২। অন্ধ ঘুণপোকা
ইতিহাস কোন পথ ধরে এগোবে তার ব্যাখ্যা আমরা দিতে পারি না। কিন্তু ইতিহাস প্রসঙ্গে যে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যটা আমরা করতে পারি তা হল ইতিহাসের গতিপথ মানুষের ভালোমন্দের ধার ধারে না। ইতিহাস যে সবসময় মানুষের জন্য সবচেয়ে মঙ্গলজনক পথটাই বেছে নিয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। এমন কোনও প্রমাণ নেই যা দেখে আমরা বলতে পারি মানুষের জন্য কল্যাণকর সংস্কৃতিগুলোই টিকে থাকে আর অন্যগুলো হারিয়ে যায়। খ্রিস্টধর্ম যে ম্যানিকিয়ানিজিমের চেয়ে ভালো- এ কথা জোর দিয়ে বলার মতো কোনো যুক্তি আমাদের হাতে নেই। পারস্যের সাসানিদ সাম্রাজ্যের চেয়ে আরব সাম্রাজ্য যে মানুষের বেশি উপকার করেছে- এ কথাও আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না।
ইতিহাস যে মানুষের জন্য কল্যাণের পথটাই বেছে নেয়- এ কথা আমরা বলতে পারি না, কারণ এই ‘কল্যাণের’ কোনও সর্বজনগ্রাহ্য মাপকাঠি নেই। ‘ভালো’কে এক এক সংস্কৃতিতে এক একভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। বিজয়ীরা সবসময় ভাবে তাদের ধারণাটাই ঠিক। কিন্তু আমরা সেটা মেনে নেব কেন? খ্রিস্টানরা মনে করে ম্যানিকিয়ানিজমের উপর খ্রিস্টধর্মের বিজয় মানবজাতির জন্য ভালো। কিন্তু আমরা যদি খ্রিস্টধর্মের অনুসারী না হই, তাহলে এ কথা মেনে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। একইভাবে মুসলমানরা মনে করে যে মুসলিম শাসনের কাছে সাসানিদ সাম্রাজ্যের পতনও মানুষের জন্য কল্যাণকর ঘটনা। কিন্তু যে মুসলিম নয়, তার কাছে এমনটা নাও মনে হতে পারে। খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম, দুটোর কোনোটাই যদি জয়ী না হতো, তাহলে আজ সেটাকেও নিশ্চয়ই মানুষের জন্য ‘ভালো’ হিসেবেই দেখা হতো।
অনেক বিশেষজ্ঞের কাছে সংস্কৃতি জিনিসটা এক ধরনের মানসিক পরজীবী সংক্রমণের মতো একটা ব্যাপার, নিজের অজান্তেই যার বাহক হিসেবে কাজ করে মানুষ নিজে। ভাইরাসের মতো জৈব পরজীবী তাদের বাহকের শরীরের ভিতরে বেঁচে থাকে। এরা এক বাহকের শরীর থেকে অন্য বাহকের শরীরে ছড়ায়, বাহকের শরীর থেকে পুষ্টি আহরণ করে বাহককে দুর্বল করে ফেলে, অনেক ক্ষেত্রে মেরেও ফেলে। ভাইরাসের শুধু নিজের চাহিদা পূরণ করা দরকার, এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়ানো দরকার, বাহক বেঁচে থাকল না মারা গেল সেটা তার দেখার বিষয় নয়। ঠিক একইভাবে সাংস্কৃতিক ধারণাগুলোও টিকে থাকে মানুষের মস্তিষ্কের ভিতর। ভাইরাসের মতো এসব ধারণাও বিকাশ লাভ করে, এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। এগুলোর প্রতি মানুষের এক ধরনের দুর্বলতা তৈরি হয় এবং অনেক সময় সংস্কৃতির কারণে মানুষ নিজের প্রাণ ত্যাগ করতেও দ্বিধা বোধ করে না। খ্রিস্টানদের স্বর্গ আকাশে, কিংবা কম্যুনিস্টদের স্বর্গ এই পৃথিবীতেই- এইরকম একটা সাংস্কৃতিক ধারণাকে লালন ও প্রচার করতে অনেক মানুষ তাদের সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে দেয়, অনেকে মৃত্যুবরণ করতেও পিছপা হয় না। ভাইরাসের মতই মানুষ মরে গেলেও সাংস্কৃতিক ধারণাটা বেঁচে থাকে, আরও মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যায়। মার্ক্সবাদীদের মতে সংস্কৃতি হল অন্য মানুষের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের জন্য কিছু মানুষের ষড়যন্ত্র, কিন্তু মানসিক পরজীবীর ধারণাটা ঠিক সেটা বলে না। এই ধারণা অনুযায়ী, সংস্কৃতি হল ঘটনাচক্রে উদ্ভূত কিছু মানসিক পরজীবী, যারা নিজের টিকে থাকার স্বার্থে আক্রান্ত মানুষকে ব্যবহার করে মাত্র।
এ ধরনের ব্যাখ্যাকে অনেক সময় বলা হয় ‘মিমতত্ত্ব’ (memetics)। জীবের বিবর্তন যেমন হয় ‘জিন’ (gene) এর প্রতিলিপি তৈরির মাধ্যমে, ঠিক তেমনি সংস্কৃতির বিবর্তন হয় ‘মিম’ (meme) এর প্রতিলিপি তৈরির মাধ্যমে। এখানে জিন এবং মিম দুটোই তথ্যের ক্ষুদ্রতম একক, একটা জৈবিক, অন্যটা সাংস্কৃতিক।১ যেসব সংস্কৃতি তাদের মিমগুলোর প্রতিলিপি তৈরি করতে ও ছড়িয়ে দিতে পারে, সেগুলোই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে সক্ষম হয়। কিন্তু এসব মিমের বাহক মানুষগুলোর পরিণতি কী হচ্ছে সেটা এখানে অবান্তর।
অনেক বিশেষজ্ঞই এই মিমতত্ত্বকে গোনায় ধরতে চান না। তাঁদের কাছে এটা হল সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়াগুলোকে জৈবিক প্রক্রিয়াগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখার একটা আনাড়ি প্রয়াস মাত্র। কিন্তু এঁদের অনেকেই আবার মিমতত্ত্বেরই এক জ্ঞাতিভাই ‘উত্তরাধুনিকতা’ (postmodernism) তত্ত্বকে মানেন। মিমতত্ত্ব যেখানে মিমকে সংস্কৃতির গাঠনিক উপাদান হিসেবে ধরে নেয়, সেখানে উত্তরাধুনিকতা ডিসকোর্সকে (discourse) সংস্কৃতির গাঠনিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। এই যেমন উত্তরাধুনিক চিন্তাবিদদের মতে জাতীয়তাবাদ হল ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া একটি ‘মহামারী’- যার প্রভাবে এই দুই শতাব্দীতে পৃথিবী দেখেছে এতগুলো যুদ্ধ, অত্যাচার, ঘৃণা আর গণহত্যা। প্রথমে এক দেশের মানুষ এই মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছে, তারপর সেটা ছড়িয়ে গেছে আশপাশের দেশেও। এই ‘ভাইরাস’টা মানুষের জন্য উপকারী হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছিল, কিন্তু সেটা নিজের উপকারই করেছে কেবল।
একই রকম যুক্তি সমাজ বিজ্ঞানেও গেম থিওরির(Game Theory) একটা অংশ হিসেবে লক্ষ্য করা যায়। গেম থিওরি পুরো ব্যাপারটাকে অনেকজন খেলোয়াড়ের একটা খেলা হিসেবে দেখে। খেলায় খেলোয়াড়ের কোনো দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ অন্য খেলোয়াড়ের জন্য ক্ষতিকর হলেও সেটাই খেলার নিয়ম হিসেবে থেকে যায় এবং সবাই সে নিয়মটাই অনুসরণ করে খেলায় জিতবার চেষ্টা করে। অস্ত্রের প্রতিযোগিতা এর একটা ভালো উদাহরণ। এই প্রতিযোগিতায় নেমে অনেক প্রতিযোগীই সর্বস্বান্ত হয়ে যায়, কিন্তু শেষমেশ ক্ষমতার লড়াইয়ে এগোতে পারে না কেউই। পাকিস্তান যখন তার বিমান বাহিনীর জন্য নতুন বিমান কেনে, ভারতও হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। আবার ভারত যখন পারমাণবিক বোমা বানায়, পাকিস্তানও সেদিকে এগোয়। পাকিস্তান তার নৌবাহিনীর শক্তিবৃদ্ধি করলে ভারতও তার উচিত জবাব দেয়। এতকিছুর পরেও দেখা যায় ভারত আর পাকিস্তানের সামরিক শক্তির ভারসাম্যটা আগে যেমন ছিল পরেও তেমনই আছে, কিন্তু এর মাঝখান দিয়ে দুই দেশই খরচ করে ফেলেছে কোটি কোটি টাকা। যে টাকা তারা খরচ করতে পারত দেশের মানুষকে উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে, তা খরচ হয়ে গেল অস্ত্র কিনতে। এই অপ্রতিরোধ্য অস্ত্রের প্রতিযোগিতা একটা ছোঁয়াচে রোগের মতোই এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এতে কোনো দেশেরই উপকার হচ্ছে না, কিন্তু প্রতিযোগিতাটা নিজে টিকে থাকছে, আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ব্যাপারটা অনেকটা বিবর্তনের মতোই। একটা জিন নিজে টিকে থাকার জন্য সচেতনভাবে কিছুই করে না, অথচ প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলাফল হিসেবে সেটা টিকে যায়। অস্ত্রের প্রতিযোগিতাও ঠিক তেমন। এর নিজে থেকে টিকে থাকবার কোন ক্ষমতা নেই, কিন্তু ক্ষমতার লড়াইয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত উপজাত হিসেবে এই প্রতিযোগিতা সমাজে টিকে থাকে।
