ইউরেশিয়া অঞ্চলের সবচেয়ে দুর্বল অংশটার মানুষ কীভাবে পুরো পৃথিবীর দখল নিয়ে নিল? এর জন্য সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিতে হবে ইউরোপের বিজ্ঞানীদেরকেই। স্বীকার না করে উপায় নেই, ১৮৫০ এর পর থেকে ইউরোপের এই ক্ষমতাবৃদ্ধির পিছনে আছে তাদের সামরিক দক্ষতা, শিল্প ও বিজ্ঞানের বিকাশ এবং অবশ্যই তাদের প্রযুক্তির উন্নয়ন। আজকের যুগে সব দেশই প্রযুক্তির উন্নতির জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মনোযোগ দিচ্ছে। এসব গবেষণার প্রায় সবটাই চলছে নতুন অস্ত্র তৈরি করতে, নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার করতে কিংবা সাম্রাজ্যবাদের হাতকে আরও শক্তিশালী করার নতুন কোনো কৌশল সৃষ্টি করতে। আফ্রিকার মানুষের সাথে যখন ইউরোপের মানুষের যুদ্ধ চলছিল, তখন তারা একটা কথা প্রায়ই বলত, “শত্রু যেদিক থেকেই আসুক, আমাদের আছে মেশিনগান, ওদের তো সেটা নেই”। বেসামরিক প্রযুক্তির উন্নতিও তখন কম হয়নি। সৈন্যদের খাওয়ানোর জন্য খাবার টিনে ভরা শুরু হল, সৈন্যদের যাতায়াতের জন্য রেললাইন বসল, বড় বড় জাহাজ ভাসল সাগরে, আহত সৈন্যদের জন্য উন্নত চিকিৎসা আর ওষুধ আবিষ্কার হল। আফ্রিকা দখল করার পেছনে এসবের অবদান কিন্তু মেশিনগানের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।
১৮৫০ সালের আগে যুদ্ধ-শিল্প-বিজ্ঞান এই তিন দিকের কোনোটাতেই মানুষ খুব একটা উন্নতি করতে পারেনি। উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা মানুষ তখনও নিতে পারেনি, তাই ইউরোপ, আফ্রিকা আর এশিয়ার মধ্যে শক্তির পার্থক্য খুব বেশি ছিল না। আবার ১৭৭০ সালের কথা চিন্তা করলে দেখা যায়, ক্যাপ্টের কুক সামরিক শক্তিতে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু একই রকম শক্তি নিয়েও তখনকার চীন সাম্রাজ্যের ক্যাপ্টেন ওয়ান ঝেংসি কিংবা অটোমান সাম্রাজ্যের ক্যাপ্টেন হুসেন পাশা কেন অস্ট্রেলিয়া দখল করেনি? তার চেয়ে বড় কথা হল, ১৭৭০ সালে যে ইউরোপ প্রযুক্তির দিক থেকে মুসলিম, ভারতীয় বা চৈনিক সভ্যতার কাছাকাছি ছিল, পরের একশ বছরের মধ্যেই তারা এতটা এগোল কীভাবে?
যুদ্ধ-শিল্প-বিজ্ঞানের এই যৌথ বিকাশ ভারতে না হয়ে ইউরোপেই কেন হল? ব্রিটেন এগিয়ে যাবার পরপরই ফ্রান্স, জার্মানি আর যুক্তরাষ্ট্রও এগোতে শুরু করল, চীন পিছিয়ে থাকল কেন? যখন রাশিয়া, ইতালি আর অস্ট্রিয়া শক্তির পার্থক্যটা কমিয়ে আনছিল, তখন ইরান, মিশর আর অটোমান সাম্রাজ্য কোথায় ছিল? শিল্প বিপ্লবের প্রথম ধাপে যেসব প্রযুক্তি এসেছিল সেগুলো তো খুব জটিল ছিল না, তাহলে চৈনিক বা অটোমান প্রকৌশলীরা বাষ্প ইঞ্জিন, মেশিনগান আর রেলগাড়ির মতো কিছু আবিষ্কার করতে পারল না কেন?
বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক রেলপথ চালু হয় ব্রিটেনে, ১৮৩০ সালে। ১৮৫০ সালের মধ্যে পশ্চিমা দেশগুলো প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার রেললাইনে ছেয়ে গেল, অথচ এশিয়া, আফ্রিকা আর ল্যাটিন আমেরিকার মোট রেললাইনের দৈর্ঘ্য ছিল বড়জোর ৪ হাজার কিলোমিটার। ১৮৮০ নাগাদ পশ্চিমের মোট রেললাইন হল সাড়ে ৩ লাখ কিলোমিটার, আর বাকি পৃথিবীতে ৩৫ হাজার কিলোমিটার। এর বেশিরভাগই ছিল ভারতে, আর সেটাও ব্রিটিশদেরই তৈরি।৫ চীনে প্রথম রেললাইন বসে ১৮৭৬ সালে। মাত্র ২৫ কিলোমিটার লম্বা, এবং ইউরোপীয়দের দ্বারাই তৈরি। অবশ্য পরের বছরই চীন সরকার সেটা নষ্ট করে ফেলে। ১৮৮০ সালে চীনে রেলপথ বলতে কিছু ছিলই না। ইরানের প্রথম রেলপথ তৈরি হয় তেহরান আর সেখান থেকে কিলোমিটার দশেক দূরের একটা শহরের মধ্যে। সেটা ১৮৮৮ সালের কথা। এটাও তৈরি করেছিল বেলজিয়ামের একটা প্রতিষ্ঠান। ১৯৫০ সালে ব্রিটেনের চেয়ে আকারে সাতগুণ বড় দেশ ইরানের মোট রেলপথের দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র আড়াই হাজার কিলোমিটার।
চীন আর ইরানের মানুষের বাষ্প ইঞ্জিন তৈরি করার মতো প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছিল না, তা কিন্তু নয়। অন্তত ব্রিটিশদেরটা দেখে তৈরি করা যেত, অথবা তাদের কাছ থেকে কিনেও তো আনা যেত। কিন্তু এভাবে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার জন্য ব্রিটিশ সমাজের যেসব মূল্যবোধ, মিথ, বিচারব্যবস্থা বা সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ভূমিকা রেখেছে, চীন বা ইরানে তখন সেগুলো ছিল না। এগুলো তো আর অন্যেরটা দেখে তৈরি করা যায় না। ফ্রান্স আর যুক্তরাষ্ট্র তাল মিলিয়ে এগোতে পেরেছে, কারণ তাদের সমাজ কাঠামো ব্রিটিশদের সাথে অনেকটাই মিলে যায়। চীন আর ইরান সেটা পারেনি, কারণ তাদের সমাজের বিকাশ হয়েছে অন্যরকমভাবে।
এই কারণ দেখিয়ে ১৫০০ থেকে ১৮৫০ পর্যন্ত সময়টাকে অনেকটা বোঝা যায়। এই সাড়ে তিনশ বছরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক বা প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে ইউরোপ এশিয়ার চেয়ে খুব বেশি এগিয়ে না থাকলেও সম্ভাবনাটা তৈরি হয়েছে তখনই। এর ফলাফলটা হঠাৎ করে দেখা গেছে ১৮৫০ এর পরে। ১৭৫০ সালের ইউরোপ, চীন আর মুসলিম বিশ্বকে সমশক্তিসম্পন্ন মনে হলেও আসলে তা নয়। ধরুন, দুজন মিস্ত্রি দুটো টাওয়ার বানাচ্ছে। একজন বানাচ্ছে কাঠ আর মাটি দিয়ে, অন্যজন ইস্পাত আর কংক্রিট দিয়ে। শুরুতে দেখা যাবে দুজনেরই কাজ সমানভাবে এগোচ্ছে। কিন্তু একটা সময়ে এসে প্রথম মিস্ত্রি কাজ থামাতে বাধ্য হবে, কারণ বড় টাওয়ার তৈরির ক্ষমতা মাটি আর কাঠের নেই। অথচ দ্বিতীয় মিস্ত্রির কাজ এগিয়ে যাবে তরতর করে।
