১৯৪০ এর দশকে আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকার জলজ প্রত্নতত্ত্বের চেয়ে নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যা গবেষণায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করলেন। কারণ তাদের ধারণা ছিল যে, নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যা নিয়ে বেশি বেশি গবেষণা হলে তা তাদেরকে নতুন নিউক্লিয়ার অস্ত্র, বোমা বানাতে সহায়তা করবে, কিন্তু পানির নিচের প্রত্নতত্ত্ব তাদের যুদ্ধ জয়ের ক্ষেত্রে তেমন সাহায্য করবে না। বিজ্ঞানীরা অনেক সময়েই অর্থের জোগানদাতাদের এইসব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় উদ্দেশ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন না; অনেক বিজ্ঞানীই বিজ্ঞানের প্রতি বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতুহল থেকেই বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়ে যান। বিজ্ঞানের লক্ষ্য কী হবে, তা খুব কম ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করার সুযোগ পান।
যদি আমরা কোন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অথবা ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছাড়া বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ করতেও চাইতাম, তা বাস্তবে করা সম্ভবপর হত না। তার প্রধান কারণ, আমাদের সম্পদের পরিমাণ সীমিত। একজন সংসদ সদস্যকে জাতীয় বিজ্ঞান সমিতির প্রাথমিক গবেষণা কাজের জন্য কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দিন, তিনি সঙ্গতকারণেই জিজ্ঞেস করবেন, এর চেয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে বা একটি ডুবতে বসা কারখানার কর রেয়াতের কাজে এই অর্থ ব্যয় করলে তা কি বেশি কার্যকর হবে না? সীমিত সম্পদের বন্টনের জন্য সবসময় আমাদের যে প্রশ্নটির মুখোমুখি হতে হয় তা হল- ‘কোন কাজটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?’ এবং ‘কোন কাজটি কল্যাণকর?’। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বিজ্ঞানের আলোচনার বিষয় নয়। বিজ্ঞান দুনিয়াতে কী কী আছে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়, কোন জিনিসটি কীভাবে কাজ করে তা জানায় এবং ভবিষ্যতের পৃথিবী কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে আমাদের একটা ধারণা দেয়। সংজ্ঞানুযায়ীই, ভবিষ্যতের পৃথিবী কেমন হওয়া উচিত এই প্রশ্নটি বিজ্ঞানের আওতার বাইরে। ধর্ম এবং দর্শনগুলোই কেবল এই ধরনের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করে।
এখন, ধরা যাক- একই রকম পেশাদারী যোগ্যতাসম্পন্ন, একই বিভাগের জীববিজ্ঞানের দুইজন অধ্যাপক তাদের বর্তমান গবেষণা বাবদ এক কোটি টাকা বরাদ্দের জন্য আবেদন করেছেন। অধ্যাপক স্লাগহর্ণ চান গরুর একটি অসুখ নিয়ে গবেষণা করতে যে অসুখের কারণে গরুর দুধ উৎপাদনের পরিমাণ দশ শতাংশ কমে যাচ্ছে। অপরদিকে অধ্যাপক স্প্রাউট বাছুরকে মা গরুর থেকে আলাদা করা হলে মা গরু মানসিক অবসাদে ভোগে কী না তা নিয়ে গবেষণা করতে চান। অর্থের পরিমাণ যদি সীমিত হয় এবং দু’টো প্রকল্পে অর্থায়ন করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ না থাকে, তাহলে কোন প্রকল্পে অর্থায়ন করা উচিত?
এই প্রশ্নের কোন বৈজ্ঞানিক উত্তর নেই। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ প্রশ্নের নানারকম উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যেতে পারে। আজকের দুনিয়ার অবস্থা চিন্তা করলে প্রফেসর স্লাগহর্ণের প্রকল্পে অর্থায়ন হওয়ার সুযোগ বেশি। এই কারণে নয় যে, শারীরিক অসুখ নিয়ে গবেষণা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণার চেয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে বেশি কৌতূহলোদ্দীপক, বরং একারণে যে, প্রথম গবেষণা থেকে দুগ্ধ শিল্পের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবার সম্ভাবনা দ্বিতীয় গবেষণা থেকে বেশি।
আবার ঘটনাটি যদি একটি হিন্দু সমাজে হয়, যেখানে গরু একটি পবিত্র প্রাণী বা এমন কোন সমাজে যেখানকার মানুষজন প্রাণীদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার, সেখানে অধ্যাপক স্প্রাউটের প্রজেক্টে অর্থায়ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু যখন তিনি এমন এক সমাজে বাস করছেন যেখানে গরুর দুধের ব্যবসায়িক মূল্য এবং মানুষের স্বাস্থ্যের গুরুত্ব অন্য কোন প্রাণীর মানসিক স্বাস্থ্যের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন তাকে এসব কথা মাথায় রেখেই তার গবেষণার প্রস্তাবনা তৈরি করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, তিনি তার প্রস্তাবনায় লিখতে পারেন- ‘মানসিক হতাশা গাভীর দুধ উৎপাদনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। আমরা যদি গাভীর মানসিক অবস্থা বুঝতে পারি, তাহলে আমরা হয়ত এমন কিছু ওষুধ তৈরি করতে পারব যা তাদেরকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে সাহায্য করবে এবং ফলস্বরূপ ১০ শতাংশ পর্যন্ত দুধের উৎপাদন বাড়বে। আমার ধারণা, পৃথিবীতে গাভীর মানসিক ওষুধের বাৎসরিক চাহিদা ২৫০ মিলিয়ন ডলার।’
বিজ্ঞান তার নিজের জন্য প্রয়োজনীয় বা গুরুত্বপূর্ণ কী তা নির্ধারণে অক্ষম। বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে কোন কাজে লাগানো হবে তার কোনও ধারণাও বিজ্ঞানের পক্ষে করা সম্ভব নয়। যেমন- বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এটা নির্ণয় করা কঠিন যে, জিন বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান জ্ঞান মানুষের কোন কাজে লাগতে পারে। এই জ্ঞান কি আমরা ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহার করব, নাকি এই জ্ঞান প্রয়োগ করে বিশাল ক্ষমতাসম্পন্ন সুপারম্যানের জাতি তৈরি করব নাকি এই জ্ঞান কাজে লাগাব বড় ওলান বিশিষ্ট গাভী উৎপাদনে? একথা স্পষ্ট যে একটি গণতান্ত্রিক সরকার, সমাজতান্ত্রিক সরকার, স্বৈরতান্ত্রিক সরকার বা একটি পুঁজিবাদী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এই একই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে বিভিন্নভাবে তাদের নিজেদের সুবিধার অনুকূলে ব্যবহার করবে। এর কোন ব্যবহারকেই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যটির চেয়ে ভাল বা খারাপ বলা যায় না।
