ষোড়শ শতকের আগে, কোনও মানুষই পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেননি। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটল যখন ১৫২২ সালে পর্যটক ম্যাগেলানের জাহাজ বাহাত্তর হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে স্পেনে ফিরে আসলো। এ প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করতে প্রায় তিন বছর সময় লেগেছিল এবং ম্যাগেলানসহ অভিযানের অধিকাংশ নাবিককেই প্রাণ দিতে হয়েছিল। ১৮৭৩ সালে জুলভার্ন তার কল্পকাহিনীতে ফিলিয়াস ফগ নামে এক ব্রিটিশ অভিযাত্রীর কথা লেখেন, যিনি আশি দিনে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আজকের দিনে মাঝারি উপার্জনের একজন মানুষ মাত্র আটচল্লিশ ঘন্টায় খুব সহজে এবং নিরাপদে পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে আসতে পারেন।
পনেরশ সালে মানুষকে আবদ্ধ থাকতে হয়েছে ভূ-পৃষ্ঠেই। স্থলভাগে তখন তারা টাওয়ার বানাতে পারত, উঠতে পারত পাহাড়ে। কিন্তু, আকাশটা তখনও ছিল পাখি, পরী, দেব-দেবী আর শয়তানের দখলে। ১৯৬৯ সালের বিশ জুলাই মানুষ প্রথম চাঁদের বুকে পা রাখল। এটা কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনাই নয়, এটি মানুষের ইতিহাসের একটি বড় বিপ্লব এবং মানুষের এক মহাজাগতিক বিজয়। কারণ, এর আগের চারশ কোটি বছরে জীবজগতের কেউ চাঁদে পা অথবা শুঁড় রাখা তো দূরের কথা, পৃথিবীর পরিমণ্ডলের বাইরেই বের হতে পারেনি।
ইতিহাসের অধিকাংশ সময় জুড়ে, অণুজীবদের সম্পর্কে মানুষের কোন ধারণাই ছিল না। অথচ জীবজগতের ৯৯.৯৯% সদস্যই হল অণুজীব। এই না জানার কারণ এমন নয় যে, তাদের নিয়ে মানুষের কোন মাথাব্যথা ছিল না। প্রতিটি মানুষকেই সবসময় কোটি কোটি এককোষী জীবকে নিজের শরীরে বহন করতে হয়। তারা যে কেবল থাকার জন্য থাকে তা নয়। তাদের কেউ আমাদের সেরা বন্ধু, আবার কেউবা আমাদের বড় শত্রু। কেউ আমাদের খাবার পরিপাক আর অন্ত্র পরিষ্কার রাখার কাজ করে, কেউ আবার আমাদের অসুস্থ করে ফেলে, নিয়ে আসে মহামারী। ১৬৭৪ সালে অান্তন ভন লিউয়েনহুক (Anton van Leeuwenhoek) তার নিজের বাসায় তৈরি অণুবীক্ষণে একটি পানির বিন্দুর মাঝে এরকম লাখ লাখ অণুজীবের এক অদেখা পৃথিবীর সন্ধান পেলেন। আর তারই ফলশ্রুতিতে মানুষ এই প্রথম অণুজীবকে নিজের চোখে দেখতে পেল। পরবর্তী তিনশ বছরে মানুষের সাথে এরকম অনেক ধরনের আণুবীক্ষণিক জীবের পরিচয় হয়েছে। যেসব অণুজীব নানারকম ভয়ংকর সংক্রামক রোগের জন্য দায়ী তাদের অধিকাংশই মানুষের কাছে পরাস্ত হয়েছে। অন্যদিকে মানুষের জন্য উপকারী অণুজীবগুলো লালনপালন করে মানুষ তাদের ব্যবহার করেছে ওষুধ তৈরির কাজে এবং শিল্পকারখানায়। আজকাল আমরা ওষুধ তৈরি, বায়োগ্যাস উৎপাদন এবং ক্ষতিকর পরজীবী দমনের জন্য দরকারি ব্যাকটেরিয়ার উৎপাদন শিখে গেছি।
কিন্তু, গত পাঁচশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাব বিস্তারকারী মুহূর্তের সূচনা হল ১৯৪৫ সালের ১৬ই জুলাইয়ে, সকাল ৫টা ২৯ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে। এই সময়েই আমেরিকার বিজ্ঞানীরা নিউ মেক্সিকোর অ্যালামোগরডোতে (Alamogordo) প্রথম আণবিক বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটালেন। ঠিক এই মুহূর্ত থেকেই মানুষ বুঝতে পারল, ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেবার ক্ষমতার মধ্যেই মানুষ আর সীমাবদ্ধ নেই, ইতিহাসের ইতি টানবার শক্তিও তারা অর্জন করেছে।
যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যালামোগরডোতে আণবিক বোমা বিস্ফোরণ এবং মানুষের চাঁদে যাওয়া সম্ভব হল তার নাম বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। এই সময়টাতে মানুষ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ করার মাধ্যমে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠতে পেরেছে। এটাকে আমরা বিপ্লব বলছি কারণ ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের আগ পর্যন্তও পৃথিবীর মানুষ স্বাস্থ্য, সমর এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে তার নতুন সম্ভাবনা বা অগ্রগতির ব্যাপারে সন্দিহান ছিল। যদিও এর আগে রাষ্ট্র এবং ধনী পৃষ্ঠপোষকেরা শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ এবং বৃত্তির ব্যবস্থা করতেন, তবে নতুন নতুন উদ্ভাবনের পরিবর্তে অর্জিত জ্ঞানকে ধরে রাখাই ছিল এসবের মূল উদ্দেশ্য। প্রাক-আধুনিক যুগের একজন গড়পড়তা শাসক সামাজিক শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং আইন-কানুনের বৈধতা প্রমাণের জন্য ধর্মযাজক, দার্শনিক এবং কবিদের পেছনে অর্থ ব্যয় করতেন। তারা নতুন ওষুধ, যুদ্ধের নিত্যনতুন অস্ত্র বা অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করবেন এরকম আশা শাসকের থাকত না।
বিগত পাঁচশ বছরে মানুষ ক্রমাগত: বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা তাদের সামর্থ্যকে আরও বাড়াতে পারবে। এই বিশ্বাস কেবল অন্ধ ধারণার উপর গড়ে ওঠেনি বরং ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বারবার এই ধারণার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। বিজ্ঞানের ক্ষমতার প্রমাণ যতই বাড়তে লাগল, সরকার এবং ধনকুবেররা ততই এই ব্যাপারে বিনিয়োগে আগ্রহী হলেন। এইসব বিনিয়োগ ছাড়া আমরা কখনই হয়ত চাঁদে বিচরণ করতে, অণুজীব গবেষণা করতে বা পরমাণুকে আরও ক্ষুদ্রতম অংশে ভাগ করতে পারতাম না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমেরিকান সরকার গত কয়েক দশকে নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার জন্য কোটি কোটি ডলার বরাদ্দ করেছেন। এইসব গবেষণায় অর্জিত জ্ঞানের ফলেই সম্ভব হয়েছে আমেরিকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ যা আমেরিকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বল্প খরচে বিদ্যুতের যোগান দিচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারকে দিচ্ছে কর, সেই করের একটি অংশই আবার বিনিয়োগ করা হচ্ছে নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে আরও গবেষণা করার জন্য।
