এ প্রসঙ্গে দারিদ্র্যের কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। অনেক সভ্যতাই দারিদ্র্যকে তাদের ভুল-ত্রুটি ভরা সমাজের একটি অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবেই বিবেচনা করে এসেছে। নিউ টেস্টামেন্ট যিশুকে ক্রশবিদ্ধ করার কিছুক্ষণ আগে একজন নারী তাকে ৩০০ দিনেরিয়াস সমমূল্যের দামী তেল মালিশ করে দিচ্ছিলেন। এই দৃশ্য দেখে যীশুর অনুসারীরা আর্তনাদ করে তাকে এত দামী তেল মালিশ যীশুর গায়ে মালিশ না করে এই পরিমাণ অর্থ গরীব দু:খীদের মাঝে বিতরণ করে দিতে বললেন। যীশু তার অনুসারীদের শান্ত করলেন এবং রমণীকে বললেন ‘তুমি সাহায্য করার জন্য গরিবদের সবসময়ই তোমার আশেপাশে পাবে কিন্তু আমার সেবা করার এই তোমার শেষ সুযোগ’ (মার্ক ১৪:৭)। আজকের দিনে, যিশুর এই বক্তব্যের সাথে সহমত প্রকাশ করবে এমন লোকের সংখ্যা ক্রমশই কমে আসছে। দারিদ্র্যকে বর্তমানে একটি কৌশলগত সমস্যা হিসাবেই বিবেচনা করা হয় যার সমাধান অসম্ভব নয়। বর্তমানকালের সবারই সাধারণ বিশ্বাস হল কৃষি, অর্থনীতি, চিকিৎসা এবং সমাজবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক উদ্ভাবনগুলোকে কাজে লাগিয়ে একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা গেলে অবশ্যই দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
এমনকি, পৃথিবীর অনেক অংশই বর্তমানে দারিদ্র্যের চূড়ান্ত অমানবিক রূপ থেকে মুক্তি পেয়েছে। মানুষের ইতিহাসে আমরা সমাজে দুই ধরনের দারিদ্র্য দেখতে পাই। একটি সামাজিক দারিদ্র্য, যেখানে কিছু ব্যক্তি অন্য সকল ব্যক্তিকে সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে রাখে। দুই, জৈবিক দারিদ্র্য, যেখানে পরিমিত খাদ্য আর বাসস্থানের অভাবে কিছু মানুষ মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকে। সামাজিক দারিদ্র্য দূর করা সম্ভবত কখনই সম্ভব হবে না, তবে পৃথিবীর অনেক দেশেই জৈবিক দারিদ্র্যের বিষয়টি এখন ইতিহাস।
অথচ নিকট অতীতের ইতিহাস দেখলে আমরা বুঝতে পারব বেশিরভাগ মানুষই তখন দারিদ্র্যসীমার খুব কাছাকাছি বাস করত। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করলে একজন মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালরির সংস্থান করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই, হিসেবের একটু গরমিল বা কোন প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্ভোগ মানুষকে ঠেলে দিত অনিবার্য অনাহারের দিকে। এসব দুর্যোগ তাই প্রায়ই জনপদজুড়ে জন্ম দিত দুর্ভিক্ষের, যার পরিণাম লাখ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু। আজকের দিনে দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষেরই বেঁচে থাকার ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা আছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষ বীমা করার মাধ্যমে তার অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ-আপদ মোকাবেলা করতে পারে, সরকারী এবং অসংখ্য বেসরকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা, বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। কোনও অঞ্চলে দুর্যোগ দেখা দিলে সারা পৃথিবীর মানুষ সেই দুর্যোগ সৃষ্ট মানবেতর পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। পৃথিবীজুড়ে মানুষ আজও নানারকম প্রতিকূলতা, বঞ্চনা আর দারিদ্র্যজনিত অসুস্থতার শিকার হয়, তবে পৃথিবীর অধিকাংশ এলাকাতেই মানুষ আজ অনাহারে মারা যায় না। এমনকি, পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে মানুষ আজ খাদ্যের অভাবের কারণে নয় বরং মাত্রাতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
গিলগামেশ প্রকল্প
এখন পর্যন্ত যে সমস্যাগুলোর সমাধান মানুষের সাধ্যের অতীতই থেকে গেছে, সেগুলোর মাঝে হতাশা, কৌতূহল আর গুরুত্বের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে যে সমস্যাটি, সেটি হলো ‘মৃত্যু’। আধুনিক যুগের শেষভাগের আগ পর্যন্ত বেশিরভাগ ধর্ম এবং মতবাদ ‘মৃত্যু’কে মানবজীবনের এক অনিবার্য নিয়তি হিসেবেই বিবেচনা করেছে। এমনকি, অনেক ধর্মবিশ্বাস মৃত্যুকেই একটি অর্থপূর্ণ জীবনের প্রধানতম উপাদান হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। অমর মানুষের একটি সমাজে ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম বা প্রাচীন মিশরীয় ধর্মের অস্তিত্বের কথা একবার ভেবে দেখুন। এই ধর্মবিশ্বাসগুলো মানুষকে শিখিয়েছে মৃত্যুকে অস্বীকার করার চেষ্টা না করে বা চিরকাল পৃথিবীতে বসবাসের স্বপ্ন না দেখে মানুষের উচিত সঠিক কাজের মাধ্যমে নিজেকে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুত করা। সেসময়কার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতেরা মৃত্যুকে অর্থপূর্ণ আর মহিমান্বিত করে তোলার চেষ্টায় মগ্ন ছিলেন, মৃত্যুকে ফাঁকি দেয়ার কথা তারা ভাবতেও পারেননি।
মৃত্যু সংক্রান্ত পৌরাণিক কাহিনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হলে প্রাচীন সুমেরের গিলগামেশের কাহিনী। এই কাহিনীর নায়ক ছিলেন উরুক রাজ্যের রাজা গিলগামেশ (King Gilgamesh of Uruk)। গিলগামেশ ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সামর্থ্যবান পুরুষ যিনি যুদ্ধে যে কাউকে অনায়াসে পরাস্ত করতে পারতেন। একদিন গিলগামেশের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু ইনকিদু মারা গেলেন। শোকে স্তব্ধ হয়ে গিলগামেশ অনেকদিন ইনকিদুর লাশের পাশে বসে থাকলেন। একদিন ইনকিদুর লাশের নাসারন্ধ্র দিয়ে কিলবিল করে একটি পোকা বের হয়ে এল। এই দৃশ্য দেখে গিলগামেশ প্রচন্ড ভয় আর হতাশায় কুঁকড়ে গেলেন এবং ঠিক করলেন তিনি মৃত্যুকে জয় করবেন। অনন্তজীবন লাভ করার জন্য তিনি যে করেই হোক একটা উপায় বের করবেন। এই লক্ষ্যে গিলগামেশ যাত্রা শুরু করলেন- চষে ফেললেন সমস্ত পৃথিবী, শিকার করলেন সিংহ, লড়াই করলেন ভয়ঙ্কর কাঁকড়াবিছে-মানব এর সাথে, পৌছে গেলেন পাতালপুরীতে। সেখানে গিয়ে তিনি পাথর দৈত্য উরশানবি আর মৃত্যু নদী পারাপারের মাঝির সাথে লড়াই করে তাদের চূর্ণ-বিচুর্ণ করলেন এবং খোঁজ পেলেন প্রাচীনতম বন্যার শেষ উত্তরজীবী উটনাপিশটিমের। কিন্তু, এতকিছু করেও শেষমেষ গিলগামেশের চেষ্টা ব্যর্থ হল। তিনি শূণ্য হাতে, আগের মতই মরণশীল বাড়ি ফিরে আসলেন। কিন্তু এতদিনে তিনি নতুন একটি বিষয় জেনেছেন- ঈশ্বর যখন মানুষকে সৃষ্টি করেন, তখন মৃত্যুকে তার জীবনের অনিবার্য নিয়তি হিসেবেই নির্দিষ্ট করে দেন, মানুষের উচিত এই অনিবার্য নিয়তির কথা মাথায় রেখেই সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে শেখা।
