আরব সাম্রাজ্যের ঘটনাও অনেকটা এরকম। সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যখন এই সাম্রাজ্যের পত্তন হয়, তখন সাম্রাজ্যের আরব-মুসলিম শাসক এবং অধিকৃত মিশরীয়, সিরীয়, ইরানি এবং বারবার জাতি যারা আরব বা মুসলিম কোনটাই ছিল না, তাদের মাঝে বৈষম্যের একটি স্পষ্ট ভেদরেখা ছিল। অধীনস্থ অনেক জাতিই পরে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস স্থাপন করে, আরবি ভাষাকে গ্রহণ করে এবং অভ্যস্ত হয়ে পড়ে সাম্রাজ্যের মিশ্র সংস্কৃতিতে। আরবের প্রাচীন শাসকশ্রেণী নতুন জাতে ওঠা এসব অধিকৃতদের শত্রুতার চোখে দেখত, তাদের ভেতর কাজ করত একান্ত নিজস্ব পরিচিতি এবং সামাজিক মর্যাদা হারিয়ে ফেলার ভয়। অন্যদিকে, হতবুদ্ধি ধর্মান্তরিতরা এরপর সাম্রাজ্যে এবং ইসলামের দুনিয়ায় তাদের সমান অধিকারের দাবী করতে শুরু করে। শেষমেষ তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়। মিশরীয়, সিরীয় এবং মেসোপটেমিয়ানরা ক্রমাগত: ‘আরব’ নামে পরিচিতি পেতে থাকে। আরবরা, সে প্রাচীন আরব বংশদ্ভুত আরবই হোক আর নতুন রূপান্তরিত আরবই হোক, ক্রমাগত: অনারব মুসলিমদের দ্বারা শাসিত হতে থাকে, বিশেষত ইরানি, তুর্কি এবং বারবার জাতির দ্বারা। আরব সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় সাফল্য হল, এই সাম্রাজ্যের সংস্কৃতিকে অনেক অনারব মানুষ অকুণ্ঠচিত্তে গ্রহণ করেছে। প্রকৃত আরব সাম্রাজ্যের পতন এবং প্রকৃত আরবদের আধিপত্য চলে গেলেও এরাই এই সংস্কৃতির রক্ষণাবেক্ষণ, উন্নয়ন এবং প্রসারে কাজ করে চলেছে।
চীনাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প ছিল আরও অনেক বেশি সফল। একসময় বর্বর হিসেবে অভিহিত, জগাখিচুড়ি পাকানো বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে সফলভাবে চীনা সাম্রাজ্যের সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ‘হান চাইনিজ’ (এই নামটি এসেছে হান সামাজ্র্যের নাম থেকে যার স্থায়িত্ব ছিল ২০৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ) নামে পরিচিতি লাভ করে। চীন সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় সফলতা হল এটি এখনও বহাল তবিয়তে জীবিত, যদিও বাইরে থেকে দেখলে তিব্বত এবং শিনজিয়াং কে ঘেরা একটা ভৌগোলিক সীমানা ছাড়া সাম্রাজ্যের আর কোন বৈশিষ্ট্যই চোখে পড়ে না। চীনে নব্বই শতাংশের বেশি মানুজনকে তারা নিজেরা এবং বাইরের লোকজন এখনও ‘হান’ নামে জানে।
একই পদ্ধতিতে আমরা দুনিয়াজুড়ে গত কয়েক দশক ধরে চলা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার (decolonisation) প্রক্রিয়াটিও ব্যাখ্যা করতে পারি। অাধুনিককালে ইউরোপীয়রা উন্নত পশ্চিমা সংস্কৃতি প্রচারের নামে প্রায় পুরো দুনিয়াটাকেই জয় করে ফেলেছে। তারা এ কাজে এতটাই সফল যে, কোটি কোটি মানুষ একে একে নিজেদের জীবনে এই সংস্কৃতির অনেক উপাদান গ্রহণ করছে। ভারতীয়, আফ্রিকান, আরব, চাইনিজ এবং মাওরিরা এখন ফ্রেঞ্চ, ইংরেজি বা স্প্যানিশ ভাষা শেখে। তারা এখন ‘মানবাধিকার’ এবং ‘ব্যক্তি-স্বাধীনতা’র ধারণায় বিশ্বাস করে এবং ‘স্বাধীনতা’, ‘পুঁজিবাদ’, ‘সমাজতন্ত্র’, ‘নারীবাদ’ এবং ‘জাতীয়তাবাদের’ মত পশ্চিমা ধ্যান-ধারণাগুলো তারা গ্রহণ করতে শুরু করেছে।
সাম্রাজ্যের চক্র
| ধাপ | রোম | ইসলাম | ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ |
| প্রথমে একদল মানুষ একটা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে | রোমানরা তৈরি করল রোমান সাম্রাজ্য। | আরবরা তৈরি করল আরব খিলাফত। | ইউরোপীয়রা তৈরি করল ইউরোপীয় সাম্রাজ্য। |
| সেই সাম্রাজ্যজুড়ে একটা সাধারণ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে | গ্রেকো-রোমান সংস্কৃতি। | আরব-মুসলিম সংস্কৃতি। | পশ্চিমা সংস্কৃতি। |
| সাম্রাজ্যের প্রজারা ধীরে ধীরে সেই সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে | জনগণ ল্যাটিন, রোমান আইনকানুন, রোমান রাজনৈতিক ধারণাগুলো গ্রহণ করল। | জনগণ আরবি ভাষা, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল। | জনগণ ইংরেজি ও ফরাসি ভাষা এবং সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, মানবাধিকার ইত্যাদি ধারণা গ্রহণ করল। |
| এরপর এই নতুন সাম্রাজ্যবাদী মূল্যবোধে দীক্ষিত জনগণ শাসকগোষ্ঠীর সমান অধিকার পেতে সচেষ্ট হয় | ইলিরিয়ান, গল এবং পিউনিকরা রোমান মূল্যবোধের ভিত্তিতে রোমানদের সমান অধিকার দাবি করল। | মিশরীয়, ইরানি এবং বারবাররা ইসলামি ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে আরবদের সমান অধিকার দাবি করল। | ভারতীয়, চীনা ও আফ্রিকানরা জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, মানবাধিকার ইত্যাদি পশ্চিমা মূল্যবোধের ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের সমান অধিকার দাবি করল । |
বিশ শতকে, বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠী, যারা পশ্চিমা মূল্যবোধগুলোকে গ্রহণ করেছিল, তারা সেইসব মূল্যবোধের দোহাই দিয়েই তাদের ইউরোপীয় শাসকদের কাছে সমতার দাবি তোলে। ব্যক্তি-স্বাধীনতা, সমাজতন্ত্র এবং মানবাধিকারের মত পশ্চিমা ধ্যান-ধারণাগুলোই জন্ম দেয় পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে অনেক উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের। যেভাবে মিশরীয়, ইরানি এবং তুর্কিরা আরবের প্রকৃত বিজয়ীদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ গ্রহণ ও পরিমার্জন করেছিল, ঠিক একই ভাবে আজকের দিনের ভারতীয়, আফ্রিকান এবং চাইনিজরাও তাদের পূর্ববর্তী পশ্চিমা শাসকদের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির উপাদানগুলোকে গ্রহণ করে সেগুলোকে নিজেদের প্রয়োজন এবং ঐতিহ্যের উপযোগী করে পরিমার্জন করে নিচ্ছে।
ইতিহাসের নায়ক, ইতিহাসের খলনায়ক
