নুমানশিয়ানদের পতনের একশ’ বছর পরের একজন স্বচ্ছল আইবেরিয়ানের কথা ধরা যাক। তিনি তার বাবা-মার সাথে নিখুঁত উচ্চারণে তার অতি পরিচিত সেলটিক ভাষাতেই কথা বলেন, কিন্তু, বড়কর্তাদের সাথে কথা বলা এবং ব্যবসাপাতি পরিচালনার জন্য এতদিনে তিনি ল্যাটিন ভাষাটা বেশ ভালমতই আয়ত্ত করেছেন, যদিও উচ্চারণটা এখনও অতটা সড়গড় হয়নি। স্ত্রীর সেলটিক ঘরানার নকশাদার গয়নার প্রতি আকর্ষণকে তিনি কোনোমতে মেনে নেন, কিন্তু তার সহধর্মিণী যে এখনও সেলটিকদের গতানুগতিক রুচির বাইরে বেরোতে পারল না এটা নিয়ে তার মনে খানিকটা আক্ষেপও কাজ করে। আফসোস করেন, রোমান গভর্নরের স্ত্রীর সাদামাটা নকশার গয়নার সৌন্দর্যটা যদি বুঝতেন তার প্রিয়তমা স্ত্রী! তিনি নিজে রোমানদের মত টিউনিক (আজানুলম্বিত, ঢিলা, খাটো আস্তিনযুক্ত বা আস্তিনহীন এক ধরনের পোশাক) পরিধান করেন, গবাদিপশুর ব্যবসায় লাভ হবার দরুণ এবং রোমান বাণিজ্য নীতির সাথে তার ব্যবসার কোন দ্বন্দ্ব না থাকায় রোমানদের বাড়ির আদলে একটি বড়সড় বাড়িও নির্মাণ করেছেন। এমনকি তিনি অনায়াসে আবৃত্তি করতে পারেন বিখ্যাত কবি ভার্জিল (Virgil) এর জর্জিকস (Georgics) কবিতার তৃতীয় খণ্ডের পংক্তিমালা। কিন্তু, এতকিছুর পরেও রোমানরা তাকে একজন আধা-বর্বর হিসেবেই গণ্য করে। চরম হতাশা নিয়ে তিনি লক্ষ্য করেন, সরকারী পদস্থদের সাথে সাক্ষাতের কোন সুযোগ তিনি পাচ্ছেন না, পাচ্ছেন না অ্যাম্ফিথিয়েটারের সুবিধাজনক কোন আসন।
ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে অনেক শিক্ষিত ভারতীয়দের অবস্থাও ছিল একইরকম। তাদের ব্রিটিশ প্রভুরাও তাদের সাথে একই রকম আচরণ করতেন। এ ব্যাপারে ইংরেজি ভাষায় বিশেষভাবে পারদর্শী একজন উচ্চাভিলাষী ভারতীয়’র একটি গল্প বলা যেতে পারে। তিনি পশ্চিমা নাচের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, দৈনন্দিন জীবনে ছুরি এবং কাঁটাচামচ দিয়ে খাওয়ার অভ্যাসও করেছিলেন। এসব সাহেবী আদবকেতা শেখার পর তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে ব্যারিস্টারী ডিগ্রী অর্জন করেন। স্যুট-টাই পরা কেতাদুরস্ত এই তরুণ আইনজীবী কাল চামড়ার মানুষজনের জন্য নির্ধারিত ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণীতে ভ্রমণ করার বদলে প্রথম শ্রেণীতে ভ্রমণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। শুধুমাত্র এই কারণে তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্রিটিশ উপনিবেশে একটি ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল। লোকটির নাম ছিল ‘মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী’।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরাজিতদের সাংস্কৃতিক অভিযোজন এবং শাসকদের আত্মীকরণের এই প্রক্রিয়াটি একসময় বিজিত এবং শাসকশ্রেণীর মধ্যকার বিভেদের দেয়াল সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। সেক্ষেত্রে বিজিতরা নিজেদেরকে সাম্রাজ্যের অংশ ভাবতেন এবং শাসকশ্রেণীও বিজিতদেরকে নিজেদের সমান মনে করতেন। শাসক এবং শাসিত দুইপক্ষই ‘তাদের’কে ‘আমাদের’ মত ভাবতে শুরু করেন। অনেক শতকের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের পর রোমান সাম্রাজ্যের সকল অধিবাসীকেই রোমান নাগরিকত্ব দেয়া হয়। রোমান বংশোদ্ভুত নন এমন অনেকেই রোমান সৈন্যবাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় পরিষদে নিয়োগ লাভ করেন। ৪৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট ক্লডিয়াস বেশ কিছু সংখ্যক গ্যালিক (ফরাসি) সম্প্রদায়ের মানুষকে রাষ্ট্রীয় পরিষদে নিয়োগ দেন এবং বলেন ‘তারা তাদের আচার-আচরণ, সংস্কৃতি এবং বিবাহ বন্ধনের দ্বারা আজ আমাদের একজন হয়ে উঠেছে’। সংসদের অনেক সভ্য জাতিগতভাবে এককালের শত্রুদেরকে রােমান রাজনীতির একদম কেন্দ্রবিন্দুতে সুযোগ করে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন। উত্তরে ক্লডিয়াস তাদের একটি অপ্রিয় সত্য কথা স্মরণ করিয়ে দেন। সেটি হল- সাংসদদের বেশিরভাগেরই পূর্বপুরুষ ছিল ইতালিয়ান আদিবাসী যারা এককালে রোমের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল এবং পরে তাদেরকে রোমের নাগরিকত্ব দেয়া হয়। রোমান সম্রাট সবাইকে এটাও স্মরণ করিয়ে দেন, তার নিজের পূর্বপুরুষও ছিলেন ইতালির স্যাবাইন (Sabine) গোত্রভুক্ত।৫
দুইশত খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে রোমান সাম্রাজ্য শাসন করেন আইবেরিয়ায় জন্ম নেয়া বেশ কিছু সম্রাট, যাদের ধমনীতে কোনও না কোনও ভাবে বইছে সেই সংগ্রামী আইবেরিয়ানদের রক্ত। ট্রাজান (Trajan), হ্যাডরিয়ান (Hadrian), অ্যান্টোনিয়াস পিয়াস (Antoninius Pius), মার্কাস অরিলিয়াস (Marcus Aurelius) – এদের শাসনামলকে সাধারণভাবে রোমান সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ হিসেবে ধরা হয়। এরপর থেকে ঘুচে গেছে সবার পৃথক জাতিগত পরিচয়। সম্রাট সেপটিমিয়াস সেভেরাস (Septimius Severus) (১৯৩-২১১) ছিলেন লিবিয়ার পিউনিক পরিবারের সদস্য। ইলাগাবালুস (Elagabalus) (২১৮-২২) ছিলেন একজন সিরিয়ান। সম্রাট ফিলিপের (২৪৪-২৪৯) আরেক নাম ছিল ‘আরবের ফিলিপ’। সাম্রাজ্যের পরবর্তী প্রজন্মগুলো রোমান সাম্রাজ্যের সংস্কৃতিকে এতটাই গভীরভাবে গ্রহণ করেন যে, রোমান সাম্রাজ্যের পতনের হাজার বছর পরেও, তারা রোমান সাম্রাজ্যের ভাষায়ই কথা বলতে থাকলেন, বিশ্বাস অটুট রাখলেন খ্রিস্টধর্মের ঈশ্বরের প্রতি যে ধর্ম রোমান সাম্রাজ্য পেয়েছিল লেভানটাইন (Levantine) অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে এবং মানতে থাকল রোমান সাম্রাজ্যের সকল আইন-কানুন।
