প্রাচীন রোমের কথাই বলুন, অথবা সেকালের চীনের কথা- বেশিরভাগ সমরনায়ক এবং দার্শনিকের কেউই নতুন নতুন অস্ত্রের উদ্ভাবনকে তাদের অবশ্যকর্তব্য বলে মনে করতেন না। চীনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক আবিষ্কার ছিল বারুদ। ডাওইস্ট (Daoist) আলকেমিস্ট যারা মানুষের অমরত্বের সমাধান নিয়ে কাজ করতেন, এই আবিষ্কার ছিল তাদের এক আকস্মিক দুর্ঘটনার ফসল। কেউ ভাবতেই পারেন, বারুদ আবিষ্কারই চীনকে দুনিয়ার উপর প্রভুত্ব স্থাপনে সহায়তা করেছে। কিন্তু মজার কথা হল, চাইনিজরা মূলত আতশবাজি বানানোর কাজেই তাদের উদ্ভাবিত এই বারুদ ব্যবহার করত। এমনকি চীনের বিখ্যাত সং সাম্রাজ্য যখন মোঙ্গলদের আক্রমণের মুখে পড়ল, তখনও চীনের সম্রাট কোন বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির লক্ষ্যে ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’ এর আদলে কোন মধ্যযুগীয় প্রকল্প শুরু করেননি। বারুদ আবিষ্কারের প্রায় ৬০০ বছর পর, পঞ্চদশ শতকে এসে আফ্রো-এশিয়ান যুদ্ধক্ষেত্রে বারুদ যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণের প্রধান নিয়ামক হিসাবে আবির্ভূত হল। বারুদের এই ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাকে উপলব্ধি করতে মানুষের এত সময় লাগল কেন? কারণ, তখনকার রাজা, পণ্ডিত বা ব্যবসায়ীদের কেউই ভাবতেন না যে নতুন সামরিক প্রযুক্তি তাদের নিরাপত্তার কাজে লাগতে পারে বা তাদেরকে আরও ধন সম্পদের অধিকারী করে তুলতে পারে।
পঞ্চদশ বা ষোড়শ শতকের দিকে এসে এ অবস্থায় পরিবর্তন শুরু হলেও নতুন নতুন অস্ত্র তৈরির গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য অর্থ বিনিয়োগের ব্যাপারে উৎসাহী হতে শাসকদের আরও দুই শতাব্দী লেগে গেছে। ততদিন পর্যন্ত প্রযুক্তির চেয়ে সৈন্য এবং মালামাল সরবরাহের প্রক্রিয়া এবং রণকৌশলই যুদ্ধ জয়ের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। নেপোলিয়ানের যে দক্ষ সেনাবাহিনী অস্টারলিৎজ (১৮০৫) এ ইউরোপীয় শক্তিকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল তাদের অস্ত্র ছিল মোটামুটি ষোড়শ লুইয়ের সেনাবাহিনীর সমমানের। নেপোলিয়ান নিজে একজন যুদ্ধবাজ সমরনায়ক হলেও, বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকেরা উড়ন্ত যান, সাবমেরিন বা রকেট তৈরির ব্যাপারে বিনিয়োগ করতে অনুরোধ করা সত্ত্বেও তাতে তিনি এ ব্যাপারে তেমন উৎসাহ দেখাননি।
পুঁজিবাদী সমাজের উদ্ভব এবং শিল্প বিপ্লবের পরেই কেবল বিজ্ঞান, শিল্প এবং সামরিক প্রযুক্তি একসাথে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে শুরু করেছে। তাদের সবার এক রাস্তায় চলার এই সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে পৃথিবীর প্রচলিত রূপ।
একটা নতুন কিছু করো
বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের আগ পর্যন্ত মানুষের বেশিরভাগ সংস্কৃতি পরিবর্তনে বিশ্বাসী ছিল না। তারা ভাবত, অতীত সবচেয়ে ঐশ্বর্যমণ্ডিত, বর্তমান অতীতেরই প্রতিচ্ছবি অথবা বর্তমান অতীতের ক্ষয়িষ্ণু রূপ। যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিয়মগুলোকে কঠোরভাবে অনুসরণের মাধ্যমেই অতীতের স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনা সম্ভব এবং মানুষের বুদ্ধির কাজ হলো দৈনন্দিন জীবনে এই ধারণাটির গুরুত্ব সঠিকভাবে অনুধাবন করা। এটা ধরেই নেওয়া হত যে, পৃথিবীর মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান জানা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। মোহাম্মদ, যিশু, বুদ্ধ বা কনফুসিয়াসের মত সর্বজ্ঞ মহাপুরুষরাই যখন দুর্ভিক্ষ, মহামারী, দারিদ্র্য এবং যুদ্ধ দূর করতে পারেননি, তখন আমাদের মত সাধারণ মানুষের সে চেষ্টা করা ধৃষ্টতা ছাড়া আর কী হতে পারে!
অনেক ধর্মই এমন বিশ্বাস করত যে, একদিন কোন মহাপুরুষ আবির্ভূত হবেন এবং পৃথিবীর বুক থেকে সকল যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এমনকি সকল জরা-মৃত্যু দূর করবেন। মানুষ নিজেই নতুন জ্ঞান এবং আবিষ্কারের দ্বারা এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে পারে এরকম ধারণা কেবল হাস্যকর নির্বুদ্ধিতাই নয় বরং অর্বাচীন আত্মাভিমানের নামান্তর। বাবেলের টাওয়ার, ইকারাসের গল্প, গোলেম এর কাহিনী এবং আরও অসংখ্য পৌরাণিক কাহিনী মানুষকে এই শিক্ষা দিয়েছিল যে, কোন ব্যাপারেই সীমা লঙ্ঘন করার চেষ্টা পরিণামে মানুষের জন্য ব্যর্থতা আর দুর্ভোগই ডেকে আনে।
আধুনিক যুগের সংস্কৃতি ‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিসই আমরা এখনও জানি না’ এ কথা যখন স্বীকার করে নিল এবং এই স্বীকারোক্তির সাথে যখন যুক্ত হলো ‘বিজ্ঞানের আবিষ্কার মানুষকে নতুন নতুন শক্তির সন্ধান দিতে পারে’ এই ধারণা, তখন মানুষ ক্রমাগত পরিবর্তন ও অগ্রগতির ধারণায় আস্থা স্থাপন করল। বিজ্ঞান যখন একের পর এক নানা অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান করতে শুরু করল, মানুষের মনে এমন ধারণা জন্মাল যে নতুন জ্ঞান আহরণের মাধ্যমেই মানবজাতির যে কোনও সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। দারিদ্র্য, রোগ-ব্যাধি, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, বার্ধক্য এমনকি মৃত্যুও মানুষের অপরিহার্য নিয়তি নয়। সেগুলো মানুষের অজ্ঞানতারই ফসলমাত্র।

এ ব্যাপারে বজ্রপাত সংক্রান্ত উদাহরণটি বেশ জনপ্রিয়। অনেক সভ্যতাই বিশ্বাস করত বজ্রপাত হল পাপী লোকেদের শায়েস্তা করার জন্য আকাশ থেকে নেমে আসা দেবতার হাতুড়ি। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকা পরীক্ষাটি করলেন। আকাশের বজ্রপাতের মাঝে ঘুড়ি উড়িয়ে প্রমাণ করলেন আকাশের বজ্রপাতে বিদ্যুৎ ছাড়া আর কিছুই নেই। বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্কলিনের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, বিদ্যুৎ শক্তি সম্পর্কে তার জ্ঞান তাকে সাহায্য করল আকাশের বিদ্যুৎকে মাটিতে নামিয়ে আনতে, দেবতার হাত থেকে তার শাস্তির হাতুড়ি কেড়ে নিতে।