এই অভিযানের একশ বছরের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের প্রায় সবটুকু চাষযোগ্য মাটি দখলদার ইউরোপীয় মানুষদের হাতে চলে যায়। সেখানকার আদিবাসীদের ৯০ শতাংশই প্রাণ হারায়, আর বাকিরা সেই বর্ণবিদ্বেষী সমাজে কোনোমতে টিকে থাকে। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠী আর নিউজিল্যান্ডের মাওরিদের যে ক্ষতি সে সময় হয়েছে, সেটা তারা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
তবে তাসমানিয়ার আদিবাসীদের পরিণতি হয় সবচেয়ে করুণ। ওই বিচ্ছিন্ন দ্বীপটাতে ১০ হাজার বছর ধরে যারা টিকে ছিল, কুকের অভিযানের মাত্র একশ বছরের মধ্যে তাদের একেবারে শেষ মানুষটাও মারা যায়। ইউরোপীয় দখলদাররা প্রথমে দ্বীপের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অংশটা দখল করে সেখান থেকে আদিবাসীদের তাড়িয়ে দেয়। আদিবাসীদেরকে পশুর মতোই শিকার করত তারা। তারপর শেষ কিছু মানুষকে কোণঠাসা করে আটকে রাখা হয় বন্দীশিবিরে। সেখানে তাদেরকে ‘সভ্য মানুষ’ বানানোর চেষ্টা করা হয়। সেখানে ধর্মপ্রচারকেরা তাদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দেয়, তাদেরকে লেখাপড়া শেখানো হয়, সেলাই করা আর চাষবাসের মতো ‘কাজের কাজ’ শেখানোরও চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তারা সে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। ধীরে ধীরে সেই শেষ কজন আদিবাসী বিষণ্ণ মানুষ জীবনের প্রতি সবরকম আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, এমনকি সন্তান নেওয়াও বন্ধ করে দেয়। এই সভ্য জগতের বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ আর প্রগতির হাত থেকে বাঁচতে একমাত্র খোলা পথটাই তারা বেছে নেয়- মৃত্যু।
বিজ্ঞানের অগ্রগতি এই মানুষগুলোকে মৃত্যুর পরেও শান্তি দেয়নি। তাসমানিয়ার সর্বশেষ আদিবাসীদের মৃতদেহগুলোও চলে যায় নৃতাত্ত্বিক আর জাদুঘরের লোকেদের কাছে। সেসব দেহ কাটাছেঁড়া করে, দৈর্ঘ্যপ্রস্থ আর ওজন মেপে সেসব তথ্য দিয়ে ভারী ভারী বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ লেখা হয়। তারপর তাদের কঙ্কালগুলোর জায়গা হয় বিভিন্ন জাদুঘরে আর প্রদর্শনীতে। শেষমেশ ১৯৭৬ সালে তাসমানিয়ার জাদুঘর সর্বশেষ জীবিত আদিবাসী ট্রুগানিনির (Truganini) কঙ্কাল মৃত্যুর একশ বছর পর সমাহিত করে। তার চামড়া ও চুলের কিছু নমুনা ব্রিটেনের শৈল্য চিকিৎসা কলেজে (The English Royal College of Surgeons) ২০০২ সাল পর্যন্ত ছিল।
কুকের অভিযানকে আসলে কী বলা যায়? সেনা-প্রতিরক্ষা বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক অভিযান? নাকি কয়েকজন বিজ্ঞানীকে সাথে নিয়ে সামরিক অভিযান? প্রশ্নটা আধাগ্লাস পানি দেখিয়ে গ্লাসটা অর্ধেক ভরা না অর্ধেক খালি জানতে চাওয়ার মতোই। দুটোই ঠিক। বিজ্ঞানের অগ্রগতি আর সাম্রাজ্যবাদের বিকাশ- এ দুটো আসলে অবিচ্ছেদ্য। একটা থেকে অন্যটাকে আলাদা করা যায় না। ক্যাপ্টেন জেমস কুক কিংবা উদ্ভিদবিজ্ঞানী জোসেফ ব্যাঙ্কস- দুজনের কেউই পারেননি। ট্রুগানিনিও না।
কেন ইউরোপ?
এই যে উত্তর আটলান্টিকের একটা দ্বীপের কিছু মানুষ গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণের একটা বড় দ্বীপ দখল করে নিল- এটা মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাগুলোর একটা। কুকের অভিযানের খুব বেশি আগের কথা না, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ আর পশ্চিম ইউরোপ ছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে দূরের একটা বৈশিষ্ট্যহীন এলাকা। আর ইউরোপের ইতিহাসের শুরুর দিককার যে পরাক্রমশালী রোমান সাম্রাজ্যের কথা আমরা বলি, সে সাম্রাজ্যও নিজের সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল না। রোমান সাম্রাজ্যের প্রায় সব সম্পদই ছিল উত্তর আফ্রিকা, বলকান আর মধ্যপ্রাচ্য থেকে লুট করে আনা। রোমান সাম্রাজ্যের পশ্চিম অংশের অবস্থা ছিল খুবই করুণ- অনেকটা আমরা যে বুনো পশ্চিমের কথা বলি, তেমন। কিছু খনি আর দাস ছাড়া সে অঞ্চল আর কিছুই দিতে পারেনি রোমান সভ্যতাকে। আর উত্তর ইউরোপ ছিল একটা বিরানভূমি, জয় করে নেওয়ার মতো কিছুই ছিল না সেখানে।

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষে এসে ইউরোপ সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আর সাংস্কৃতিক দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। ১৫০০ থেকে ১৭৫০ সালের মধ্যকার সময়টাতে ইউরোপ বলতে গেলে বাইরের পৃথিবীর মালিক বনে গেল। দুই আমেরিকা মহাদেশ আর মহাসাগরগুলোর উপর তখন তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। তারপরেও, শক্তির তুলনায় ইউরোপ এশিয়ার ধারেকাছেও ছিল না। ইউরোপ দুই আমেরিকা আর সাগরগুলো দখল করতে পেরেছিল কারণ এশিয়ার মানুষ ওগুলো দখল করার কোনো চেষ্টাই করেনি। আধুনিক যুগের শুরুর দিকে ভূমধ্যসাগরে অটোমান সাম্রাজ্য, পারস্যে সাফাভিদ সাম্রাজ্য, ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য আর চীনে মিং আর চিং সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ চলছিল। এদের প্রত্যেকটাই যার যার সীমানা বাড়িয়ে যাচ্ছিল। ১৭৭৫ সালে সারা পৃথিবীর সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শতকরা ৮০ ভাগই হতো এশিয়ায়। শুধু ভারত আর চীনে যে পরিমাণ সম্পদের উৎপাদন হতো সেটাই ছিল পুরো পৃথিবীর তিন ভাগের দুভাগ। এর তুলনায় ইউরোপের অর্থনীতি ছিল নস্যি।৩
অথচ ১৭৫০ থেকে ১৮৫০- এই একশ বছরের মধ্যেই পৃথিবীর ক্ষমতার কেন্দ্র সরে গেল ইউরোপে। এই সময়ে ইউরোপের মানুষ একের পর এক যুদ্ধে এশিয়ার পরাশক্তিগুলোকে শোচনীয়ভাবে পরাভূত করেছে। এশিয়ার অনেকখানি এলাকা চলে গেল ইউরোপের দখলে। ১৯০০ সালের মধ্যেই ইউরোপ পৃথিবীর অধিকাংশ ভূমি আর অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৫০ এর মধ্যে দেখা গেল, পশ্চিম ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্র মিলে পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদ উৎপাদন করছে। ওদিকে চীনের উৎপাদন কমতে কমতে ৫ শতাংশে এসে ঠেকল।৪ ইউরোপের অধীনে পৃথিবীর ক্ষমতার বণ্টন আর সংস্কৃতি আমূল বদলে গেল। আজকের পৃথিবীতেই তো আমরা দেখতে পাই, প্রায় সব মানুষই ইউরোপীয়দের মতো পোশাক পরে, তাদের মতো চিন্তা করে। আজকের যে মানুষদের কথায় প্রবল ইউরোপ-বিদ্বেশ প্রকাশ পায়, দেখা যায় তারাও পৃথিবীটাকে ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখে। রাজনীতি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সামরিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে বর্তমান অবস্থায় এনেছে ইউরোপ। নানা দেশের সঙ্গীতে ইউরোপীয় সুরের প্রভাব লক্ষণীয়। আর আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে যে সব ভাষা এখন চলছে তার সবই তো ইউরোপের। এই যে চীনের অর্থনীতি আজ বিরাট আকার নিচ্ছে, হয়তো আগামী দিনের পৃথিবীটা তাদেরই হবে, কিন্তু সে অর্থনীতির উৎপাদন থেকে অর্থায়ন- সবকিছু গড়ে উঠেছে ইউরোপীয় মডেলেই।