এসবের মানে এই নয় যে, মানুষের সমাজে যে কোন সময় যে কোনও কিছু ঘটা সম্ভব। বিভিন্ন ভৌগোলিক, জীববৈজ্ঞানিক বা অর্থনৈতিক কারণে পরিস্থিতির উপর নানা রকম সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। আবার সেসব সীমাবদ্ধতার ভিতর থেকেই ইতিহাসের এমন সব পথ খুলে যায়, যাকে কোনোভাবেই কোনো নিয়মের মধ্যে ফেলা যায় না।
যারা ইতিহাসের চলার পথকে সুনির্দিষ্ট বা নিয়মতান্ত্রিক ভাবেন এই মন্তব্য তাদেরকে হয়ত কিছুটা হতাশ করবে। ইতিহাসের গতিপথকে নিয়মতান্ত্রিক ভাবার সুবিধা হল, সেক্ষেত্রে পৃথিবীর আজকের অবস্থা ও প্রচলিত বিশ্বাসগুলোকে অতীতের ঘটনাগুলোর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখানো যায়। এই যে আজকে আমরা বিভিন্ন জাতি হয়ে বিভিন্ন দেশে বাস করি, পুঁজিবাদী কাঠামোর উপর নির্ভর করে জাতির অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলি, মানবাধিকারের কথা বলি- এ সবকিছুকেই তখন প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভূত আমাদের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। ইতিহাসকে যদি আমরা নিয়মতান্ত্রিক বলে স্বীকার না করি তাহলে তার অর্থ দাঁড়ায় এই জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ আর মানবাধিকারে পৃথিবীর এত মানুষের বিশ্বাস স্রেফ কাকতালীয় একটা ব্যাপার।
ইতিহাসকে কখনো নির্দিষ্ট একভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ ইতিহাস কোনও নিয়ম মেনে এগোয় না। এক সাথে এত বেশি ঘটনা ঘটে, আর একটা ঘটনার উপর অন্যান্য ঘটনার প্রভাব এত বেশি যে সব মিলিয়ে পুরো ব্যাপারটা খুব জটিল হয়ে দাঁড়ায়। কোনো একটা ঘটনার একটা ছোট্ট পরিবর্তন হলেই তার ফলাফল একসময় বিরাট হয়ে যায়। শুধু তাই না, ইতিহাস হল একটা দ্বিতীয় মাত্রার বিশৃঙ্খল সিস্টেম (second order chaotic system)। বিশৃঙ্খল সিস্টেম দুরকম হতে পারে। প্রথম মাত্রার বিশৃঙ্খল সিস্টেমের উপর ভবিষ্যদ্বাণীর কোনও প্রভাব নেই। এর একটা উদাহরণ হল আবহাওয়া। আবহাওয়া কেমন হবে সেটা অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করে। কিন্তু আমরা সেটার কম্পিউটার মডেল দাঁড় করাতে পারি, আর সেই মডেল আবহাওয়া নিয়ন্ত্রক বিষয়গুলো নিয়ে হিসেব করে নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে। এই ভবিষ্যদ্বাণী আবহাওয়ার উপর কোন প্রভাব ফেলে না বা আবহাওয়া পাল্টে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা পালন করে না।
দ্বিতীয় মাত্রার বিশৃঙ্খলার সমস্যা হল, সেটা নিয়ে কোনও ভবিষ্যদ্বাণী করা হলে সেই ভবিষ্যদ্বাণীও পরবর্তী ঘটনার উপর প্রভাব বিস্তার করে। বাজার হল এরকম সিস্টেম। আজ যদি এমন একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম লেখা হয় যেটা শতকরা একশ ভাগ নিশ্চয়তায় আগামীকাল তেলের দাম কত হবে সেটা বলে দেবে, তাহলে কী হবে? ভবিষ্যদ্বাণী হওয়ার সাথে সাথে বাজারে তেলের দাম পালটে যাবে, ফলে ওই ভবিষ্যদ্বাণীও ব্যর্থ হবে। ধরা যাক আজ প্রতি ড্রাম তেলের দাম ৯০ ডলার, আর আমাদের কম্পিউটার প্রোগ্রাম বলল আগামীকাল সেটা ১০০ ডলার হয়ে যাবে। সাথে সাথে তেল ব্যবসায়ীরা তেল কিনতে ছুটবে, কারণ তারা জানে আজ ৯০ ডলারে তেল কিনে কাল ১০০ ডলারে সেটা বেচা যাবে। তাহলে আর আগামীকাল নয়, আজই তেলের দাম ১০০ ডলার হয়ে যাবে। কাল কত হবে? কেউ জানে না সেটা।
রাজনীতিও আরেকটা দ্বিতীয় মাত্রার বিশৃঙ্খল সিস্টেম। অনেকেই ১৯৮৯ সালের সোভিয়েত বিপ্লব কিংবা ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’ বিপ্লব কেন আগে থেকে আঁচ করা গেল না সেজন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের দায়ী করেন। কিন্তু সেটা অনুচিত। বিপ্লব তার সংজ্ঞানুযায়ীই অনুমানযোগ্য নয়। আগে থেকে কোন বিপ্লবের অনুমান করা গেলে সে বিপ্লবের সম্ভাবনাই নাকচ হয়ে যায়।
এখন প্রশ্ন হল, কেন আগে থেকে এসব বিপ্লব সম্পর্কে অনুমান করা যায়নি? ধরুন, ২০১০ সালে কয়েকজন রাজনীতি বিশ্লেষক আর তুখোড় কম্পিউটার প্রোগ্রামার মিলে এমন একটা অ্যালগরিদম তৈরি করল যেটা দিয়ে কবে কোথায় বিপ্লব হবে সেটা আগে থেকেই নিখুঁতভাবে জানা যাবে। তারপর তারা তাদের তৈরি প্রোগ্রামটা নিয়ে গেল রাষ্ট্রপতি হোসনি মোবারকের কাছে চড়া দামে বিক্রির আশায়। সেটা কিনে মোবারক যখন দেখবেন ২০১১ সালেই বিপ্লব আসন্ন, তখন কী করবেন তিনি? নিশ্চয়ই নাগরিকদের উপর থেকে করের বোঝা কমিয়ে দেবেন, কোটি কোটি ডলার খরচ করবেন নানাদিকে, সাথে তাঁর গোপন পুলিশ বাহিনীকেও তৈরি থাকতে বলবেন, যদি দরকার হয়। এরপর ২০১১ সাল আসবে, যাবে, কিন্তু বিপ্লব আর হবে না, কারণ বিপ্লব যাতে সংগঠিত না হয় সে ব্যবস্থা তো আগেই করা আছে। এরপর মোবারক সেই রাজনীতি বিশ্লেষক আর প্রোগ্রামারকে ডেকে টাকা ফেরত চাইবেন, কারণ প্রোগ্রামটা কাজ করেনি, তার ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ হয়েছে। হয়তো সেই টাকা দিয়ে তিনি নতুন একটা প্রাসাদই বানিয়ে ফেলতে পারতেন। প্রোগ্রামারও যুক্তি দেখাতে পারে, ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক হয়েছে বলেই তো বিপ্লব হয়নি, কিন্তু মোবারক তা মানবেন কেন?
তাহলে ইতিহাস পড়ে কী লাভ? ইতিহাস তো পদার্থবিজ্ঞান কিংবা অর্থনীতি নয় যে সবকিছু একেবারে গাণিতিক সূত্র মেনে চলবে। আসলে ইতিহাস পড়ার উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ জানা নয়, এর উদ্দেশ্য হল আমাদের চিন্তাকে বিস্তৃত করা, এইটুকু বুঝতে পারা যে বর্তমানে যা হচ্ছে তা মোটেই পূর্বনির্ধারিত কিছু নয়। এর উদ্দেশ্য হল এটা জেনে রাখা যে ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা যা যা ভাবি, সম্ভাব্য ঘটনার বিস্তার তার চেয়েও অনেক বেশি। আমরা যখন ইউরোপীয়দের আফ্রিকা দখল করার কথা পড়ি, সেটা আমাদের জানায় যে এখানে কালো মানুষের উপর সাদা মানুষের ছড়ি ঘোরানোটা কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, সেটা অনেকগুলো সম্ভাব্য ঘটনার মধ্যে একটা মাত্র, এবং ঘটনাটা অন্যরকমও হতে পারত।
