১। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে
ইতিহাসের পথের প্রতি মোড়ে মোড়ে থাকে অনেকগুলো বাঁক। অতীত থেকে একটি জানা পথে হেঁটে আমরা বর্তমানে পৌঁছাতে পারি। কিন্তু বর্তমান থেকে অগণিত অজানা পথ চলে গেছে ভবিষ্যতের দিকে। । এই অগণিত পথের মাঝে ইতিহাস সবসময় সহজ, মসৃণ, প্রায়-চেনা পথটাই বেছে নেবে, এমনটা ভাবাই স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক সময়ই ইতিহাসের দিকপালেরা ইতিহাসকে টেনে নিয়ে যায় অপ্রত্যাশিত, অমসৃণ পথে।
খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর শুরুর দিকে রোমান সাম্রাজ্যে অনেকগুলো ধর্মের বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হয়। রোমানরা সেসব সম্ভাবনা নাকচ করে তাদের পুরনো, বৈচিত্র্যপূর্ণ বহু-ঈশ্বরবাদী ধর্ম নিয়েও থাকতে পারত। রোমানদের এর আগের শতাব্দীটা কেটেছে তিক্ত গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। রোমান সম্রাট কনস্ট্যানটিন সে কথা মাথায় রেখেই সম্ভবত ভেবেছিলেন, পুরো সাম্রাজ্যের নানা রকম মানুষকে এক কাতারে আনতে হলে প্রয়োজন এমন কোনও ধর্ম, যার নীতিগুলো হবে সুনির্দিষ্ট। বেছে নেওয়ার মতো অনেক ধর্মই তাঁর সামনে ছিল। তিনি বেছে নিতে পারতেন ম্যানিকিয়ানিজম, বেছে নিতে পারতেন পারস্যের দেবতা মিথ্রাস কিংবা সিবিলির দেবী আইসিসকে, অথবা গ্রহণ করতে পারতেন জরুথস্ট্রবাদ বা ইহুদি ধর্ম, এমনকি বৌদ্ধধর্মকেও। এতকিছুর মাঝেও তিনি কেন যিশুখ্রিস্টের পথে হাঁটলেন? খ্রিস্টধর্মে কি এমন কিছু ছিল যার প্রতি সম্রাটের ব্যক্তিগত বিশেষ আগ্রহ ছিল? নাকি খ্রিস্টধর্মের মাধ্যমে তাঁর কোনও উদ্দেশ্য সহজে পূরণ হতো? খ্রিস্টধর্ম বেছে নেওয়ার পিছনে কি তাঁর ধর্মীয় কোনও অভিজ্ঞতার ভূমিকা ছিল? নাকি খ্রিস্টধর্মের প্রসার দেখে তাঁর উপদেষ্টারা তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন সেটা গ্রহণ করতে? ইতিহাসবিদরা এমন অনেক রকম ধারণা করতে পারেন, কিন্তু সঠিক কারণটা বের করে আনতে পারেন না। খ্রিস্টধর্ম কীভাবে রোমান সাম্রাজ্য দখল করল তার বিশদ বর্ণনা তাঁরা দিতে পারেন, কিন্তু ঠিক কী কারণে সেটা সম্ভব হল তা বলতে পারেন না।
কোনো কিছু ‘কীভাবে’ হল তার বর্ণনা দেওয়া, আর ‘কেন’ হল তা ব্যাখ্যা করা- এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী? পার্থক্য হল, ‘কীভাবে’র উত্তর দিতে বিভিন্ন সময়ে ঘটা ঘটনাগুলোকে ধারাবাহিকভাবে সাজালেই হয়। আর ‘কেন’র উত্তরে সেই ঘটনাগুলোর মধ্যে কার্য-কারণের সূত্র তৈরি করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কেউ কেউ খ্রিস্টধর্মের উত্থানের মতো ঘটনাগুলোর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেন। তাঁরা মানুষের ইতিহাসকে পরিবেশ, জীববিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। তাঁদের মতে, ভূমধ্যসাগরীয় রোমান অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, বংশগতি ও অর্থনীতিই সেখানে একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রতিষ্ঠা অনিবার্য করে তোলে। তবে বেশিরভাগ ইতিহাসবিদই এ ধরনের তত্ত্বের ব্যাপারে সন্দিহান। ইতিহাসের ব্যাপারটাই এমন- কোনো একটা সময়ের কথা যত বেশি জানা যায়, তার ঘটনাপ্রবাহের ব্যাখ্যা দেওয়া ততটাই কঠিন হয়ে পড়ে। যারা ওই সময়ের ভাসা ভাসা জ্ঞান রাখে, তারা কী ঘটেছে তার উপরে জোর দেয়, পরের ঘটনাগুলো দেখে কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। আর যারা খুব ভালোভাবে জানে, তারা আরও কী কী ঘটতে পারত কিন্তু ঘটেনি, সেগুলোর ব্যাপারেও ভাবে।
সত্যি বলতে কী, যারা সেই সময়ের কথা সবচেয়ে ভালোভাবে জানত, মানে ওই সময়ে যারা বেঁচে ছিল, তারাই ছিল সবচেয়ে অন্ধকারে। সম্রাট কনস্ট্যানটিনের আমলে সাধারণ একজন রোমান নাগরিকের কাছে তাদের সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ ছিল ধোঁয়াশা। ইতিহাসের নিয়মই এই- পিছনে ফেলে আসা ঘটনাকে যতটা অবশ্যম্ভাবী মনে হয়, বর্তমান তার ধারে কাছেও যায় না। এখনকার সময়ের জন্যও কথাটা খাটে। আমরা কি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি? নাকি আরও খারাপ সময় সামনে আসছে? চীন কি সত্যিই একদিন সারা পৃথিবীর উপর ছড়ি ঘোরাবে? আমেরিকার আধিপত্য কি খর্ব হবে কোনোদিন? একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর মৌলবাদী আচরণ কি অচিরেই থামবে, নাকি আরও অনেক দিন পর্যন্ত চলবে? আমাদের সামনে কী আছে- বিরাট কোনো পরিবেশ বিপর্যয় নাকি প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ? আজ এসব প্রশ্নের প্রত্যেকটা উত্তরের পক্ষেই ভালো ভালো যুক্তি দেওয়া সম্ভব, কিন্তু কী হবে সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারবে না কেউ। অথচ আজ থেকে দশ কি বিশ বছর পরে মানুষ যখন পিছনের কথা ভাববে, তখন তাদের মনে হবে, যা যা ঘটেছে ঠিক সেগুলোই তো হওয়ার কথা!
আবার অনেক সময় যেটা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম সেটাই হয়। ৩০৬ খ্রিস্টাব্দে কনস্ট্যানটিন যখন রাজা হলেন, তখন পৃথিবীতে খ্রিস্টধর্ম পালন করত অল্প কিছু মানুষ। তখন যদি কেউ বলত এই খ্রিস্টধর্মই হতে যাচ্ছে রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম, তাতে মানুষের প্রতিক্রিয়া কী হত জানতে হলে “২০৫০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ধর্ম হবে হিন্দু ধর্ম”- এ কথাটা একটু প্রচার করে দেখতে পারেন। ১৯১৩ এর অক্টোবরে বলশেভিকরা ছিল রাশিয়ার একটা ছোট দল। এই ছোট দলটাই যে চার বছরের মধ্যে পুরো দেশটা দখল করবে- এ কথাটা ছিল অবিশ্বাস্য। ৬০০ খ্রিস্টাব্দের আরবের মরুবাসী মানুষেরা আটলান্টিকের তীর থেকে ভারত পর্যন্ত জিতে নেবে, এ কথা তো আরও অবিশ্বাস্য ছিল। বাইজানটাইন (Byzantine) সেনাবাহিনী যদি আরবদের প্রাথমিক আক্রমণ ঠেকিয়ে দিতে পারত, তাহলে ইসলাম ধর্মও আরবের অল্প কিছু মানুষের ধর্ম হয়েই থাকত। তখন আমাদের ইতিহাসবিদরাও মক্কার একজন মধ্যবয়সী বণিকের উপর অবতীর্ণ ঐশ্বরিক বাণী কেন মানুষের মাঝে বিস্তৃত হতে পারল না- সেটা খুব সহজে ব্যাখ্যা করতেন।
