কিসের জোরে ইউরোপ একেবারে শুরুতেই বাকি পৃথিবীর দখল নিয়ে নিল? যে সম্ভাবনাটা প্রথমে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, সেটা কী ছিল? এই প্রশ্নের দুরকম উত্তর পাওয়া যায়- একটা হল আধুনিক বিজ্ঞান, অন্যটা পুঁজিবাদ। ইউরোপীয়দের চিন্তা আর আচরণে বিজ্ঞানমনস্কতার ছাপ পড়েছে এই অগ্রগতি শুরু হওয়ার অনেক আগে। তাই যখন তাদের হাতে নতুন নতুন প্রযুক্তি আসা শুরু হল, সেগুলোকে কাজে লাগাতে তাদের সময় লেগেছে অনেক কম। ইউরোপীয় সাম্রাজ্য যে একুশ শতকের পৃথিবীর বিজ্ঞান আর পুঁজিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সেটা মোটেই কাকতালীয় ব্যাপার নয়। সেই দুনিয়াজোড়া ইউরোপীয় সাম্রাজ্য আজ নেই, কিন্তু বিজ্ঞান আর পুঁজিবাদের বিস্তার কিন্তু থেমে নেই। পুঁজিবাদের ব্যাপারে পরের অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে, আপাতত ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ আর আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যেকার নিবিড় সম্পর্কটা আরেকটু ভালোভাবে দেখা যাক।
জয়ের তাড়না
আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশ হয়েছে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের হাত ধরেই। হ্যাঁ, এর মধ্যে গ্রিস, চীন, ভারত আর মুসলিমদের প্রচুর অবদান আছে বটে, কিন্তু বিজ্ঞান তার বর্তমান অবস্থায় এসেছে স্পেন, পর্তুগাল, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া আর নেদারল্যান্ডের সাম্রাজ্যবিস্তারের মাধ্যমেই। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের শুরুর দিকে চৈনিক, ভারতীয়, মুসলিম, আমেরিকান আর পলিনেশীয়দের সবাই অনেক কাজ করেছে। অ্যাডাম স্মিথ আর কার্ল মার্ক্স- দুজনেই মুসলিম অর্থনীতিবিদদের লেখা পড়েছেন। আমেরিকার আদিবাসী চিকিৎসকদের চিকিৎসা পদ্ধতি অনেক ইংরেজি বইয়ে জায়গা করে নিয়েছিল। পলিনেশীয়দের সংগৃহীত অনেক তথ্য পশ্চিমা নৃতত্ত্বের বইয়ে পাওয়া যায়। এতদিন ধরে যারা সারা পৃথিবীর সংগৃহীত জ্ঞান নিয়ে বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখা তৈরি করল তারাই বিংশ শতকের মাঝামাঝির দিকে পুরো পৃথিবী শাসন করতে লাগল। বড় বড় বিজ্ঞানীরাও বেরিয়ে এলেন তাদের মধ্য থেকেই। প্রাচ্যে আর মুসলিম বিশ্বেও জ্ঞানী মানুষের আবির্ভাব হয়েছে, কিন্তু ১৫০০ থেকে ১৯৫০ এর মধ্যে এসব এলাকা থেকে এমন কিছু আবিষ্কার হয়নি যা পদার্থবিজ্ঞানে নিউটনের কিংবা জীববিজ্ঞানে ডারউইনের অবদানের ধারে কাছে যেতে পারে।
এখান থেকে কেউ যেন না ভাবে যে ইউরোপীয়রা জন্মগতভাবেই বিজ্ঞানমনস্ক বা তাদের জিনের ভিতরেই এটা আছে। আবার এমনও নয় যে তারাই চিরকাল বিজ্ঞানের হাল ধরে থাকবে। ইসলাম ধর্ম যেমন শুরু হয়েছিল আরবদের মধ্যে কিন্তু পরে তুর্কি আর পারসিকদের হাতে চলে গেছে, ঠিক তেমনি বিজ্ঞানের শুরুটা ইউরোপে জোরেশোরে হলেও আজ সেটা সব জাতির মধ্যেই ছড়িয়ে গেছে।
আধুনিক বিজ্ঞান আর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের বন্ধনটা তৈরি হল কীভাবে? ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে প্রযুক্তি যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আধুনিক যুগের শুরুতে ততটা ছিল না। কিন্তু নতুন নতুন গাছপালা খুঁজে বেড়ানো একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী আর নতুন নতুন দেশ খুঁজে বেড়ানো একজন নাবিকের চিন্তাধারা ছিল একই রকম। “ওখানে কী আছে আমি এখনও জানি না”- এই কথাটায় তারা দুজনেই যার যার জায়গা থেকে একমত। তাই নতুন একটা জায়গায় যাওয়ার তাড়নাটা কারও মধ্যে কম ছিল না। নতুন কিছু জানার এই আগ্রহই আস্তে আস্তে পুরো পৃথিবীটাকে তাদের অধীনে এনে দিল।
ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদ ইতিহাসের অন্য সব সাম্রাজ্যবাদ থেকে আলাদা। এর আগে যারা সাম্রাজ্যবিস্তার করেছে তারা ধরেই নিত তারা পৃথিবীটাকে পুরো জেনে ফেলেছে। তারা কেবল নিজেদের মতাদর্শ অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে। আরবরা কিন্তু অজানাকে জানার আশায় মিশর, স্পেন বা ভারত জয় করেনি। রোমান, মোঙ্গল আর অ্যাজটেকরা নতুন জায়গা জয় করেছে শুধু ক্ষমতা আর সম্পদের জন্য। কিন্তু ইউরোপের মানুষ দূর দূরান্তে যাত্রা করেছে শুধু নতুন জায়গা খুঁজতে নয়, অজানাকে জানার জন্যও।
এমন চিন্তাধারা শুধু জেমস কুকের একারই নয়, পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীর স্পেনীয় আর পর্তুগিজ নাবিকদের মধ্যেও ছিল। পর্তুগিজ রাজপুত্র হেনরি (Prince Henry the Navigator) আর নাবিক ভাস্কো দা গামা আফ্রিকার তীর ধরে যাত্রায় অনেক দ্বীপ আর উপকূল জয় করেছেন। ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা ‘আবিষ্কার’ করার পরপরই সেখানে স্পেনের রাজার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান নতুন একটা পথ আবিষ্কার করে ফিলিপিন্সে পৌঁছে সেখানে স্পেনীয় উপনিবেশ তৈরি করেন।
এরপর যত দিন গেল, ততই জ্ঞানার্জনের অভিযান আর জয়ের অভিযান আরও বেশি পরস্পরের সাথে জড়িয়ে গেল। অষ্টাদশ আর ঊনবিংশ শতকে ইউরোপ থেকে যতগুলো সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে তার প্রায় প্রতিটাতেই বিজ্ঞানীদের সাথে নেওয়া হতো। যুদ্ধ করার জন্য নয়, নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য। ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন যখন মিশর আক্রমণ করেন, তখন তাঁর সাথে ১৬৫ জন পণ্ডিতও ছিলেন। সেই পণ্ডিতদের হাত ধরেই শুরু হল ‘মিশরবিদ্যা’ (Egyptology) নামক জ্ঞানের এক নতুন ধারা। ধর্ম, ভাষাবিজ্ঞান আর উদ্ভিদবিদ্যায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন তাঁরা।
১৮৩১ সালে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল, ফকল্যান্ড ও গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের মানচিত্র তৈরি করতে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজ এইচএমএস বিগল রওনা হয়। যুদ্ধের আগাম প্রস্তুতির জন্য ওখানে কোথায় কী আছে জানা দরকার ছিল। সে জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন শৌখিন বিজ্ঞানী। তিনি সাথে করে একজন ভূগোলবিদকে নিয়ে যেতে চাইলেন, নতুন যেসব ভূখণ্ড সামনে আসতে পারে সেগুলো খুঁটিয়ে দেখার জন্য। কয়েকজন ভূগোলবিদ তাঁর আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার পর তিনি গিয়ে ধরলেন কেমব্রিজ থেকে পাস করা এক বাইশ বছরের যুবককে। যুবকের নাম চার্লস ডারউইন। ডারউইন গির্জার পাদ্রি হওয়ার জন্য পড়াশোনা করলেও বাইবেলের চেয়ে ভূতত্ত্বেই তাঁর আগ্রহ বেশি ছিল। ক্যাপ্টেনের আমন্ত্রণে রাজি হলেন ডারউইন, এর পরেরটুকু তো ইতিহাস। জাহাজের ক্যাপ্টেন যখন সমুদ্রের মানচিত্র তৈরি করছিলেন, তখন ডারউইন তাঁর নিজের জোগাড় করা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে নতুন তত্ত্ব দাঁড় করাচ্ছিলেন, পরবর্তীতে যা বিবর্তনতত্ত্ব নামে পরিচিত হয়।
