মধ্যে বেশ কয়েকবার আমেরিকা অভিযানে যান। ১৫০২ আর ১৫০৪ সালে এসব অভিযান নিয়ে ইউরোপে প্রকাশিত দুটি লেখায় ভেসপুচির কথা বলা হয়। সেখানে বলা হয়, কলম্বাস যে নতুন দেশটা আবিষ্কার করেছেন সেটা পূর্ব এশিয়া তো নয়ই, বরং সেটা নতুন একটা মহাদেশ যার কথা তখনকার কোনো ভূগোলবিদ জানতেন না, কোনো ধর্মগ্রন্থেও নেই। এই লেখায় প্রভাবিত হয়ে ১৫০৭ সালে প্রসিদ্ধ মানচিত্র-আঁকিয়ে মার্টিন ওয়াল্ডসিমুলার (Martin Waldseemüller) পৃথিবীর একটা নতুন মানচিত্র আঁকেন। ইউরোপ থেকে পশ্চিমে গেলে মানুষ যেখানে পৌঁছায়, ওয়াল্ডসিমুলারের মানচিত্রে প্রথমবারের মতো সেটাকে একটা আলাদা মহাদেশ হিসেবে দেখানো হয়। এখন মানচিত্রে যেহেতু জায়গাটা দেখানো হয়েছে, তখন তার একটা নাম তো দেওয়া লাগে। ওয়াল্ডসিমুলার জানতেন যে জায়গাটা আমেরিগো ভেসপুচির আবিষ্কার, তাই তিনি জায়গাটার নাম দিয়ে দিলেন ‘আমেরিকা’। তাঁর সেই মানচিত্র সারা পৃথিবীতে অনেক জনপ্রিয়তা পায়, অন্যান্য মানচিত্র-আঁকিয়েরা সেটা থেকেই আরও মানচিত্র আঁকে। তাই নতুন মহাদেশের আমেরিকা নামটাই টিকে গেল। পৃথিবীর ভূখণ্ডের প্রায় চারভাগের একভাগ, সাত মহাদেশের মধ্যে দুটোর নামকরণ হল এমন একজন স্বল্প-পরিচিত ইতালীয় নাবিকের নামে, যার মধ্যে ‘জানি না’ বলার মতো সাহসটুকু ছিল।