খ্রিস্টধর্মে মাকড়সা সংক্রান্ত পড়াশোনার ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু মাকড়সা বিশেষজ্ঞ নামে যদি কিছু মধ্যযুগীয় ইউরোপে থেকেও থাকে, সমাজের প্রান্তজন হয়েই তাকে থাকতে হয়েছে এবং তার গবেষণা এবং আবিষ্কার খ্রিস্টধর্মের চিরকালীন রীতিনীতির সাথে সম্পর্কহীন হিসেবেই থেকে গেছে। একজন বিশেষজ্ঞ মাকড়সা, প্রজাপতি বা গ্যালাপাগোস দ্বীপের পাখিদের সম্পর্কে যে তথ্যই আবিষ্কার করুক, তা ছিল সেকালের মানুষের দৃষ্টিতে নগণ্য জ্ঞান, সমাজের মূল স্রোত, রাজনীতি এবং অর্থনীতির সাথে একেবারেই সম্পর্কহীন।
সত্যি কথা বলতে, সেকালে ব্যাপারগুলো উপরের বর্ণনার মত এত সহজ ছিল না। প্রত্যেক যুগেই, এমনকি ধর্ম এবং রক্ষণশীলতার বাড়াবাড়ির যুগেও এমন কিছু লোক ছিলেন যারা দাবি করতেন এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে যেসবের ব্যাপারে সমাজের সকল মানুষই অজ্ঞ। এই ধরনের লোকগুলোকে হয় একঘরে করা হত অথবা হত্যা করা হত। কিংবা এরা নিজেরাই একটি নতুন মতবাদের প্রতিষ্ঠা করতেন এবং দাবি করা শুরু করতেন এই নতুন মতবাদেই মানুষের সকল জিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়া যাবে। যেমন ইসলাম ধর্মমতে, আরবের মানুষেরা যখন অপরিসীম অজ্ঞতায় নিমজ্জিত ছিল, তেমন একটি সময়ে নবী মুহাম্মদ (সা) এর আগমন হয়। তিনি যখন বললেন তিনি পরিপূর্ণ সত্যের সন্ধান পেয়েছেন, তার পর থেকে তাঁর অনুসারীরা তাঁকে ‘সর্বশেষ নবী’ হিসেবে মেনে নেয়। সুতরাং তাঁর বক্তব্যের বাইরে নতুন করে সত্যের সন্ধান করার আর কী দরকার?।
বর্তমান কালে জ্ঞানের ব্যাপারে বিজ্ঞানের ধারণা অনেকটাই ভিন্ন। বিজ্ঞান আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে আমাদের সামষ্টিক অজ্ঞতার কথা স্বীকার করে নেয়। জীববিজ্ঞানী ডারউইন কখনও নিজেকে ‘সর্বশেষ জীববিজ্ঞানী’ বলে দাবি করেননি এবং ঘোষণা করেননি যে তিনি জীবজগতের সকল রহস্যের চূড়ান্ত এবং চিরকালীন সমাধান করতে পেরেছেন। একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিস্তর বৈজ্ঞানিক গবেষণা সত্ত্বেও, জীববিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন যে মস্তিষ্ক কীভাবে চেতনার জন্ম দেয় সে ব্যাপারে কোন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা এখনও তাদের হাতে নেই। পদার্থবিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন যে, তাঁরা জানেন না কী কারণে মহাবিস্ফোরণ (Big Bang) হয়েছিল বা কীভাবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের সাথে একীভূত করা যাবে।
এমনকি প্রায়ই এটা দেখা যায় যে, উদ্ভাবিত নতুন নতুন তথ্যের ভিত্তিতে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আরেকটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে নাকচ করে দিচ্ছে বা অকার্যকর প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে কীভাবে একটি দেশের অর্থনীতি পরিচালনা করতে হবে সে সংক্রান্ত তত্ত্ব নিয়ে মতবিরোধ। যদিও প্রত্যেক অর্থনীতিবিদই দাবি করেন তার মতবাদই সেরা, প্রত্যেক অর্থনৈতিক মন্দা, শেয়ার বাজারের ভরাডুবির পর তাদের এই অহংকার টলে ওঠে। এবং আজকের দিনে সাধারণভাবে একথা স্বীকার করে নেয়া হয় যে, অর্থনীতির তত্ত্বে শেষ কথা বলে কিছু নেই।
এমনও অনেক উদাহরণ দেখা যায়, যেখানে একটি বিশেষ তত্ত্ব বিদ্যমান তথ্যগুলো দ্বারা এতটাই সমর্থিত যে, ওই বিষয়ের বিকল্প তত্ত্বগুলো হালে পানিই পায় না। সেক্ষেত্রে এই ধরনের তত্ত্বগুলোকে সত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তারপরও এই ব্যাপারে সবাই একমত থাকেন যে, ভবিষ্যতে যদি এ বিষয়ে এমন কোন তথ্য পাওয়া যায় যা বর্তমান তত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক তাহলে এই সত্য বলে মেনে নেয়া তত্ত্বকে তৎক্ষণাৎ ভুল বলে স্বীকার করা হবে অথবা এর ত্রুটিগুলোকে শুধরে নেয়া হবে। এই সংক্রান্ত সবচেয়ে দুটি ভাল উদাহরণ হতে পারে টেকটোনিক প্লেট তত্ত্ব এবং বিবর্তন তত্ত্ব।
অজ্ঞতা স্বীকার করে নেয়ার এই সদিচ্ছা বিজ্ঞানকে জ্ঞানের অন্যান্য শাখার চেয়ে গতিশীল, নমনীয় এবং কৌতূহলী করে গড়ে তুলেছে। পৃথিবীকে চেনা এবং নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের ক্ষেত্রে খুলে দিয়েছে এক নতুন দিগন্ত। কিন্তু অজ্ঞতার আবিষ্কার একটি ভয়ঙ্কর সমস্যারও উদ্ভব ঘটিয়েছে, আমাদের পূর্বপুরুষদের যেটি নিয়ে ভাবনায় পড়তে হয়নি। বিজ্ঞানের সভ্যতা আমাদের শিখিয়েছে আমরা সবকিছু জানি না এবং আমরা যা জানি বলে মনে করি সেগুলোও আংশিক জানা। যেসব সামষ্টিক মিথ অসংখ্য অচেনা মানুষকে একত্রিত করে আমাদেরকে বিশাল আকারের সমাজ, রাষ্ট্র, গোষ্ঠী গঠনে সহায়তা করেছে সেইসব মিথও এই ধারণার অন্তর্ভুক্ত। যদি কখনও প্রমাণিত হয় যে, এইসব মিথের সত্যতাও প্রশ্নের সম্মুখীন কিংবা ভুল, তখন আমরা কী করে আমাদের সমাজকে একসাথে ধরে রাখব? আমাদের রাষ্ট্র, দেশ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাগুলোও কি তখন হুমকির মুখে পড়বে না?
সমাজ ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ধরে রাখার সকল আধুনিক প্রচেষ্টাকে তাই বাধ্য হয়েই দুইটি অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির একটিকে অনুসরণ করতে হচ্ছে-
ক) বিজ্ঞানের সভ্যতার মূল কথা ‘ভুলের সম্ভাবনা’কে অস্বীকার করে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে চূড়ান্ত এবং পরম সত্য রূপে ঘোষণা করুন। এই পদ্ধতি অনুসরণ করছিল নাৎসি বাহিনী (যারা দাবি করেছিল যে জাতিতে জাতিতে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যের ব্যাপারটি জীববিজ্ঞানেরই অনুসিদ্ধান্ত) এবং কম্যুনিস্টরা (যারা দাবি করেছিল মার্ক্স এবং লেলিন সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোর চূড়ান্ত সন্ধান পেয়েছেন যার বিরুদ্ধে কোন তর্কেরই অবকাশ নেই)।
