সবচেয়ে বেশি কমেছে শিশু মৃত্যুর হার। বিশ শতক পর্যন্ত, কৃষিপ্রধান সমাজগুলোতে এক-চতুর্থাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ শিশু পূর্ণবয়স্ক হবার আগেই মৃত্যুবরণ করত। ডিপথেরিয়া, হাম এবং গুটিবসন্ত ছিল শিশুদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী রোগ। সপ্তদশ শতকের ইংল্যান্ডে প্রতি হাজার জন সদ্য জন্ম নেয়া শিশুদের মাঝে ১৫০ জনই তাদের বয়স ১ বছর পূরণ হবার আগেই মারা যেত, বয়স ১৫ পূরণ হবার আগেই মারা যেত এক-তৃতীয়াংশ শিশু।৯ আজকের দিনে হাজার জন শিশুর মাঝে মাত্র ৫ জন শিশু ১ বছর বয়সের আগেই মারা যায়, ১৫ বয়স পূর্ণ হবার আগে মারা যায় হাজারজনে মাত্র ৭ জন।১০
এসব সংখ্যা আর পরিসংখ্যান সরিয়ে আমরা যদি কিছু গল্প বলি তাহলে পুরো ব্যাপারটা সম্পর্কে আরেকটু স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। এ প্রসঙ্গে রাজা প্রথম এডওয়ার্ড (১২৩৭-১৩০৭) এবং তার স্ত্রী রাণী ইলিনরের (১২৪১-৯০) পরিবার একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে। মধ্যযুগের ইউরোপে একজন শিশু যতটা যত্ন আর পরিচর্যা পেতে পারে তাদের সন্তানরা তার সবই পেয়েছে। তারা বাস করত প্রাসাদে, তাদের ছিল খাদ্যের প্রাচুর্য, পর্যাপ্ত শীতপোশাক, ঘর গরম রাখবার ফায়ারপ্লেস, পরিষ্কার পানীয় জলের যোগান এবং তাদের সেবায় নিয়োজিত ছিল এক গাদা দাস-দাসী এবং চিকিৎসক। নিচে আমরা রাণী ইলিনরের ১২৫৫ থেকে ১২৮৪ সাল পর্যন্ত জন্ম দেয়া ১৬ জন সন্তানের ব্যাপারে জানব-
১। নামহীন কন্যা সন্তান, ১২৫৫ সালে জন্ম, জন্মের সময়ই মারা যান।
২। কন্যা ক্যাথরিন, সম্ভবত: এক বছর বা তিন বছর বয়সে মারা যান।
৩। কন্যা জোয়ান, ছয় মাস বয়সে মারা যান।
৪। পুত্র জন, পাঁচ বছর বয়সে মারা যান।
৫। পুত্র হেনরি, ছয় বছর বয়সে মারা যান।
৬। কন্যা ইলিনর, উনত্রিশ বছরে মারা যান।
৭। নামহীন কন্যা, পাঁচ মাস বয়সেই মারা যান।
৮। কন্যা জোয়ান, পয়ত্রিশ বছর বয়সে মারা যান।
৯। পুত্র আলফনসো, দশ বছর বয়সে মারা যান।
১০। কন্যা মার্গারেট, আটান্ন বছর বয়সে মারা যান।
১১। কন্যা বারেঞ্জেরিয়া, দুই বছর বয়সে মারা যান।
১২। নামহীন কন্যা, জন্মের পরপরই মারা যান।
১৩। কন্যা ম্যারি, তেপান্ন বছর বয়সে মারা যান।
১৪। নামহীন পুত্র, জন্মের পরপরই মারা যান।
১৫। কন্যা এলিজাবেথ, চৌত্রিশ বছর বয়সে মারা যান।
১৬। পুত্র এডওয়ার্ড।
পুত্র সন্তানদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এ্ডওয়ার্ডই কেবল শৈশবের ভয়ঙ্কর বছরগুলো পার হয়ে আসতে পেরেছেন এবং পিতার মৃত্যুর পর তিনিই দ্বিতীয় রাজা এডওয়ার্ড হিসাবে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, ব্রিটেনের রাণী হিসেবে এলিনরের প্রধান কর্তব্য ছিল রাজার পুরুষ উত্তরাধিকারীর জন্ম দেওয়া, আর সেই কর্তব্য ঠিকমতো পালন করতে তাকে চেষ্টা করতে হয়েছে ষোল বার।। রাজা দ্বিতীয় এ্ডওয়ার্ডের মা নিঃসন্দেহে একজন অসাধারণ ধৈর্যশীল এবং সহিষ্ণু রমণী ছিলেন। এডওয়ার্ডের স্ত্রী ফ্রান্সের ইসাবেলা অতটা ধৈর্য্ প্রদর্শন করতে পারেননি। ৪৩ বছর বয়সী রাজাকে তিনি হত্যা করেন।১১
যতদূর জানা যায়, ইলিনর এবং প্রথম এডওয়ার্ড স্বাস্থ্যবান দম্পতি ছিলেন এবং তাদের বংশধরদের মাঝে কোন জন্মগত অসুস্থতা ছিল না। তা সত্ত্বেও, ষোল জন সন্তানের মাঝে দশ জনই, অর্থাৎ প্রায় বাষট্টি শতাংশেরই মৃত্যু ঘটে শৈশবে। মাত্র ছয় জন এগার বছরের বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিল এবং এদের মাঝে মাত্র তিন জন, অর্থাৎ কেবল আঠার শতাংশের বয়স চল্লিশের কোঠা অতিক্রম করতে পেরেছে। জন্ম দেয়া এই সন্তানগুলো বাদেও সম্ভবত: ইলিনর আরও কয়েকবার গর্ভবতী হয়েছিলেন, গর্ভেই সেসব সন্তানের মৃত্যু হয়। গড়ে এ্ডওয়ার্ড এবং ইলিনর প্রতি তিন বছর পর পর একে একে তাদের দশজন সন্তানকে হারিয়েছেন। আজকের দিনের একজন দম্পতির পক্ষে সন্তানদের এরকম মৃত্যুর স্রোত কল্পনা করাও কঠিন।
এখন প্রশ্ন, গিলগামেশের অভিযান, অর্থাৎ অমরত্বের পথে মানুষের যাত্রা সফল হতে আর কত দেরি? একশ বছর? পাঁচশ বছর? হাজার বছর? যদি আমরা খতিয়ে দেখি ১৯০০ সালে আমরা মানবদেহ সম্পর্কে কত কম জানতাম, আর মাত্র এক শতকে আমরা মানব দেহ সম্পর্কে কত নতুন কিছু জানতে পেরেছি, সেটা হয়তো আমাদের অমরত্বের ব্যাপারে কিছুটা হলেও আশাবাদী করে তুলতে পারে। সাম্প্রতিককালে জিনবিজ্ঞানীরা সিনরহাবডিটিস এলিগেনস (Caenorhabditis elegans) নামক কেঁচোজাতীয় পোকার কাঙ্ক্ষিত আয়ু প্রায় দ্বিগুণ করতে সক্ষম হয়েছেন।১২ মানুষের ক্ষেত্রেও কি তারা তেমনটা করতে সক্ষম হবেন? ন্যানোপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা লক্ষ লক্ষ ক্ষুদে রোবটের সমন্বয়ে একটি বায়োনিক রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা তৈরি নিয়ে কাজ করছেন, যেই রোবটগুলো আমাদের শরীরে বসবাস করবে, বন্ধ হয়ে যাওয়া রক্তনালীগুলোকে সচল করবে, ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার সাথে লড়াই করবে, ক্যানসার কোষ ধ্বংস করবে, এমনকি বুড়িয়ে যাওয়ার পদ্ধতিকেও উল্টো পথে চালিত করবে।১৩ কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ কিছু মানুষ ‘অজর’ হতে পারবে (‘অমর’ নয়, কারণ তারা দুর্ঘটনায় মারা যেতেই পারে, কোনও জরা ব্যাধি তাদের আক্রান্ত করবে না, কোনও দুর্ঘটনা না ঘটলে তারা অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারবেন)।
