ইতিহাসকে ভালো আর খারাপ এই দুইটি সুস্পষ্ট আলাদা ভাগে ভাগ করে ফেলার প্রবণতা প্রায়শই দেখা যায়। এই ভাগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাম্রাজ্য আর তার শাসকরা পড়েন মন্দের খাতায়। এটা সত্য, বেশিরভাগ সাম্রাজ্যের জন্ম হয়েছে নির্দয় রক্তপাতের মাধ্যমে, আর সাম্রাজ্য টিকে থাকে যুদ্ধ আর বঞ্চনার স্তম্ভের উপর ভর করে। কিন্তু, একথাও সত্য যে, আজকের দিনের সংস্কৃতি, সভ্যতা, রীতিনীতির অধিকাংশই এসেছে সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তুপের ছাই থেকে। সুতরাং, সাম্রাজ্যকে পুরোপুরি খারাপের তালিকায় ফেলা হলে, নিজেদের আজকের পরিচয়, রীতি, আইনকে আমরা কোন তালিকায় ফেলব?
বেশ কিছু রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং মতবাদ সাম্রাজ্যবাদ থেকে সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ছেঁকে নিয়ে একটি বিশুদ্ধ, নতুন সভ্যতার কথা বলতে চায়, যেখানে খারাপ কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না। এই ধরনের তত্ত্বগুলো হয় একেবারেই অপরিপক্ব নতুবা নতুন মোড়কে মোড়া উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং গোঁড়ামির ভিন্ন একটি রূপ মাত্র। আপনি হয়ত এরকম দাবি করতে চাইবেন, মানুষের গ্রন্থিত ইতিহাসের শুরুতে উদ্ভুত অগণিত সংস্কৃতির কিছু উপাদান বিশুদ্ধ, অপাপবিদ্ধ এবং পুরোপুরি অবিকৃত। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন সংস্কৃতিই এরকম কোন দাবি করে না, বিশেষত বর্তমান পৃথিবীতে টিকে থাকা কোন সংস্কৃতিই এরকম কোন দাবি করতে পারে না। মানুষের সকল সংস্কৃতি কোনও না কোনও সাম্রাজ্য এবং সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতার সাথে সম্পর্কিত, কোন প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক ছুরি-কাঁচি সাম্রাজ্যকে কেটে আলাদা করে তার সংস্কৃতিকে নিতে পারে না, তার অনেক আগেই সে সংস্কৃতির মৃত্যু ঘটে।
উদাহরণ হিসেবে আজকের স্বাধীন ভারত এবং ব্রিটিজ রাজের মধ্যকার অম্ল-মধুর সম্পর্কের কথাই ধরুণ। ব্রিটিশরা ভারত অধিকার করার সময় লাখ লাখ ভারতীয় নিহত হয়, তাদের উপেক্ষা ও অত্যাচারের শিকার হয় কোটি কোটি ভারতীয়। এত কিছুর পরেও অনেক ভারতীয়ই নতুন স্বাদের লোভে ‘ব্যক্তি-স্বাধীনতা’ এবং ‘মানবাধিকারের’ মত পশ্চিমা ধারণার চাটনী গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশরা যখন তাদের ‘সমঅধিকার’ বা ‘স্বাধীনতা’ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ে।
এতকিছুর পরেও, অাধুনিক ভারত রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে। ব্রিটিশরা এই উপমহাদেশের অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে, নিপীড়ন করেছে, আহত করেছে কিন্তু তারাই আবার ভারতের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অগণিত রাজ্য, মতবাদ এবং গোত্রকে একত্রিত করে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে, তাদের মাঝে তৈরি করেছে অভিন্ন জাতীয়তাবাদের ধারণা এবং জন্ম দিয়েছে একটি দেশের যা কম-বেশি একটি রাজনৈতিক অস্তিত্ব হিসেবে কাজ করতে পারে। ব্রিটিশরাই তৈরি করে দিয়েছে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার ভিত্তি, তৈরি করেছে এর প্রশাসনিক কাঠামো এবং দেশজুড়ে নির্মাণ করেছে রেলপথ যা ভারতীয় অর্থনীতিকে একীভূতকরণের জন্য ছিল অপরিহার্য। ইংরেজি এখনও এই উপমহাদেশের প্রধান ভাষা, কোনও রাজ্যের জনগণের মাতৃভাষা হিন্দি, তামিল, মালায়ালাম যাই হোক না কেন একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করার মাধ্যম হিসেবে তারা ব্যবহার করে ইংরেজি ভাষা। ভারতীয়রা ক্রিকেটের অন্ধ ভক্ত আর চা তাদের সবচেয়ে প্রচলিত পানীয়, এই খেলা এবং চা এই দুটোই তারা পেয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে। ব্রিটিশরাই উনিশ শতকের মধ্যভাগে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ভারতে চায়ের চাষ শুরু করে। এর আগে পর্যন্ত ভারতে চায়ের চাষ হত না। অহংকারী ব্রিটিশ সাহেবরা চা পানের অভ্যাস পুরো উপমহাদেশে ছড়িয়ে দেয়।

বর্তমানে ভারতীয়দের মাঝে একটি ভোট করা হলে কতজন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে পাওয়া গণতন্ত্র, ইংরেজি, রেলওয়ে, আইন ব্যবস্থা, ক্রিকেট এবং চা তাদের জীবন থেকে বর্জন করতে রাজি হবেন? এবং যদি তারা এসব বর্জন করতে রাজিও হন, এই ভোট দেওয়াটাই কি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে তাদের ঋণের পরিমাণকে তুলে ধরবে না?
যদি আমরা একটি নিষ্ঠুর সাম্রাজ্যের পূর্ববর্তী বিশুদ্ধ সংস্কৃতিকে সংরক্ষণের জন্য সেই সাম্রাজ্যের সকল সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে বর্জনও করি, শেষমেশ আমরা কী সংরক্ষণ করব? সম্ভবত, এই সাম্রাজ্যের পূর্ববর্তী কোনও সাম্রাজ্যের সংস্কৃতিকে যা স্বাভাবিকভাবেই হবে এই সাম্রাজ্যের সংস্কৃতির থেকেও অনেক বেশি নির্মম। যারা ব্রিটিশ রাজকে ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গহানির জন্য দায়ী করত, তারা দিল্লীর মসনদ দখল করা মুঘল সম্রাট এবং তার সাম্রাজ্যের রেখে যাওয়া সংস্কৃতিকেই বিশুদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতি বলে মনে করত। এবং কেউ মুসলিম সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকেও বিশুদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতিকে রক্ষার চিন্তা করলে, তিনি সম্ভবত তার আগের গুপ্ত সাম্রাজ্য, কুশান সাম্রাজ্য এবং মৌর্য সাম্রাজ্যের সংস্কৃতিকে বিশুদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতি ভেবে থাকবেন। যদি একজন উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী ব্রিটিশদের নির্মিত সব দালানকোঠা ধ্বংসও করে ফেলেন, ভারতের মুসলিম শাসকদের সময় তৈরি হওয়া স্থাপনাগুলোর ব্যাপারে তিনি কী সিদ্ধান্ত নেবেন? ভেঙে ফেলবেন তাজমহল?