পরিবর্তনের পথের অনুসারীরা এরকম হার মেনে নেয়া দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত পোষণ করতে নারাজ। বিজ্ঞানের অনুসারীদের কাছে, মৃত্যু কোন অনিবার্য পরিণতি নয় বরং একটি কৌশলগত সমস্যা। বিধাতা মৃত্যুকে নিয়তি হিসেবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন বলেই মানুষ মরে না, বরং মানুষ মরে হৃদরোগ, ক্যানসার, জীবাণু সংক্রমনের মত নানারকম শারীরিক কৌশলগত সমস্যার কারণে। আর প্রতিটি কৌশলগত সমস্যারই একটি কৌশলগত সমাধান সম্ভব। যদি হৃদযন্ত্র সঠিকভাবে তার ক্রিয়াকর্ম না করতে পারে তবে পেসমেকার দিয়ে তার উদ্দীপনা বাড়ানো যেতে পারে বা হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। যদি শরীরে ক্যান্সার-আক্রান্ত কোষ ছড়িয়ে পড়ে তবে ওষুধ প্রয়োগে বা তেজস্ক্রিয়তার দ্বারা তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বেড়ে গেলে, অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে তাদের সাথে মোকাবেলা করা যেতে পারে। একথা সত্যি, আমরা এখনও মৃত্যুর সবরকম কৌশলগত সমস্যার সমাধান জানি না। কিন্তু আমরা ক্রমাগত সেসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের সেরা মেধাবীরা মৃত্যুকে মহিমান্বিত করে তোলার কাজে ব্যস্ত নয়। বরং তারা রোগ-ব্যাধি এবং বাধর্ক্যের শারীরিক, হরমোনগত এবং জিনগত কারণ অনুসন্ধানে নিয়োজিত। প্রতিনিয়ত তারা আবিষ্কার করে চলেছেন নতুন নতুন ওষুধ, বৈপ্লবিক চিকিৎসা পদ্ধতি এবং প্রতিস্থাপনযোগ্য কৃত্রিম অঙ্গ যা আমাদের আয়ু বাড়াতে সহায়তা করছে। হয়ত, এই নিরলস প্রচেষ্টাই একদিন মানুষকে ‘মৃত্যু’ রূপী এই দৈত্যকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম করবে।
কিছুদিন আগেও আপনি বিজ্ঞানী বা অন্য কাউকে এ ব্যাপারে এরকম স্পষ্ট করে বলতে শোনেননি- ‘মৃত্যুকে জয় করা? বললেই হল! সে এখনও অ-নে-ক দূরের পথ! আমরা সবেমাত্র ক্যান্সার, যক্ষা আর আলঝেইমার রোগের চিকিৎসা করার চেষ্টা করছি’। আজকে মানুষ মৃত্যুকে জয় করার বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চায় না এ কারণে যে, লক্ষ্যে পৌঁছাতে তাদের এখনও অনেক দেরি। অনর্থক প্রত্যাশার চাপ তৈরি করে কী লাভ? আমরা এখন এমন একটা অবস্থায় আছি যখন মৃত্যু নিয়ে আমরা স্পষ্টভাবে মন্তব্য করতে পারি। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সেরা প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য হলাে মানুষকে অনন্তজীবনের সন্ধান দেয়া। যদিও মৃত্যুকে জয় করা এখনও অনেক অনেক দূরের পথ, কিন্তু স্বাস্থ্যক্ষেত্রে আমরা এমন কিছু উন্নতি করেছি, কয়েক শতক আগেও যা ছিল কল্পনার অতীত। ১১৯৯ সালে ইংল্যান্ডের সিংহ-হৃদয় রাজা রিচার্ড (King Richard the Lionheart) একটি তীর দ্বারা তার কাধে আঘাত পান। এটি এখনকার ঘটনা হলে আমরা বলতাম উনি কাঁধে সামান্য চোট পেয়েছেন। কিন্তু সেই ১১৯৯ সালে অ্যান্টিবায়োটিকসের উদ্ভাবন না হওয়ায় এবং ক্ষতস্থান জীবাণুমুক্ত রাখার কোন কার্যকর পদ্ধতি না থাকায় রাজার কাঁধের এই সামান্য চোটে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটল এবং বাসা বাঁধলো গ্র্যাংগ্রিন। বিশ-শতকের ইউরোপে শরীরে গ্র্যাংগ্রিনের বিস্তার এড়ানোর একটাই কার্যকর উপায় ছিল, সেটা হল- আক্রান্ত স্থান কেটে শরীর থেকে বাদ দেয়া। এক্ষেত্রে সংক্রমণটা যেহেতু কাঁধে, তাই আক্রান্ত অঙ্গ কেটে বাদ দেয়ার কোন উপায় থাকলো না। রাজার সারা শরীরে গ্যাংগ্রিন ছড়িয়ে পড়ল এবং কেউ তাকে কোন সাহায্য করতে পারল না। দুই সপ্তাহ পর নিদারুণ যন্ত্রণা নিয়ে রাজার মৃত্যু হল।
এমনকি ঊনবিংশ শতাব্দীতেও বিশ্বের সেরা চিকিৎসকরা আক্রান্ত কোষ-কলার পচন প্রতিরোধ বা পচন বন্ধ করার কোন কার্যকর উপায় জানতেন না। যুদ্ধে সৈন্যরা হাতে বা পায়ে সামান্য আঘাত পেলেই গ্যাংগ্রিনের আশঙ্কায় ডাক্তাররা নিয়মিতই আক্রান্ত পা বা হাত কেটে ফেলতেন। এই অঙ্গছেদন এবং দাঁত তুলে ফেলার মত সেকালের প্রচলিত অন্যান্য চিকিৎসা প্রক্রিয়াগুলো করা হত কোনোরকম চেতনানাশক ছাড়াই। ইথার, ক্লোরোফর্ম এবং মরফিনের মত প্রথম দিককার চেতনানাশকগুলো পশ্চিমা চিকিৎসা শাস্ত্রে ধারাবাহিকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে। ক্লোরোফর্ম আবিষ্কারের আগে আক্রান্ত সেনার অঙ্গছেদনের সময় চারজন সৈন্যকে তার হাত-পা শক্ত করে ধরে রাখতে হত। ওয়াটারলু যুদ্ধের (১৮১৫) পরদিন সকালে যুদ্ধাহত সেনাদের সেবা দেয়া হাসপাতালগুলোর আশেপাশে আক্রান্ত সৈন্যদের কেটে ফেলা হাত ও পায়ের স্তুপ দেখা গেছে। সেকালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া কাঠমিস্ত্রী বা কসাইদেরকে প্রায়ই সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্য সেবা শাখায় পাঠানো হতো। কারণ, তখন ছুরি এবং করাতের ব্যবহার জানাই ছিল অস্ত্রোপচার করার মূল যোগ্যতা।
ওয়াটারলু যুদ্ধের মাত্র দুশ বছরের মাঝেই এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। যেসব অসুখ এবং জখম আগে আমাদের অবধারিত মৃত্যু ডেকে আনত, আজ ওষুধ, ইনজেকশন আর সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সহজেই আমরা এসব থেকে আরোগ্য লাভ করতে পারি। এগুলো আমাদেরকে প্রতিদিনের নানারকম ব্যাথা-বেদনা এবং অসুস্থতা থেকেও রক্ষা করে যেগুলোকে আগে মানুষ তাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবেই মেনে নিত। পুরো বিশ্বে গড় আয়ু ২৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪০ বছর, বর্তমানে বিশ্বের মানুষের গড় আয়ু ৬৭ বছর। উন্নত দেশে এই গড় আয়ুর মান প্রায় ৮০ বছর।৮
