১৬২০ সালে ফ্রান্সিস বেকন ‘দি নিউ ইন্সট্রুমেন্ট’ নামে এক বৈজ্ঞানিক ইশতেহার প্রকাশ করেন। এই ইশতেহারে তিনি বলেন- ‘জ্ঞানই শক্তি’। কোন জ্ঞান আমাদের নতুন শক্তিতে বলীয়ান করতে পারে কিনা সেটাই জ্ঞানের প্রধান পরীক্ষা, জ্ঞানের বিষয়টি কতটুকু সত্য সেটা তার পরীক্ষার বিষয় নয়। বিজ্ঞানীরা সাধারণত ধরেই নেন যে, কোন তত্ত্বই শতভাগ সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, সত্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হওয়া জ্ঞানের জন্য তেমন জরুরী কোন বিষয় নয়। সবচেয়ে জরুরী বিষয় হল তার উপযোগিতা। যে তত্ত্ব আমাদের নতুন কিছু করবার সক্ষমতা দান করে সেটাই প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়।
বিগত কয়েক শতকে, বিজ্ঞান আমাদেরকে অনেক নতুন সক্ষমতা দান করেছে। এর মাঝে মৃত্যুর হার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার অনুমান করার মত বিষয়গুলো মানসিক সক্ষমতা। বিজ্ঞানের সুবাদে প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে আমরা এর চেয়েও বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছি। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সম্পর্ক এতটাই দৃঢ় যে অনেকসময় এদেরকে আলাদা করে চেনাই মুশকিল হয়ে পড়ে। এমনকি বর্তমানে আমরা অনেক সময় এভাবে ভাবি যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন সম্ভব নয়। যে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে নতুন কোনো প্রযুক্তির উদ্ভাবন হয় না, সে বৈজ্ঞানিক গবেষণার তেমন কোন মূল্য নেই।
আসলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মধ্যকার এই সম্পর্কের ব্যাপারটি কিন্তু বেশ নতুন। ১৫০০ সালের পূর্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা দুটি ক্ষেত্র। সপ্তদশ শতকের শুরুতে ফ্রান্সিস বেকন যখন এই দুটি ক্ষেত্রকে একত্রিত করলেন, তখন তা ছিল একটি বৈপ্লবিক ঘটনা। সপ্তদশ শতক এবং অষ্টাদশ শতকে এই বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মধ্যকার এই সম্পর্ক প্রকৃত পূর্ণতা পায় উনবিংশ শতকে। আঠারশ সালেও কোন শাসক একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠনের জন্য কিংবা একজন ধনকুবের ব্যবসায় সফলতা অর্জনের জন্য পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান বা অর্থনীতিতে গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন না।
অবশ্য এ নিয়মের যে ব্যতিক্রম ছিল না এমন দাবি আমি করছি না। একজন মাঝারি মানের ঐতিহাসিক অতীতের ঘটনাগুলোর আপাতঃ কারণ অনুসন্ধান করতে পারেন। কিন্তু, সত্যিকারের ভালো একজন ঐতিহাসিক এই আপাত কারণগুলোর আড়ালে লুকানো মূল কারণটাও দেখতে পান। মোটাদাগে দেখলে বেশিরভাগ প্রাক-আধুনিক যুগের শাসক এবং ব্যবসায়ীরা নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে মহাবিশ্বের প্রকৃতি জানার জন্য সম্পদ বিনিয়োগ করেননি এবং সে সময়ের চিন্তাবিদ বা গবেষকরাও তাদের চিন্তা বা গবেষণাকে কোন যন্ত্রের প্রযুক্তিতে পরিণত করার জন্য উদগ্রীব ছিলেন না। সেকালের শাসকেরা সেইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পেছনে বিনিয়োগ করতেন যাদের লক্ষ্য ছিল আবহমানকাল ধরে চলে আসা জ্ঞানকে লালন করা, ছড়িয়ে দেয়া এবং রাজ্যের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা পালন করা।
সে সময়েও নানা জায়গায় মানুষ বিচ্ছিন্নভাবে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। তবে সেসবের বেশিরভাগই ছিল অশিক্ষিত, দক্ষ কারিগরের অসংখ্যবার চেষ্টার ফসল, কোন উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিতের পদ্ধতিগত বৈজ্ঞানিক গবেষণার অর্জন নয়। যারা গরুর গাড়ি বানাতেন তারা বছরের পর বছর ধরে একই পদ্ধতিতে, একই উপাদান ব্যবহার করে গরুর গাড়ি বানাতেন। গরুর গাড়ির নতুন মডেল উদ্ভাবনের জন্য তাদের বার্ষিক লাভের একটা অংশ তারা গবেষণা কাজে বরাদ্দ করতেন না। মাঝে মাঝে গাড়ির নকশায় পরিবর্তন আসত কিন্তু এসবের মূলে ছিল স্থানীয় কারিগরদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা যাদের ইউনিভার্সিটির ডিগ্রী থাকা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রেই তারা ছিলেন অক্ষরজ্ঞানহীন।
সরকারী এবং বেসরকারি সকল খাতের জন্যই এই একই নিয়ম প্রযোজ্য ছিল। আধুনিক রাষ্ট্র তার রাষ্ট্র নীতি, জ্বালানী খাত, স্বাস্থ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সকল ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত নেবার আগে বিজ্ঞানীদের শরণাপন্ন হন। প্রাচীন রাষ্ট্রগুলোতে এমনটা হত না। এই দুই সময়ের মধ্যকার পার্থক্যটা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় যুদ্ধাস্ত্রের দিকে নজর দিলে। যখন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডুয়াইট আইসেনহাওয়ার ১৯৬১ সালে শিল্প ও সেনাবাহিনীর ক্রমবর্ধমান শক্তির ব্যাপারে সকলকে সতর্ক করেন তখন আসলে একটি ব্যাপার তিনি তার কথায় উহ্য রেখে যান। তার উচিত ছিল সকলকে শিল্প, সেনাবাহিনী ও বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান শক্তির ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া। কারণ, বর্তমানের যুদ্ধগুলো বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফসল। সারা পৃথিবীর সকল বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত গবেষণার অধিকাংশই পরিচালনা ও অর্থায়ন করে কোনো না কোনো সেনাবাহিনী।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন দুপক্ষের অন্তহীন ধ্বংস আর হত্যার ক্ষেত্রে পরিণত হল, তখন দুপক্ষই এ অচলাবস্থা নিরসন করে নিজেদের দেশকে বাঁচানোর জন্য বিজ্ঞানীদের শরণাপন্ন হলেন। এই ডাকে সাড়া দিলেন বিজ্ঞানী নামের সাদা পোশাকের মানুষগুলি আর তাদের ল্যাবরেটরি থেকে একের পর এক বেরোতে লাগল চমকে দেয়ার মত অগণিত অস্ত্র- যুদ্ধবাজ বিমান, বিষাক্ত গ্যাস, ট্যাঙ্ক, ডুবোজাহাজ, তাক লাগানো মেশিনগান, কামান, রাইফেল, বোমা আরও কত কী!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজ্ঞানের প্রভাব ছিল আরও ব্যাপক। ১৯৪৪ সালের শেষ দিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পতন একরকম নিশ্চিত হয়ে পড়ে। এর এক বছর আগেই ইতালিতে জার্মানদের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রনায়ক মুসোলিনির পতন ঘটে এবং তারা মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। মিত্রবাহিনীর ব্রিটিশ, আমেরিকান এবং সোভিয়েত সৈন্যরা যখন জার্মানিকে একরকম কোণঠাসা করে ফেলেছে, তখনও জার্মান সেনারা আত্মসমর্পণ না করে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জার্মান সৈন্য এবং সাধারণ নাগরিকদের এই বিশ্বাস ছিল যে সবকিছু এখনও শেষ হয়ে যায়নি, শেষ মুহূর্তে হলেও তাদের বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীরা ভি-২ রকেট বা জেটচালিত যুদ্ধবিমানের মত এমন কিছু মারাত্মক অস্ত্র তৈরি করে ফেলবে যা পাশার দান পুরোপুরি উল্টে দেবে এবং শেষমেশ জার্মানরাই যুদ্ধে জয়ী হবে।