
বিজ্ঞানভিত্তিক বিপ্লবের চক্র। শুধু গবেষণা দিয়ে বিজ্ঞান এগিয়ে যেতে পারে না। এর জন্য দরকার হয় বিজ্ঞান, রাজনীতি আর অর্থনীতির সম্মিলিত উদ্যোগ। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যোগান দেয় বিজ্ঞানের এগিয়ে চলার রসদ যা ছাড়া বৈজ্ঞানিক গবেষণা এগিয়ে নেয়া মোটামুটি অসম্ভব। বিনিময়ে বিজ্ঞান দেয় নতুন ক্ষমতা আর শক্তি যা ব্যবহৃত হয় নতুন সম্পদ তৈরিতে। এরই কিছু অংশ আবার বিনিয়োগ করা হয় বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে।
গবেষণার মাধ্যমে যে আরও ক্ষমতার অধিকারী হওয়া যায়- এই বিশ্বাস মানুষ পেল কোথা থেকে? কীভাবে বিজ্ঞান, রাজনীতি আর অর্থনীতি বাঁধা পড়ল এক সুতোয়? এই অধ্যায়ে আমরা বিজ্ঞানের ভূমিকাটুকু দেখব, তবে সেটা হবে এই প্রশ্নের আংশিক জবাব। পরের দুটো অধ্যায়ে আমরা এই ত্রিমুখী সম্পর্কটাকে দেখব আরও দুটো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে- ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ আর পুঁজিবাদী অর্থনীতি।
জানতাম না তো!
সেই বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের সময় থেকেই মানুষ এই মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করে আসছে। পৃথিবী কোন কোন প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন তা জানার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষেরা অনেক সময় ও শ্রম দিয়েছে। কিন্তু প্রাচীনকালের জ্ঞান অর্জনের এই প্রচেষ্টার থেকে আধুনিক বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জনের এই প্রক্রিয়া তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে ভিন্ন-
ক) অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নেওয়ার প্রবণতা। আধুনিক বিজ্ঞান ল্যাটিন শব্দ ‘ignoramus’ এর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত যার অর্থ- ‘আমরা জানি না’। আধুনিক বিজ্ঞান ধরেই নেয় আমরা সবকিছু জানিনা। আরও সূক্ষ্মভাবে বললে বলা যায়, আধুনিক বিজ্ঞান এটাও স্বীকার করে আমরা আজকে যা জানি বলে মনে করছি কাল আরও বেশি জ্ঞান অর্জনের ফলে আজকের জানা ভুল প্রমাণিত হতে পারে। কোন ধারণা, মতবাদ বা তত্ত্ব ঈশ্বরপ্রদত্ত নয় এবং বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।
খ) পর্যবেক্ষণ এবং গাণিতিক বিশ্লেষণকে জ্ঞান অর্জনের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা। যেহেতু আধুনিক বিজ্ঞান অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নেয় তাই তার লক্ষ্য থাকে অজানাকে জানার। জ্ঞান অর্জনের জন্য বিজ্ঞান তার চারপাশকে পর্যবেক্ষণ করে, তথ্য সংগ্রহ করে এবং গাণিতিক পদ্ধতির সাহায্যে এই পর্যবেক্ষণকে তত্ত্বে রূপ দেবার চেষ্টা করে।
গ) নতুন নতুন সক্ষমতা অর্জনের প্রবণতা। আধুনিক বিজ্ঞান কেবল তত্ত্ব তৈরি করেই সন্তুষ্ট থাকে না। এই তত্ত্বগুলোকে সে ব্যবহার করে নতুন নতুন ক্ষমতা অর্জনের কাজে এবং বিশেষভাবে বললে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজে।
বিজ্ঞানভিত্তিক বিপ্লব জ্ঞান অর্জনের বিপ্লব নয়। বরঞ্চ এককথায় একে বলা যায় অজ্ঞানতার আবিষ্কারের বিপ্লব। যে অভূতপূর্ব আবিষ্কারটি বিজ্ঞানভিত্তিক বিপ্লবের সূচনা করেছিল সেটি হল- আমরা মানুষেরা আমাদের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরই জানি না।
অপরদিকে ইসলাম ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম এবং কনফুসিয়ানিজমের মত জ্ঞানের প্রাক-আধুনিক ধারাগুলো ধরে নেয় যে, পৃথিবী সম্পর্কে যা কিছু জানা গুরুত্বপূর্ণ ইতোমধ্যেই তা জানা হয়ে গেছে। অসংখ্য শক্তিধর দেবতা বা এক ও অদ্বিতীয় মহাশক্তিধর স্রষ্টা বা অতীতের জ্ঞানী ব্যক্তিদের লিখিত পুঁথি বা মুখে মুখে চলে আসা গাথার মাঝেই নিহিত আছে সমস্ত জ্ঞানভাণ্ডার। সাধারণ মরণশীল মানুষের কাজ কেবল এসব পবিত্র পুরাতন পুঁথি পড়ে, বুঝে এবং বহুকাল ধরে চলে আসা নিয়মকানুন মেনে জ্ঞান অর্জন করা। বাইবেল, কোরান কিংবা বেদে বলা নেই এমন কোনও গূঢ় তত্ত্বজ্ঞান কোনও রক্ত-মাংসের মানুষের পক্ষেও যে আবিষ্কার করা সম্ভব- এ কথা কোনও ধর্মই মানতে চায় না।
জ্ঞানের প্রাচীন ধারাগুলো কেবলমাত্র দুই ধরনের অজ্ঞতার কথা স্বীকার করেছে। এক, একজন ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় না জানা সম্পর্কিত অজ্ঞতা। এই অজ্ঞতা দূর করার জন্য তাকে অপেক্ষাকৃত জ্ঞানী কোন মানুষের সহায়তা নিতে হত। কেউই যা এখন পর্যন্ত জানে না এমন কোন কিছু আবিষ্কার করার চেষ্টাই অর্থহীন। উদাহরণস্বরূপ, বিশ শতকের ইয়র্কশায়ারের একজন কৃষকের মনে যখন মানবজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে প্রশ্ন জাগত, সে নিশ্চিতভাবেই ধরে নিত কেবল খ্রিস্টধর্মের মাঝেই আছে এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর। আর সেই উত্তর জানার জন্য সে শরণাপন্ন হত স্থানীয় ধর্মযাজকের।
দুই, একটা পুরো গোষ্ঠীর কোনও অপ্রয়োজনীয় বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞতা। শক্তিশালী দেবতারা বা অতীতের প্রাজ্ঞ মানুষেরা যেসব বিষয় সম্পর্কে এতকাল কিছুই বলেননি সেগুলো নিতান্তই গুরুত্বহীন বিষয়। উদাহরণস্বরূপ, ইয়র্কশায়ারের সেই কৃষক যদি জানতে চাইত মাকড়সা কীভাবে তার জাল বোনে, সে সম্পর্কে ধর্মযাজককে জিজ্ঞেস করা ছিল নিতান্তই অর্থহীন। কারণ, খ্রিস্টধর্মের পবিত্র গ্রন্থগুলিতে এ সংক্রান্ত কোন নির্দেশনা নেই। এর মানে এই নয় যে, খ্রিস্টধর্মের মাঝে জ্ঞানের কোন ঘাটতি আছে। বরং তাদের বিশ্বাস ছিল, মাকড়সার জাল বোনার কৌশল গুরুত্বহীন বলেই তা ধর্মগ্রন্থে নেই। ঈশ্বর নিশ্চয়ই ভালোভাবেই জানেন মাকড়সা কীভাবে জাল বোনে। এই তথ্য যদি মানুষের উন্নতি বা মানবজাতিকে রক্ষার জন্য জরুরী হত, শক্তিমান ঈশ্বর অবশ্যই এ সংক্রান্ত বোধগম্য একটি ব্যাখ্যা বাইবেলে যুক্ত করতেন।