নিউটন দেখালেন যে, প্রকৃতির নিয়মকে গণিতের ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব। তার বইয়ের কিছু কিছু অধ্যায়ের মূল লক্ষ্যই ছিল সুস্পষ্ট গাণিতিক সমীকরণ প্রতিপাদন করা। কিন্তু এরপর বিজ্ঞানীরা যখন জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং মনোবিজ্ঞানের বিষয়গুলোকে নিউটনের মত সমীকরণ আকারে প্রকাশ করতে গেলেন, তখন তারা খেয়াল করলেন যে এই বিষয়গুলোতে কিছু বাড়তি জটিলতা আছে যার কারণে এগুলোকে ঠিক পদার্থবিজ্ঞানের মত গাণিতিক সূত্র আকারে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এর মানে এই নয় যে, তারা গণিতের উপর আস্থা হারিয়ে ফেললেন। গত দুইশ বছরে গণিতের একটি নতুন শাখারই উদ্ভব হয়েছে যেটি বাস্তবতার আরও জটিল কিছু দিককে গাণিতিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য ব্যবহৃত হয়। গণিতের এই শাখার নাম হল- পরিসংখ্যান।
১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে যাজকদের মৃত্যুর পর তাদের স্ত্রী এবং সন্তানদের ভাতা প্রদান করার লক্ষ্যে আলেকজান্ডার ওয়েবস্টার এবং রবার্ট ওয়ালেস নামে স্কটল্যান্ডের প্রেসবিটেরিয়ান চার্চের দুজন যাজক একটি জীবন বীমা তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। তারা প্রস্তাব করেন, চার্চের যাজকগণ তাদের রোজগারের একটি অংশ একটি তহবিল গঠনের জন্য দান করবেন। কোনও যাজকের মৃত্যুর পর তার পরিবার নিয়মিত এই তহবিল থেকে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ পাবেন। এটি তাদেরকে তাদের বাকি জীবন স্বাচ্ছন্দে কাটাতে সাহায্য করবে। কিন্তু, যাজকেরা কী পরিমাণ অর্থ জমা রাখলে তাদের মৃত্যুর পর তাদের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ তহবিল থেকে বরাদ্দ করা সম্ভব হবে তা জানার জন্য ওয়েবস্টার এবং ওয়ালেসের প্রতিবছর গড়ে কতজন যাজক মারা যান, গড়ে তাদের পরিবারের মোট কতজন সদস্য তারা রেখে যান এবং স্বামীর মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যরা গড়ে কত বছর বেঁচে থাকে এসব ব্যাপারে একটা সুস্পষ্ট অনুমান করা জরুরী হয়ে পড়ল।
এখানে একটা ব্যাপার গুরুত্ব সহকারে লক্ষ্য করুন। এই সমস্যা সমাধানের জন্য এই যাজকদ্বয় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা শুরু করেননি। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মশাস্ত্রের পূর্বতন বিশেষজ্ঞদের লিখে রাখা বাণীর মাঝেও তারা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাননি। এমনকি তারা আশ্রয় নেননি কোন জটিল দার্শনিক তর্কের। সেসময়ের স্কটল্যান্ডের অধিবাসী হওয়ার দরুন তারা ছিলেন বাস্তববাদী। সুতরাং, এ সমস্যা সমাধানের জন্য তারা আমন্ত্রণ জানালেন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক কলিন ম্যাকলরিনকে। তারা তিনজন মিলে মানুষের মৃত্যুর বয়স সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করলেন এবং এই তথ্য ব্যবহার করে তারা অনুমান করার চেষ্টা করলেন প্রতিবছর গড়ে কতজন যাজক মারা যেতে পারেন।
তাদের এই কাজ আজকের দিনের পরিসংখ্যান এবং সম্ভাবনা তত্ত্বের বেশ কিছু বৈপ্লবিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে একটি হল জ্যাকব বার্নোলির ‘ল অফ লার্জ নাম্বারস’। বার্নোলি গণিতের ভাষায় দেখিয়েছেন যে, একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার সম্ভাব্যতা অনুমান করা কঠিন, তবে একই রকম অনেকগুলো ঘটনার গড় সম্ভাব্যতার অনুমান বেশ নিপুণভাবেই করা সম্ভব। অর্থাৎ আগামী বছর ওয়েবস্টার বা ওয়ালেস মারা যাবেন কীনা এটা ম্যাকলরিনের পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয় কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য থাকলে ম্যাকলরিন মোটামুটি নিঁখুতভাবে আগামী বছর স্কটল্যান্ডে মোট কতজন প্রেসবিটেরিয়ান যাজক মারা যেতে পারেন তা ওয়েবস্টার বা ওয়ালেসকে জানাতে পারবেন। সুখের বিষয় হল, এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য আগে থেকেই সংগ্রহ করা ছিল। পঞ্চাশ বছর আগে এডমন্ড হ্যালির প্রকাশ করা জীবন-মৃত্যুর খতিয়ান (Actuary Table) এ কাজে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। হ্যালি তার প্রকাশিত হিসাবে জার্মানির ব্রেসলাউ শহরের ১,২৩৮ জনের জন্ম ও ১,১৭৪ জনের মৃত্যুর খতিয়ান প্রকাশ করেন। হ্যালির টেবিলের সাহায্যেই জানা সম্ভব হয়েছিল যে, একটি নির্দিষ্ট বছরে ২০ বছর বয়স্ক একজন মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা ১/১০০, অন্যদিকে ৫০ বছর বয়স্ক একজন মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা ১/৩৯।
এইসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ওয়েবস্টার এবং ওয়ালেস এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, গড়পড়তা যে কোনও বছরে জীবিত স্কটিশ প্রেসবিটেরিয়ান যাজকের সংখ্যা হবে ৯৩০ এবং গড়ে প্রতিবছর ২৭ জন যাজকের মারা যাবার সম্ভাবনা আছে যাদের মাঝে ১৮ জনের বিধবা স্ত্রী রেখে যাবার সম্ভাবনা। এদের মধ্যে গড়ে পাঁচ জনের বিধবা স্ত্রী থাকবে না কিন্তু এতিম সন্তান থাকবে এবং বিধবা স্ত্রীদের মাঝে গড়ে দুইজনের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান থাকবে যাদের বয়স এখনও ষোল বছরের সীমা অতিক্রম করেনি। তারা এটাও হিসাব করে দেখলেন যে, বিধবা নারীরা স্বামীর মৃত্যুর পর কতবছর আরও বাঁচতে পারেন অথবা নতুন করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে তাদের আনুমানিক কত সময় লাগতে পারে (এই দুই ক্ষেত্রেই তারা ভাতা প্রাপ্তির আওতামুক্ত হবেন)। যেসব যাজকেরা তাদের প্রিয়জনের সুরক্ষার জন্য তহবিল গঠন করতে চান তাদেরকে কী পরিমাণ অর্থ জমা রাখতে হবে, সেটা নির্ধারণ করতে এসব তথ্য ওয়েবস্টার এবং ওয়ালেসকে সাহায্য করল। যাজকেরা যদি প্রতি বছর ২ পাউন্ড, ১২ শিলিং, ২ পেনি করে জমা রাখেন তাহলে তিনি মোটামুটি নিশ্চিন্ত যে তার মৃত্যুর পর তার বিধবা পত্নী বছরে কমপক্ষে ১০ পাউন্ড করে পাবেন। তখনকার দিনের দশ পাউন্ড মানে অনেক টাকা। কোন যাজক যদি মনে করেন এই অর্থ তার স্ত্রীর ভবিষ্যত ভরণপোষণেরর জন্য যথেষ্ট নয় তিনি বছরে সর্বোচ্চ ৬ পাউন্ড, ১১ শিলিং, ৩ পেনি করে জমা রাখতে পারেন যা নিশ্চিত করবে তার মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী বছরে ২৫ পাউন্ডের মত একটা বড়সড় ভাতা পাবেন।
