জ্যোতির্বিদরা আগে থেকেই জানতেন যে শুক্রগ্রহ ১৭৬১ আর ১৭৬৯ সালে পৃথিবী আর সূর্যের মাঝখান দিয়ে যাবে। তাই আগেভাগেই ইউরোপ থেকে চারদিকে পর্যবেক্ষণ দল পাঠিয়ে দেওয়া হল। ১৭৬১ সালে সাইবেরিয়া, উত্তর আমেরিকা, মাদাগাস্কার আর দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ঘটনাটা দেখা গেল। এরপর ১৭৬৯ সালে ইউরোপের বিজ্ঞানী সমাজ এই পরীক্ষার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন। এবার লোক পাঠানো হল কানাডার উত্তরে আর ক্যালিফোর্নিয়ায় (তখন সেখানে ঘন জঙ্গল)। তবে লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির (The Royal Society of London for the Improvement of Natural Knowledge) কাছে সেটা যথেষ্ট মনে হলো না। তাঁরা বললেন, একেবারে নির্ভুল ফলাফল পেতে হলে দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে কাউকে যেতেই হবে।
রয়্যাল সোসাইটি সিদ্ধান্ত নিল তখনকার ডাকসাইটে জ্যোতির্বিদ চার্লস গ্রিনকে তাহিতি দ্বীপে পাঠানোর। প্রচুর অর্থ ও শ্রমসাপেক্ষ অভিযান। রয়্যাল সোসাইটি ভাবল, কেবল একটা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য এত কষ্ট, এত খরচ? তার চেয়ে একই অভিযানে আরও কিছু কাজ সেরে ফেলা যাক। ফলে চার্লস গ্রিনের সঙ্গে যুক্ত হল বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার আরও আটজন বৈজ্ঞানিক। দলের নেতা হিসেবে ছিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানী জোসেফ ব্যাঙ্কস আর ড্যানিয়েল সোল্যান্ডার। সাথে গেল নতুন জায়গা, মানুষ আর পশুপাখির ছবি আঁকার জন্য শিল্পীরা। আর এই পুরো অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন অভিজ্ঞ নাবিক ও ভূগোলবিদ ক্যাপ্টেন জেমস কুক।
এই নৌবহর ইংল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করে ১৭৬৮ সালে। তারপর ১৭৬৯ সালে তাহিতিতে শুক্রগ্রহ পর্যবেক্ষণের পর প্রশান্ত মহাসাগরের আরও কয়েকটা দ্বীপ ঘুরে, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ঘুরে আবার ইংল্যান্ডে ফেরে ১৭৭১ সালে। সাথে নিয়ে আসে জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা ও নৃতত্ত্বের প্রচুর নতুন জ্ঞান। এই নতুন জ্ঞানই বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। সাথে সাথে একদিকে সেটা প্রশান্ত মহাসাগর নিয়ে মানুষের কল্পনায় আরেকটু রঙ চড়ায়, আবার অন্যদিকে পরের প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের দেয় নতুন অনুপ্রেরণা।
ক্যাপ্টেন কুকের অভিযানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটা বড় উপকার হয়। তখনকার দিনে প্রায় অর্ধেক মানুষই বেঁচে ফিরতে পারবে না- এমনটা জেনেই এসব দূরপাল্লার অভিযান শুরু হতো। না, কোনো দ্বীপের হিংস্র মানুষ, শত্রুদের যুদ্ধজাহাজ বা ঘরের টান- এসব কিছুই না, নাবিকদের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল স্কার্ভি (Scurvy) নামক এক রহস্যময় রোগ। এ রোগে আক্রান্ত মানুষ কেমন যেন হতাশ আর বিষণ্ণ হয়ে পড়ে, দাঁতের মাড়ি থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। এরপর আস্তে আস্তে দাঁত পড়ে যায়, শরীরের নানা জায়গায় ঘা হতে থাকে, তারপর জ্বরাক্রান্ত ফ্যাকাশে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে হারাতে রোগী মারা যায়। ধারণা করা হয়, ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রায় ২০ লক্ষ নাবিকের প্রাণ গেছে এই স্কার্ভিতে। এই রোগের কারণ কেউ জানতো না, প্রতিকার তো নয়ই। অবশেষে আশার আলো দেখা যায় ১৭৪৭ সালে। সেবছর ব্রিটিশ চিকিৎসক জেমস লিন্ড স্কার্ভি-আক্রান্ত নাবিকদের উপর একটা পরীক্ষা চালান। সে পরীক্ষায় রোগীদের কয়েকটা দলে ভাগ করে এক এক দলের উপর এক এক রকমের ওষুধের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত যে দলের রোগীরা টিকে গেল, দেখা গেল তাদের খাওয়ানো হয়েছে লেবু জাতীয় ফল। স্কার্ভির ওষুধ হিসেবে লেবুর কার্যকারিতার কথা লোকমুখে শোনা যেত। সেই লেবু-খাওয়া রোগীরা বেশ দ্রুতই সেরে ওঠে। লিন্ড জানতেন না লেবুর ঠিক কোন উপাদানটা স্কার্ভি সারায়, যদিও আমরা এখন জানি জিনিসটা হল ভিটামিন সি। তখনকার দিনে দীর্ঘ যাত্রায় জাহাজে খাবার হিসেবে নেওয়া হতো বিস্কুট আর শুকনো মাংস। ফল আর সবজি বলতে কিছুই নেওয়া হতো না জাহাজে, যার ফলে নাবিকদের শরীরে দেখা যেত ভিটামিন সি এর অভাব।
ব্রিটিশ নৌবাহিনী লিন্ডের পর্যবেক্ষণ না মানলেও জেমস কুক মেনেছিলেন ঠিকই। লিন্ডের পর্যবেক্ষণ ঠিক কি না সেটা প্রমাণের দায়িত্ব তুলে নেন তিনি। তাঁর নৌবহরে তিনি খাবার হিসেবে প্রচুর পরিমাণে সয়ারক্রট (Sauerkraut – গাঁজানো বাঁধাকপি কুচি, অনেকটা আচারের মতো) নিয়ে যান। আর নাবিকদের নির্দেশ দিয়ে রাখেন কখনও ডাঙায় নামলেই বেশি করে ফল আর সবজি খেয়ে নিতে। সেই অভিযানে একজন নাবিকও স্কার্ভিতে মারা যায়নি। এরপর থেকে সব জাহাজে খাবারের ধরন পালটে যায়। অন্যান্য নাবিকেরা ক্যাপ্টেন কুকের পথ অনুসরণ করায় বেঁচে যায় অগণিত নাবিক ও যাত্রীর প্রাণ।১
তবে এটাই সব নয়, ক্যাপ্টেন কুকের এই অভিযানের একটা অন্ধকার দিকও আছে। কুক শুধু একজন দক্ষ নাবিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তাও। রয়্যাল সোসাইটি এই অভিযানে টাকা দিলেও জাহাজ কিন্তু দিয়েছিল ব্রিটিশ নৌবাহিনীই। সেই অভিযানে নাবিক ও বিজ্ঞানীদের সাথে ছিল ৮৫ জন সশস্ত্র নৌসেনা, আর জাহাজে ছিল প্রচুর কামান-বন্দুক আর গোলাবারুদ। এই অভিযানে পাওয়া ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক তথ্যের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব যতটা ছিল, রাজনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব তার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। স্কার্ভির কার্যকর চিকিৎসা আবিষ্কার হওয়াতে ওই সব দূর সাগরে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হল। এরপর তারা আরও দূরে, একেবারে পৃথিবীর উল্টোদিকেও সেনাবাহিনী পাঠাতে শুরু করল। কুক নিজেই তাঁর ‘আবিষ্কৃত’ অনেকগুলো দ্বীপ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে এনেছেন, এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল অস্ট্রেলিয়া। কুকের অভিযানের মাধ্যমেই অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড আর তাসমানিয়ার দখল প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর আস্তে আস্তে ইউরোপের মানুষ সেখানে উপনিবেশ তৈরি করে আর সেখানকার আদি অধিবাসী ও তাদের সংস্কৃতিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয়।২
