তাদের হিসাব অনুযায়ী, ১৭৬৫ সাল নাগাদ বিধবা এবং নাবালক সন্তানদের আর্থিক সাহায্যের জন্য গঠন করা এই তহবিলের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ৫৮ হাজার তিনশ আটচল্লিশ পাউন্ড এ। তাদের এই গাণিতিক হিসাব বাস্তবের সঞ্চয়ের পরিমাণের সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে গিয়েছিল। ১৭৬৫ সালে এসে দেখা গেল তাদের তহবিলের প্রকৃত সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার তিনশ সাতচল্লিশ পাউন্ডে। অর্থাৎ, অনুমিত সঞ্চয়ের পরিমাণের সাথে মাত্র এক পাউন্ডের হেরফের! এই হিসাব অতীতের হাবাক্কুক, জেরেমি বা সেন্ট জনের করা ভবিষ্যতবাণীর থেকে অনেক বেশি সঠিক ছিল। বর্তমানে, ‘স্কটিশ উইডোজ’ নামে পরিচিত ওয়েবস্টার এবং ওয়ালেসের তহবিল দুনিয়ার অন্যতম সেরা অবসর ভাতা এবং বীমা কোম্পানী।৭
পরবর্তীতে দুইজন যাজকের সম্ভাবনা তত্ত্ব নিয়ে এইসব হিসাবনিকাশ কেবলমাত্র অ্যাকচুয়ারিয়াল (actuarial) বিদ্যার ভিত্তি স্থাপনের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছে অবসর ভাতা, বীমা ব্যবসা এবং জনসংখ্যাতত্ত্বের (আরেকজন উচ্চপদস্থ অ্যাংলো যাজক রবার্ট ম্যালথাস এই বিদ্যার প্রবক্তা) মূল প্রেরণা। একসময় আবার জনসংখ্যাতত্ত্বই হয়ে ওঠে সেই ভিত্তি, যার উপর দাঁড়িয়ে চার্লস ডারউইন (যিনি একটি অ্যাংলো গির্জার যাজক প্রায় হয়েই গিয়েছিলেন) নির্মাণ করেন তাঁর বিখ্যাত ‘বিবর্তন তত্ত্ব’। একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে জীবের জিনে রূপান্তরের (Mutation) মাধ্যমে কোন কোন প্রজাতির উদ্ভব ঘটবে তা অনুমানের জন্য যদিও কোন গাণিতিক সমীকরণ নেই, কিন্তু জিনবিজ্ঞানীরা সম্ভাবনা তত্ত্ব ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীতে একটি নির্দিষ্ট জিনগত রূপান্তর ঘটার সম্ভাবনা কতটুকু তা হিসাব করতে পারেন। সম্ভাবনা তত্ত্বের এইসব ধারণা অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং অন্যান্য সামাজিক এবং প্রকৃতি বিদ্যার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এমনকি পদার্থবিজ্ঞানও নিউটনের পদার্থবিজ্ঞানের পুরনো সূত্রগুলোকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় ব্যবহৃত সম্ভাবনা তত্ত্বের প্রয়োগ দ্বারা আরও সুসংগত, অধিকতর সম্পূ্র্ণরূপে প্রকাশ করেছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসের খুব গভীরে না গেলেও একথা আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, নতুন এই গাণিতিক পদ্ধতির চর্চা আমাদের অগ্রগতিতে কতটা ভূমিকা পালন করেছে। ইতিহাসের প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই গণিত ছিল জটিল, উচ্চস্তরের জ্ঞান যা কিনা শিক্ষিত লোকেদের পক্ষেও বোঝা অনেকসময় সম্ভব হত না। মধ্যযুগের ইউরোপে যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ এবং অলঙ্কারশাস্ত্রের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল শিক্ষাব্যবস্থার ভিত যেখানে সাধারণ হিসাব-নিকাশ আর জ্যামিতি ছাড়া গণিতের অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষাদানের সুযোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে। পরিসংখ্যান তখন সবার কাছেই অচেনা। সুতরাং, সেকালে জ্ঞানের সকল শাখার প্রভু হিসেবে রাজত্ব করত ধর্মতত্ত্ব।
আজকের দিনে খুব কম ছাত্রই অলংকারশাস্ত্র অধ্যয়ন করে, যুক্তিবিদ্যা হয়ে পড়েছে কেবলমাত্র দর্শনের ছাত্রদের পাঠ্য বিষয় আর ধর্মতত্ত্ব হয়ে পড়েছে সভা-সমিতির মঞ্চে বক্তৃতার বিষয়বস্তু। অন্যদিকে দিন দিন আরও বেশি সংখ্যক ছাত্র গণিতের অধ্যয়নের ব্যাপারে আগ্রহী হচ্ছে বা আরও বেশি সংখ্যক ছাত্রকে বাধ্য করা হচ্ছে গণিত অধ্যয়নের ব্যাপারে। বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের চর্চার ব্যাপারে তৈরি হয়েছে অপরিসীম আগ্রহ। বিশুদ্ধ বিজ্ঞান বলতে এখানে গাণিতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা বিজ্ঞানের শাখাসমূহের কথা বলা হচ্ছে। এমনকি ভাষাতত্ত্ব, মনোবিজ্ঞানের মত জ্ঞানের শাখাগুলো যাদেরকে একসময় মানবিক জ্ঞানের অংশ হিসেবে ধরা হত, তাদেরও ক্রমাগত গণিতের উপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে এবং তারা নিজেদেরকে বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টায় ব্যস্ত। পরিসংখ্যানের কোর্স এখন কেবল পদার্থবিজ্ঞান আর জীববিজ্ঞানের জন্যই নয় বরং মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের জন্যও বাধ্যতামূলক।
আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই সেখানকার মনোবিজ্ঞান বিভাগের সিলেবাসের প্রথম বাধ্যতামূলক কোর্সের নাম হল- ‘মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় পরিসংখ্যান ও পদ্ধতিগত মনোবিজ্ঞানের সূচনা’। দ্বিতীয় বর্ষের মনোবিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য আবশ্যিক কোর্স হল- ‘মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত পরিসংখ্যান পদ্ধতি’। মানুষের মনকে পরিপূর্ণরূপে বোঝার জন্য এবং তার মানসিক সুস্থতা বিধানের জন্য পরিসংখ্যান অধ্যয়ন জরুরী- কনফুসিয়াস, বুদ্ধ, যিশু বা মোহাম্মদকে এ ধরনের কোন কথা বলা হলে তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতেন।
জ্ঞানই শক্তি
বিজ্ঞানের গাণিতিক ভাষা আমরা সহজে বুঝতে পারি না এবং অনেকসময় এর মূল বক্তব্য আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে সাংঘর্ষিক বলে বেশিরভাগ মানুষের কাছেই আধুনিক বিজ্ঞান বেশ দুর্বোধ্য। পৃথিবীর প্রায় সাতশ কোটি মানুষের মাঝে কজনই বা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, কোষীয় জীববিজ্ঞান বা ম্যাক্রো-অর্থনীতি বোঝেন? কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজ্ঞানের প্রতি সাধারণ মানুষের যে অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস তার প্রধান কারণ বিজ্ঞান আমাদেরকে দিয়েছে অবিশ্বাস্য ক্ষমতা, নতুন সম্ভাবনার সন্ধান। একটি দেশের প্রেসিডেন্ট এবং সামরিক কর্মকর্তা হয়ত নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কে জানেন না, তবে নিউক্লিয়ার বোমার আগ্রাসী ভূমিকা কত ভয়ঙ্কর হতে পারে সে সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট ধারণা রাখেন।
