সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এই বিব্রতকর প্রশ্নের সমাধান কী তা কারোরই জানা নেই। যে পথেই আমরা এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি, প্রথমে আমাদের এটা মেনে নিতে হবে যে এটা একটা জটিল গোলকধাঁধা এবং এখানে কাউকে ঢালাওভাবে নায়ক, কাউকে খলনায়ক বানানোর সুযোগ নেই। আর যদি আমরা সেটা করি, তাহলে আমাদেরকে একথা স্বীকার করে নিতে হবে যে, ইতিহাসের পরিক্রমায় আমরা এতদিন মূলত খলনায়কদের দেখানো পথ ধরেই হেঁটেছি।
নতুন বৈশ্বিক সাম্রাজ্য
প্রায় ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে বেশিরভাগ মানুষ কোনও না কোনও সাম্রাজ্যে বসবাস করে আসছে। যতদূর মনে হয়, ভবিষ্যতের মানুষও তাই করবে, সাম্রাজ্যের অধীনেই হবে তার বসবাস। তবে, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সাম্রাজ্য হবে বৈশ্বিক সাম্রাজ্য। প্রকট হয়ে উঠবে গোটা দুনিয়াকে শাসন করা একটি একক সাম্রাজ্যের সাম্রাজ্যবাদী দর্শন।
একবিংশ শতাব্দী যত এগিয়ে যাচ্ছে, জাতীয়তাবাদ তত বেশি জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। মানুষ ভাবতে শুরু করেছে, একটি বিশেষ জাতির মানুষ নয়, দুনিয়ার সকল মানুষ পৃথিবীর রাজনৈতিক কর্তৃত্বের উৎস এবং মানুষের অধিকার রক্ষা এবং সকল মানুষের ইচ্ছাকে মর্যাদা দেয়াই হওয়া উচিত রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু, দুনিয়াজুড়ে দুইশটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র এই চিন্তার পক্ষে সুবিধার চেয়ে বিপত্তিই বেশি তৈরি করে। যেহেতু সুইডিশ, ইন্দোনেশিয়ান, নাইজেরিয়ান সবাই একইরকম সমান অধিকার চায়, সুতরাং তাদের সে অধিকার রক্ষার জন্য একটি একক সাধারণ সরকার গঠনই কি সহজ সমাধান নয়?
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ার মত বিশ্বজনীন সমস্যাগুলোর উদ্ভব ধীরে ধীরে বহুসংখ্যক স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ফিকে করে দিচ্ছে। কোন সার্বভৌম রাষ্ট্রই এককভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতার মত সমস্যাগুলোকে সমাধান করতে পারবে না। চাইনিজরা স্বর্গ থেকে মানব জাতির সমস্যা সমাধানের জন্য ‘স্বর্গীয় অনুমোদন’ পেয়েছিল। আধুনিকালের মানুষ মানুষকে ওজন স্তরের ছিদ্র মেরামত এবং গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ এর মত স্বর্গীয় সমস্যাগুলোকে সমাধানের জন্য ‘স্বর্গীয় অনুমোদন’ দেবে। বৈশ্বিক এই সাম্রাজ্যের সনাক্তকারী রঙ হতে পারে সবুজ।
২০১৪ সালে এসেও পৃথিবী রাজনৈতিকভাবে অনেক ভাগে বিভক্ত, কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো খুব দ্রুত তাদের স্বাধীনতা হারাচ্ছে। কোনও রাষ্ট্রই তাদের ইচ্ছামত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তৈরি করতে পারছে না, ইচ্ছে হলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারছে না যুদ্ধে, এমনকি সবাইকে অগ্রাহ্য করে খেয়াল খুশি মত কোন অভ্যন্তরীণ রীতি নীতিও তৈরি করতে পারছে না। রাষ্ট্রগুলো ক্রমশ ঝুঁকছে বিশ্ববাজারের কৌশলের প্রতি, উদার হচ্ছে বিশ্বজনীন প্রতিষ্ঠান এবং এনজিওগুলোর ব্যাপারে। সাহায্য নিচ্ছে বিশ্বের জনমত এবং আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার। রাষ্ট্রকে বাধ্য হয়েই তার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, পরিবেশ বিষয়ক পরিকল্পনা এবং ন্যায়বিচারের জন্য বৈশ্বিক মানদণ্ড মেনে চলতে হচ্ছে। কমছে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা আর মতামতের প্রতি একাত্মতা; পুঁজি, শ্রম আর তথ্যের অফুরন্ত স্রোত পালটে দিচ্ছে পৃথিবী, গড়ে তুলছে নতুন বিশ্ব।
বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের যে রূপ আমাদের চোখে ভেসে ওঠে, কোন বিশেষ রাষ্ট্র বা জাতিগোষ্ঠী সেই সাম্রাজ্যের শাসক নয়। অনেকটা রোমান সাম্রাজ্যের মত, একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং সাধারণ স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য সেই বৈশ্বিক সাম্রাজ্য শাসন করে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর উচ্চপদস্থ কিছু মানুষ। দুনিয়াজুড়ে অনেক অনেক উদ্যোক্তা, প্রকৌশলী, বিশেষজ্ঞ, পণ্ডিত, আইনজীবী, ব্যবস্থাপককে প্রতিনিয়ত এই নতুন সাম্রাজ্যের অংশ হবার জন্য আহ্বান করা হচ্ছে। তারা কি নতুন সাম্রাজ্যের এই ডাকে সাড়া দেবে নাকি নিজ নিজ রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকবে – এই সিদ্ধান্ত তাদের হাতে। মানুষ ক্রমাগত দলে দলে এই সাম্রাজ্যের ডাকেই সাড়া দিচ্ছে।
——————
1 Nahum Megged, The Aztecs (Tel Aviv: Dvir, 1999 [Hebrew]), 103.
2 Tacitus, Agricola, ch. 30 (Cambridge, Mass.: Harvard University Press, 1958), 220–1.
3 A. Fienup-Riordan, The Nelson Island Eskimo: Social Structure and Ritual Distribution (Anchorage: Alaska Pacific University Press, 1983), 10.
4 Yuri Pines, ‘Nation States, Globalization and a United Empire – the Chinese Experience (third to fifth centuries BC)’, Historia 15 (1995), 54 [Hebrew].
5 Alexander Yakobson, ‘Us and Them: Empire, Memory and Identity in Claudius’ Speech on Bringing Gauls into the Roman Senate’, in On Memory: An Interdisciplinary Approach, ed. Doron Mendels (Oxford: Peter Land, 2007), 23–4.
১২. ধর্মের রীতিনীতি
মধ্যযুগে মধ্য এশিয়ার মরুশহর সমরখন্দের (Samarkand) বাজার ছিলো জমজমাট। সেখানে একদিকে যেমন সিরিয়ার ব্যবসায়ীরা নিয়ে আসত চমৎকার চীনা রেশম, অন্যদিকে স্তেপ (Steppes) অঞ্চলের যুদ্ধবাজ লোকেরা বেচাকেনা করত পশ্চিমের দেশ থেকে আনা ক্রীতদাস। দোকানীরা তাদের পণ্য বেচে পকেটে পুরত কোনো নাম না জানা রাজার ছবি আর স্বাক্ষরওয়ালা চকচকে সোনার মোহর। সেই বাজারে ছিল উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিমের নানা দেশের, নানা জাতের মানুষের নিত্য আনাগোনা। এই নানান জাতের মানুষের মিলনমেলা শুধু যে ব্যবসা উপলক্ষ্যে ঘটত এমনটা নয়, একই চিত্র দেখা যেত যুদ্ধের ক্ষেত্রেও। ১২৮১ সালে কুবলাই খান যখন তাঁর সৈন্যসামন্ত নিয়ে জাপান আক্রমণ করেন, তখন যুদ্ধ উপলক্ষ্যেও অনেক জাতের মানুষ একত্রিত হয়েছিলো। সে যুদ্ধে চামড়া ও পশমের পোশাক পরা মোঙ্গল ঘোড়সওয়ারের পাশাপাশি লড়েছিলো বাঁশের টুপি পরা চীনা পদাতিক বাহিনী। কোরিয়ার মাতাল সৈন্যদের সাথে প্রায়ই ঝগড়া বাধত গায়ে উল্কি আঁকা দক্ষিণ চীন সাগরের নাবিকদের। মধ্য এশিয়ার কারিগরেরা মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনত ইউরোপীয়দের অভিযানের কাহিনী। কিন্তু এরা সবাই ছিলো একই সম্রাটের অনুগত।
