খ) বিজ্ঞানকে একেবারেই দূরে সরিয়ে রাখুন এবং কোন অবৈজ্ঞানিক চূড়ান্ত সত্যকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে জীবনযাপন করুন। এই পদ্ধতি অনুযায়ী চলছে উদার মানবতাবাদ, যার ভিত্তিটি কাল্পনিক- প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব ব্যক্তিগত সামর্থ্য ও অধিকার। দুঃখজনকভাবে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে চেনা মানবজাতির পরিচয়ের সাথে এই ধারণার মিল খুবই সামান্য।
কিন্তু এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বিজ্ঞানকেও কিন্তু তার গবেষণার পেছনের অর্থ বরাদ্দকে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণের জন্য ধর্মীয় এবং মতাদর্শগত বিশ্বাসের উপর নির্ভর করতে হয়!
অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নেওয়ার ব্যাপারে বর্তমান বিশ্বের সংস্কৃতি অন্য যে কোন সময়ের সংস্কৃতির চেয়ে বেশি উদার। আজকের বৃহদাকার মানব সমাজব্যবস্থা যে একসাথে টিকে আছে তার একটা অন্যতম প্রধান কারণ হল প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার সফলতায় পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের প্রায় ধর্মসদৃশ বিশ্বাস যা পরম সত্য বা পরম ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের জায়গাকে কিছুটা হলেও প্রতিস্থাপিত করেছে।
বিজ্ঞানের মন্ত্র, বিজ্ঞানের বিধান
আধুনিক বিজ্ঞান অন্ধ বিশ্বাস বা গোঁড়ামির প্রভাব মুক্ত। কিন্তু তাকেও কিছু সাধারণ গবেষণা পদ্ধতির অধীনে চলতে হয়। এসবের মূলে রয়েছে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্য সংগ্রহ এবং গাণিতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সে সবের মাঝে সমন্বয় সাধন করা।
ইতিহাসের পুরোটা সময় জুড়েই মানুষ প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করলেও সেসব তথ্যের গুরুত্ব ছিল সীমাবদ্ধ। আপনার কাছে যদি সব প্রশ্নের উত্তরই থেকে থাকে তাহলে অযথা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের জন্য আপনি বাড়তি খরচ কেন করবেন? কিন্তু আধুনিক মানুষ যেহেতু স্বীকার করে নিল গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ই তারা জানে না, তাদের জন্য নতুন জ্ঞানের সন্ধান করাটা প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিল। ফলশ্রুতিতে, পুরনো জ্ঞানের অপূর্ণতাকে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নেওয়াটা আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার পদ্ধতির একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়াল। পুরনো ঐতিহ্যকে জানা ও তার চর্চার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ল পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। যখন বর্তমানের পর্যবেক্ষণ পূর্বের প্রচলিত জ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায় আমরা সেক্ষেত্রে বর্তমানের পর্যবেক্ষণকে প্রাধান্য দেই। অবশ্যই পদার্থবিজ্ঞানীর দূরবর্তী গ্যালাক্সির বর্ণালী বিশ্লেষণ, নৃতাত্ত্বিকের ব্রোঞ্জ যুগের বিলুপ্ত কোন নগরের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে গবেষণা, সমাজবিজ্ঞানীর পুঁজিবাদের উদ্ভব নিয়ে পড়াশোনা অতীতের জ্ঞানের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে না। এসব গবেষণার শুরুই হয় পূর্বতন পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কী বলে এবং লিপিবদ্ধ করে গেছেন তা জানার মাধ্যমে। কিন্তু কলেজের প্রথম বছর থেকেই উঠতি পদার্থবিদ, নৃতত্ত্ববিদ এবং সমাজবিজ্ঞানীকে শেখানো হয় যে তাদের লক্ষ্যই হচ্ছে আইনস্টাইন, হেইনরিখ শিলম্যান এবং ম্যাক্স ওয়েবারের জানার পরিধিকে ছাড়িয়ে যাওয়া।
যদিও বেশি পর্যবেক্ষণ মানেই বেশি জ্ঞান নয়। এই মহাবিশ্বকে বোঝার জন্য আমাদের পর্যবেক্ষণগুলিকে পরস্পরের সাথে যুক্ত করে বোধগম্য তত্ত্বে রূপান্তর করতে হবে। পূর্বে জ্ঞানের শাখাগুলো কাল্পনিক গল্পের উপর ভিত্তি করে তাদের তত্ত্ব দাঁড় করাতো। আধুনিক বিজ্ঞান সাহায্য নেয় গণিতের।
বাইবেল, কোরান বা বেদ বা কনফুসিয়াসের বাণী ঘাঁটলে খুব সামান্যই সমীকরণ, লেখচিত্র বা গাণিতিক হিসাব-নিকাশের সন্ধান পাওয়া যাবে। প্রাচীন পুরাণ এবং ধর্মগ্রন্থগুলো সমীকরণ নয় বরং বর্ণনার মাধ্যমেই পৃথিবী সংক্রান্ত সাধারণ নিয়মগুলো লিপিবদ্ধ করেছিল। একারণে আমরা দেখতে পাই, প্রাচীন ম্যানিকিয়ান ধর্মে বলা হচ্ছে, পৃথিবী হল সুন্দর আর শয়তানের লড়াইয়ের এক যুদ্ধক্ষেত্র। শয়তানের শক্তি সৃষ্টি করেছে শরীরের আর সুন্দরের শক্তি সৃষ্টি করেছে আত্মা। মানুষ এই দুই শক্তির প্রভাবের মায়াজালে বন্দী এবং তার উচিত শয়তানের শক্তিকে অস্বীকার করে সুন্দরের শক্তির অনুসারী হওয়া। এতকিছু বলার পরেও এ ধর্মের ধর্মগুরু মানি (Mani) এমন কোন গাণিতিক সূত্র দেননি যার মাধ্যমে মানুষ হিসাব করে দেখতে পারে সে কত শতাংশ শয়তানকে অনুসরণ করছে আর কত শতাংশ সুন্দরকে অনুসরণ করছে। তিনি কখনও এরকম হিসাব বলেননি যে, ‘মানুষের উপর ক্রিয়ারত বলের পরিমাণ তার আত্মার ত্বরণ এবং তার শরীরের ভরের ভাগফলের সমান’।
অপরদিকে বিজ্ঞানীরা কিন্তু ঠিক এই কাজটিই করার চেষ্টা করেন। ১৬৮৭ সালে স্যার আইজ্যাক নিউটন তাঁর ‘ম্যাথমেটিক্যাল প্রিন্সিপাল অব ন্যাচারাল ফিলোসফি’ বইটি প্রকাশ করেন। অনেকের মতেই এটি আধুনিককালের ইতিহাসে প্রকাশিত হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই। নিউটনের তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি ছিল এটি মাত্র তিনটি গাণিতিক নিয়মের সাহায্যে গাছ থেকে পড়ন্ত আপেল থেকে শুরু করে আকাশ থেকে খসে পড়া তারা সহ মহাবিশ্বের সকল বস্তুর গতিকে ব্যাখ্যা এবং অনুমান করতে পারত-
- প্রথম সূত্র: বাহ্যিক কোন বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু স্থির এবং গতিশীল বস্তু সুষম গতিতে সরল পথে চলতে থাকে।
- দ্বিতীয় সূত্র: কোন বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক এবং বল যে দিকে ক্রিয়া করে বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তন সেদিকেই ঘটে।
- তৃতীয় সূত্র: প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে৷
এই সূত্রগুলো জানার পর থেকে একটি কামানের গোলা বা একটি গ্রহের গতিপথ হিসেব করতে মানুষকে কেবল বস্তুটির ভর, দিক, ত্বরণ এবং এর উপর ক্রিয়াশীল বলের পরিমাণ হিসেব করতে হয়েছে। এরপর নিউটনের সমীকরণে এই রাশিগুলোর মান বসিয়ে সহজেই বস্তুটির ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব হল। নিউটনের সূত্র কাজ করল জাদুর মত। উনবিংশ শতকের শেষদিকে কিছু পদার্থবিজ্ঞানী যখন এমন কিছু বস্তুর গতিপথ পর্যবেক্ষণ করলেন যা নিউটনের সূত্র মেনে চলে না তখনই সূচনা হল নিউটনের সূত্রকে ছাপিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের পরবর্তী বিপ্লবের, উদ্ভব হল আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যার।
