এদিকে জার্মান বিজ্ঞানীরা যখন রকেট আর যুদ্ধবিমান তৈরিতে ব্যস্ত, ততক্ষণে আমেরিকা ম্যানহাটন প্রকল্পের আওতায় বানাতে শুরু করেছে আণবিক বোমা। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসের শুরুর দিকে যখন ম্যানহাটন প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হল, ততদিনে জার্মানরা মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসর্মপণ করে ফেলেছে। বিরূদ্ধশক্তিগুলোর মাঝে একমাত্র জাপানই তখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আমেরিকান সেনাবাহিনী জাপান অধিকৃত কিছু ভূখন্ড দখলের সিদ্ধান্ত নিল। জাপানিরা প্রাণ দিয়ে হলেও এই আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করলেন। জাপানিদের গৃহীত পদক্ষেপ, আত্মঘাতী বোমা হামলা (Kamikaze) সবার সামনে তাদের এই সংকল্পের দৃঢ়তা তুলে ধরল। আমেরিকার সেনাপ্রধানরা তাদের রাষ্ট্রপতি হ্যারি এস ট্রুম্যানকে জানালেন- এভাবে চললে জাপান দখলের এই অভিযানে লক্ষ লক্ষ আমেরিকান সৈন্যকে প্রাণ দিতে হতে পারে এবং এই প্রক্রিয়া হয়তো সমস্ত যুদ্ধটাকেই ১৯৪৬ সাল অব্দি দীর্ঘায়িত করবে। ট্রুম্যান এই সমস্যা সমাধানে তাদের নতুন উদ্ভাবিত বোমা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলেন। দুই সপ্তাহে জাপানে মাত্র দুটো আণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হল, আত্মসমর্পণে বাধ্য হল প্রতিরোধে দৃঢ়সংকল্প জাপান। আর সাথে সাথেই যুদ্ধেরও ঘটল ইতি।
অবশ্য বিজ্ঞান কেবল আক্রমণের হাতিয়ারই তৈরি করে না, আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনে অনেক আমেরিকানই মনে করেন যে, সন্ত্রাসবাদের প্রকৃত সমাধান আছে তথ্য-প্রযুক্তির কাছে, রাজনীতির পথে নয়। তাদের বিশ্বাস, ন্যানোটেকনোলজির পেছনে আরও কয়েক লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা গেলেই তাদের তৈরি ক্ষুদে বায়োনিক গোয়েন্দা উড়ে যাবে আফগানদের গুহায়, ইয়েমেনের ইহুদিদের ধ্বংসাবশেষে বা উত্তর আফ্রিকার যাযাবরদের তাঁবুতে। আর সেটা করা গেলে ওসামা বিন লাদেনের উত্তরসূরীদের এক কাপ চা বানানোর খবর পর্যন্ত ল্যাংলিতে আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থার সদর দপ্তরে তৎক্ষণাৎ পৌঁছে দেবে সেসব মাছিসদৃশ ক্ষুদে গোয়েন্দার দল। কিংবা মস্তিষ্কের গবেষণার পেছনে আরও লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করুন, প্রতি বিমানবন্দরে থাকবে সব মানুষের মস্তিষ্ক স্ক্যান করার এফ এম আর আই (FMRI) যন্ত্র যা নিমিষেই বলে দেবে কোন মানুষটি তার মাথার ভেতর ধ্বংসাত্মক কোন পরিকল্পনা আঁটছে বা কোন মানুষটি রেগে আছে। তাদের এইসব বিশ্বাস বা ধারণাগুলো কি আদৌ সমাধান করতে পারবে মানুষের সমস্যার? কে জানে! উড়ন্ত বায়োনিক গোয়েন্দামাছি বা মস্তিষ্কের চিন্তা পড়তে পারা যন্ত্র আবিষ্কার করা কি আদতে মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে? মনে হয় না। কিন্তু এসব মনে হওয়া বা না হওয়ায় আসলেই কিছু যায় আসে না, কারণ আপনি যখন এই লাইনগুলো পড়ছেন, তখনই হয়তো আমেরিকার নিরাপত্তা অধিদপ্তর ন্যানোটেকনোলজি এবং মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করার ল্যাবরেটরীতে এসব ধারণা এবং আরও নতুন অনেক ধারণা নিয়ে কাজ করার জন্য কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন।
আশ্চর্য ব্যাপার হল, ট্যাংক থেকে শুরু করে আণবিক বোমা কিংবা বায়োনিক ক্ষুদে গোয়েন্দা, সামরিক কাজে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের এই প্রবণতা কিন্তু খুব বেশিদিনের পুরনো নয়। উনবিংশ শতকের আগে পর্যন্তও বেশিরভাগ সামরিক বিপ্লবগুলোরই কারণ ছিল গোষ্ঠী সম্পর্কের পরিবর্তন, নতুন প্রযু্ক্তির উন্মেষ নয়। সে সময়, যখন দুটো অচেনা সভ্যতার মানুষ প্রথমবারের মত একে অপরের সাক্ষাৎ পেত, তখন তাদের মাঝে প্রযুক্তিগত তারতম্য মাঝে মধ্যে কিছু পার্থক্য গড়ে দিত। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রেও খুব কম সংখ্যক মানুষই প্রযুক্তিগত তারতম্য বাড়ানো বা কমানো নিয়ে সচেতনভাবে চিন্তা করেছে। সেকালের অধিকাংশ সাম্রাজ্যাই কোন জাদুকরী প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠেনি, শাসকেরাও তাই প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামাতেন না। উন্নত তীর বা তরবারির কল্যাণে আরবরা সাসানিড সাম্রাজ্য জয় করেনি, সেলজুকরা (Seljuk) কোন অর্থেই প্রযুক্তিগতভাবে বাইজেনটাইনদের (Byzantine) থেকে এগিয়ে ছিল না এবং মোঙ্গলরা কোনও শক্তিশালী নতুন অস্ত্রের জোরে চীনা সাম্রাজ্য অধিকার করেনি। বরঞ্চ এ সব ক্ষেত্রেই বিজয়ী দলের থেকে বিজিতরাই সমর এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রযুক্তিতে এগিয়ে ছিল।
এক্ষেত্রে রোমান সেনাবাহিনী একটি ভালো উদাহরণ হতে পারে। সে সময়ে রোমান সেনাবাহিনী প্রযুক্তিগত দিক থেকে কার্থেজ, মেসেডোনিয়া বা সেলুসিড সাম্রাজ্যের চেয়ে কোন অংশে উন্নত না হলেও তারাই ছিল পৃথিবী সেরা। দক্ষ সাংগঠনিক শক্তি, ইস্পাতদৃঢ় নিয়মনিষ্ঠা এবং বিশাল জনশক্তিই ছিল তাদের সেরা হয়ে উঠবার প্রধান নিয়ামক। প্রযুক্তির উন্নতির জন্য রোমান সেনাবাহিনী কখনও গবেষণা এবং উদ্ভাবন অধিদপ্তর গড়ে তোলেনি। শেষের প্রায় একশ’ বছর জুড়ে তাদের ব্যবহৃত হাতিয়ারের প্রকৃতি মোটামুটি একই রকম ছিল। সেনানায়ক সিপিও আমিলিনাস, যার নেতৃত্বাধীন বাহিনী খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে কার্থেজ সাম্রাজ্যকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল এবং পরাজিত করেছিলন নুমানশিয়ানদের (Numantian), তিনি যদি কোন জাদুমন্ত্রবলে ৫০০ বছর পর কনস্টানটিন দি গ্রেট এর রাজত্বে এসে উদয় হন, তবে তার বাহিনীর একটা ভাল রকম সম্ভাবনা থাকবে কনস্টানটিনের বাহিনীকে পরাজিত করার। এখন চিন্তা করে দেখুন মাত্র কয়েক শতাব্দী আগের নেপোলিয়ানের মত একজন বিখ্যাত সেনানায়ক যদি হুট করে আজকের দুনিয়ায় এসে আবির্ভূত হন এবং তার সংঘবদ্ধ বাহিনী নিয়ে এ যুগের কোন রাষ্ট্রের বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন, তবে তার ফলাফল কী হতে পারে। নেপোলিয়ানের রণকৌশল অসাধারণ এবং তার সেনাবাহিনীর সবাই নিখুঁত, পেশাদার যোদ্ধা, কিন্তু আজকের দিনের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের কাছে তাদের রণকৌশল হয়ে পড়বে নিতান্তই অর্থহীন এবং অকেজো।
