গেম থিওরি, উত্তরাধুনিকতা বা মিমতত্ত্ব- যা দিয়েই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, ইতিহাসের উদ্দেশ্য কখনোই মানব কল্যাণ নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে সফল সংস্কৃতিগুলোই যে হোমো সেপিয়েন্সের জন্য সবচেয়ে ভালো- সেটা ভাবার কোনোই কারণ নেই। বিবর্তনের মতো ইতিহাসও একজন ব্যক্তি মানুষের সুখ-সুবিধার কথা ভাবে না। আবার একজন মানুষের সেই পরিমাণ জ্ঞান-বুদ্ধি বা ক্ষমতা থাকে না যা দিয়ে ইতিহাসকে সে নিজের সুবিধা অনুযায়ী চালিত করবে।
এভাবেই ইতিহাস এগিয়ে যায় তার নিজের পথে। কোন রহস্যময় কারণে সে অনেকগুলো পথের মধ্যে একটা ধরে এগোয়, জানা যায় না। ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইতিহাস এমন একটা পথ বেছে নিয়েছিল যা পরবর্তীতে শুধু মানুষ নয়, সারা পৃথিবীর ভাগ্য পালটে দেয়। এই ঘটনাকে আমরা বলি বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। এই বিপ্লবের শুরু হয়েছিল বিশাল আফ্রো-এশীয় ভূখণ্ডের পশ্চিম কোণে, ইউরোপে। এর আগ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে ইউরোপের তেমন কোনো ভূমিকাই ছিল না। অথচ সেখান থেকেই কেন বৈজ্ঞানিক বিপ্লব শুরু হল? কেন চীন বা ভারতে সেটা হল না? কেন সেটা খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি থেকে শুরু হল? এর দুশ বছর আগে, বা তিনশ বছর পরে কেন নয়? উত্তর জানা নেই। গবেষকরা এর ডজন ডজন ব্যাখ্যা দিতে পারেন, কিন্তু তার কোনোটাই বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি খাপ খায় না।
ইতিহাসের সামনে অসংখ্য সম্ভাবনা, এর মধ্যে অনেকগুলোকেই আমরা অনেকসময় উপলব্ধিও করতে পারি না। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবকে বাদ দিয়েও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকা মানুষের ইতিহাস কল্পনা করা যেতে পারে। একইভাবে ভাবা যেতে পারে খ্রিস্টধর্ম, রোমান সাম্রাজ্য অথবা স্বর্ণমুদ্রার ব্যবহার ছাড়া মানুষের অন্য কোন সম্ভাব্য ইতিহাস।
————–
1 Susan Blackmore, The Meme Machine (Oxford: Oxford University Press, 1999).
১৪. জানি না বলতে শেখা
ধরা যাক, আনুমানিক এক হাজার খ্রিস্টাব্দের কোন এক রাতে একজন কৃষক ঘুমিয়ে পড়লেন এবং তার ঘুম ভাঙল প্রায় পাঁচশ বছর পর এক হট্টগোলে। কলম্বাসের সহযোগী নাবিকরা যখন নিনা, পিন্টা এবং সান্তা মারিয়া নামে তিনটি জাহাজ ছাড়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করলেন, তখনই এই হট্টগোলের সূত্রপাত। ঘুম থেকে উঠে তিনি পৃথিবীর যে রূপ দেখতেন, সেটা তার কাছে কিন্তু খুব বেশি অচেনা বলে মনে হতো না। এই সময়ের মাঝে প্রযুক্তি, মানুষের আচার-আচরণ এবং রাজনৈতিক সীমারেখার বেশ কিছু পরিবর্তন হলেও আমাদের মধ্যযুগীয় কুম্ভকর্ণটির কাছে সেই পৃথিবীকে নিজের চেনা পৃথিবী বলেই মনে হতো। কিন্তু, কলম্বাসের জাহাজের কোন নাবিক যদি এরকম লম্বা ঘুমে তলিয়ে যান এবং প্রায় পাঁচশ বছর পরে একবিংশ শতকের একটি আইফোনের রিংটোন শুনে তার ঘুম ভাঙে, তবে পৃথিবীর যে রূপ তার সামনে উন্মোচিত হবে সেটা তার কাছে শুধু আশ্চর্যজনকই নয়, সেই পৃথিবী তার কাছে কল্পনারও অতীত বলে মনে হবে। তিনি হয়ত নিজেকে নিজেই জিজ্ঞেস করবেন- ‘এটাই কি স্বর্গ? নাকি এরই নাম নরক?’
গত পাঁচশ বছরে পৃথিবী দেখেছে মানুষের শক্তির অভূতপূর্ব এবং বিস্ময়কর বিকাশ। পনেরশ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবী জুড়ে মোট পঞ্চাশ কোটি হোমো সেপিয়েন্স বসবাস করত। আজকের পৃথিবীতে সাতশ কোটিরও বেশি হোমো সেপিয়েন্সের বাস। পনেরশ খ্রিস্টাব্দে দুনিয়ার সব মানুষ মিলে এক বছরে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা উৎপাদন করত, আজকের দিনের ডলারের হিসেবে তার আনুমানিক মূল্যমান হবে পঁচিশ হাজার কোটি ডলার।২ আজকের দুনিয়ায় এক বছরে মানুষের উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মূল্যমান ষাট লাখ কোটি ডলার।৩ সেসময়, সমগ্র মানবজাতি একদিনে তের ট্রিলিয়ন (১ ট্রিলিয়ন= ১,০০,০০০ কোটি) ক্যালরি খাদ্যশক্তি হিসেবে গ্রহণ করত। আজকের পৃথিবীতে মানুষ প্রতিদিন পনেরশ ট্রিলিয়ন ক্যালরি খাদ্যশক্তি হিসেবে গ্রহণ করে।৪ এখন আবার একবার পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকান- এই পাঁচশ বছরে মানুষের সংখ্যা হয়েছে চৌদ্দ গুন, উৎপাদন হয়েছে দুইশ চল্লিশ গুন আর খাদ্যশক্তি গ্রহণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে একশ পনের গুন।
ধরা যাক, আজকের দিনের একটি আধুনিক যুদ্ধ জাহাজকে কলম্বাসের আমলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মাঝে এটি গুঁড়িয়ে দিতে পারবে কলম্বাসের জাহাজ নিনা, পিন্টা এবং সান্তা মারিয়াকে। তারপর নিজের গায়ে এতটুকু আঁচড় না লাগিয়ে একে একে অনায়াসে ডুবিয়ে দিতে পারবে সেকালের পৃথিবীর সকল পরাশক্তির যুদ্ধজাহাজগুলোকে। সেসময় সারা পৃথিবীর বণিকদের সবগুলো মালবাহী জাহাজ যত পণ্য বহন করতে পারত, একালের পাঁচটি আধুনিক মালবাহী জাহাজ তা অনায়াসে বহন করতে পারবে।৫ মধ্যযুগের সবগুলো লাইব্রেরিতে যতগুলো সাংকেতিক বই-পুস্তক এবং কাগজ বা চামড়ায় মোড়ানো পুঁথি ছিল তাতে লিপিবদ্ধ সকল তথ্য ধারণ করতে পারবে আজকের দিনের আধুনিক একটি কম্পিউটার। প্রাক-অাধুনিক যুগে সকল রাজ্যের অর্থ একত্রিত করলে যা দাঁড়াত, আজকের একটি বৃহদায়তন আধুনিক ব্যাংক তার চেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করে।৬
পনেরশ সালে, খুব অল্প সংখ্যক শহরেই এক লাখের বেশি জনগণ বসবাস করত। বেশিরভাগ বাড়িঘর তৈরি হত কাদা, কাঠ এবং খড় বা শুকনো ঘাস দিয়ে, সেসময় একটি তিন তলা দালানকেই আকাশচুম্বী ইমারত মনে করা হত। রাস্তাগুলোতে লেগে থাকত গাড়ির চাকার দাগ, গ্রীষ্মকালে রাস্তা থাকত ধুলোয় ভরা আর বর্ষাকালে কাদায় মাখামাখি। সেই রাস্তা ব্যবহার করেই পথচারী, ঘোড়া, ছাগল, মুরগি এবং অল্প কিছু গরুর গাড়ি পথ চলত। শহর এলাকায় শব্দের অত্যাচার বলতে মানুষ এবং পশুপাখির গলার শব্দ এবং মাঝেমধ্যে হাতুড়ি ও করাতের আওয়াজকে বোঝানো হত। সন্ধ্যার পর শহরজুড়ে নেমে আসত অন্ধকার, সেই অন্ধকারে কখনও হয়ত একটি মোমবাতি বা একটি মশালের আলো উজ্জ্বল হয়ে ফুটে থাকত। এরকম একজন শহরের অধিবাসী যদি আজকের দিনের আধুনিক টোকিও, নিউ ইয়র্ক বা মুম্বাই শহর দেখেন, তবে কেমন হবে তার অনুভূতি?
