গিলগামেশের অমরত্বের এই অভিযাত্রা সফল হোক আর নাই হোক, ঐতিহাসিক দিক থেকে একটা চমৎকার পরিবর্তনের সূচনা কিন্তু হয়ে গেছে। অধিকাংশ উত্তর-আধুনিক ধর্ম এবং ধ্যান-ধারণা মৃত্যু এবং মৃত্যুর পরের জীবনের হিসেব-নিকেশ ছাড়াই গড়ে উঠেছে। অষ্টাদশ শতকের আগ পর্যন্ত ধর্ম এবং দর্শন, মৃত্যু এবং তার পরের ঘটনাকেই অর্থপূর্ণ জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। ব্যক্তিস্বাধীনতা, সমাজতন্ত্র, নারীবাদের মত অষ্টাদশ শতক থেকে শুরু হওয়া ধর্ম এবং দর্শনগুলো পরজন্মের প্রতি কোন আগ্রহ না দেখিয়েই বেড়ে উঠেছে। মৃত্যুর পর একজন কম্যুনিস্টের জীবনে কী ঘটে? কী ঘটে একজন পুঁজিবাদীর জীবনে? একজন নারীবাদীর পরজন্মই বা কেমন? মার্ক্স, অ্যাডাম স্মিথ বা সিমন দ্য বুভেয়ারের গ্রন্থে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন। আধুনিক দর্শনগুলোর মধ্যে একমাত্র জাতীয়তাবাদই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। জাতির অসহায় এবং কাব্যময় মুহূর্তগুলোতে জাতীয়তাবাদ প্রতিশ্রুতি দেয় জাতির সম্মান রক্ষায় যে প্রাণ উৎসর্গ করবে, সমগ্র জাতির স্মৃতিতে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কিন্তু মৃত্যুকেন্দ্রিক হলেও এই প্রতিশ্রুতি এতটাই ঠুনকো যে অনেকসময় অনেক কট্টর জাতীয়তাবাদীও ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না, মৃত্যুর পর জাতির সমস্ত মানুষের স্মৃতিতে ঠাঁই করে নিয়ে তার লাভটা কোথায়।
বিজ্ঞানের রক্ষক পিতা
আমরা এখন যন্ত্রের যুগে বাস করছি। অনেকেই বিশ্বাস করেন, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অগ্রগতির মাঝেই নিহিত আছে মানুষের সব প্রশ্নের উত্তর। আমরা কেবল বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেব এবং তারা নিয়ে আসবে ধুলোকাদার পৃথিবীতে স্বর্গের সুষমা। কিন্তু বিজ্ঞান নামক প্রতিষ্ঠানটি মানুষের চেয়ে বড় কোন নৈতিক বা আধ্যাত্মিক সত্ত্বার উপর ভর করে গড়ে ওঠেনি। সংস্কৃতির অন্যান্য উপাদানগুলোর মতই, সমাজের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় পরিস্থিতিগুলোই এর প্রকৃতি গড়ে তুলেছে।
বিজ্ঞানের সাথে জড়িয়ে থাকে বড় অঙ্কের খরচ। মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বুঝতে চান যে বিজ্ঞানী তার নিদেনপক্ষে দরকার একটি গবেষণাগার, টেস্টটিউব, রাসায়নিক দ্রব্যাদি, ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র। এছাড়া গবেষণা সহকারী, বিদ্যুতের মিস্ত্রী, জলের পাইপের মিস্ত্রী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এসব তো আছেই। একজন অর্থনীতিবিদ যিনি একটি বাজারের ঋণের প্রকৃতি অনুধাবন করতে চান তার অবশ্যই দরকার কম্পিউটার, বাজার সম্পর্কিত অনেক তথ্য এবং দরকার জটিল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রোগ্রাম। একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ যিনি প্রাচীনকালের শিকারী-সংগ্রাহকের জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে চান তাকে বহু দূরে যাত্রা করতে হবে, খনন করতে হবে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ এবং পুরনো জীবাশ্ম ও জিনিসপত্রের বয়স নির্ধারণ করতে হবে। এসব কিছুর জন্যই অর্থের প্রয়োজন।
গত ৫০০ বছরে বিজ্ঞান যে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করতে পেরেছে তার মূল কারণ হলো বিভিন্ন দেশের সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও দাতা সংস্থার বিজ্ঞানের গবেষণায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের সদিচ্ছা। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানতে, পৃথিবীর মানচিত্র নির্মাণে এবং প্রাণীজগতের সুনির্দিষ্ট বিন্যাস করার ব্যাপারে যে কৃতিত্ব দেখিয়েছে, গ্যালিলিও গ্যালিলি, ক্রিস্টোফার কলম্বাস এবং চার্লস ডারউইন ততটা কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি। কোনও একজন বিশেষ প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর যদি জন্ম নাও হত, অন্য সময়ে, পৃথিবীর অন্য কোথাও তার সমকক্ষ মেধার একজন কেউ হয়ত জন্ম নিতেন। কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ অর্থের যোগান না দিলে, কোনও মেধাবীই সেটার অভাব পূরণ করতে পারতেন না। উদাহরণস্বরূপ, যদি ডারউইনের জন্ম না হত, তাহলে বিবর্তনবাদ আবিষ্কারক হিসাবে আমরা হয়ত আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসকে কৃতিত্ব দিতাম। কারণ, তিনি ডারউইনের বিবর্তনবাদ আবিষ্কারের কয়েক বছর পর নিজে স্বাধীনভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের কথা ঘোষণা করেন। কিন্তু ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো যদি ভূগোল, প্রাণীবিজ্ঞান এবং উদ্ভিদবিজ্ঞানের গবেষণার জন্য যথেষ্ট অর্থের বরাদ্দ না করত, তাহলে ডারউইন বা ওয়ালেস বিবর্তনের তত্ত্ব দাঁড়া করানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পরীক্ষণলব্ধ তথ্য পেতেন না। খুব সম্ভবত, এসব তথ্য না থাকলে বিবর্তন সংক্রান্ত কোন তত্ত্ব আবিষ্কারের কোন চেষ্টা করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না।
এই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কী উদ্দেশ্যে সরকারের কোষাগার আর ব্যবসার তহবিল থেকে গবেষণাগার আর বিশ্ববিদ্যালয়ে উড়ে যায়? প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জগতে, অনেকেই বোকার মত শুদ্ধ বিজ্ঞানের চর্চায় বিশ্বাস করে থাকেন। তাদের বিশ্বাস, সরকার এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কোন স্বার্থ ছাড়াই মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে এই অর্থ বরাদ্দ করেন যাতে বিজ্ঞানীরা তাদের স্বাধীন ইচ্ছা অনুসারে গবেষণা করতে পারেন। কিন্তু, বিজ্ঞানের অর্থায়নের প্রকৃত উদ্দেশ্য এই ধ্যান ধারণার সাথে ভীষণ রকম সাংঘর্ষিক।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অথবা ধর্মীয় লক্ষ্য পূরণ করবে এই আশায় বেশিরভাগ গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ষোড়শ শতকে রাজা এবং ব্যাংকারগণ নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের অভিযানে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বিনিয়োগ করেছে কিন্তু মনোবিজ্ঞানের গবেষণার পেছনে একটা পয়সাও খরচ করেনি। কারণ, রাজা এবং ব্যাংকারদের ধারণা ছিল ভূগোল সংক্রান্ত নতুন জ্ঞান তাদের নতুন ভূখণ্ড দখল এবং নতুন ব্যবসায়িক কেন্দ্র স্থাপনে সহায়তা করবে, অন্যদিকে একটি শিশুর মনস্তত্ত্ব আবিষ্কারের পেছনে তারা কোন মুনাফার সম্ভাবনা দেখতে পায়নি।
