কোনও কোনও সময় এই লাভ স্পষ্টভাবে দেখা যেত, যেমন- আইনের যথাযথ প্রয়োগ, নগর পরিকল্পনা, ওজন এবং পরিমাপের মাপকাঠি নির্দিষ্ট করা। আবার কখনও কখনও এই লাভ ছিল প্রশ্নবিদ্ধ, যেমন- কর প্রদান, সেনাবাহিনীতে যোগদানের বাধ্যবাধকতা এবং সম্রাটের বন্দনা করা। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যের উচ্চপদস্থরা মনে করতেন তারা সাম্রাজ্যের সকল অধিবাসীদের কল্যাণের জন্যই কাজ করছেন। চীনের শাসক শ্রেণী তাদের প্রতিবেশী দেশের প্রজাদের অসভ্য, বর্বর, দুর্ভাগা মনে করত এবং তারা বিশ্বাস করত চীনা সাম্রাজ্যের অবশ্যই উচিত এই মানুষগুলোকে নিজেদের সাম্রাজ্যের অধীনে এনে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। চীনাদের উপর স্বর্গের যে আদেশ আছে তা কেবল দুনিয়াকে জয় করার জন্যই নয়, মানুষকে মানবতার শিক্ষা দেবার জন্যেও। ‘কিছু বর্বর মানুষকে আমরা শান্তি, সুবিচার এবং শিষ্টাচার সমৃদ্ধ জীবনের সন্ধান দিচ্ছি’ – এরকম দাবি করে রোমানরাও তাদের শাসনের ন্যায্যতা প্রমাণের চেষ্টা করত। বন্য জার্মান এবং গল সম্প্রদায়ের মানুষজনকে আইন শিক্ষা দিয়ে, তাদের গণ-গোসলখানায় গোসল করিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে, তাদের দর্শনের শিক্ষা দিয়ে উন্নত করার আগ পর্যন্ত তো তারা অপরিচ্ছন্নতা এবং অজ্ঞতার অন্ধকারেই নিমজ্জিত ছিল – এমনটাই ছিল রোমানদের বিশ্বাস। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে মৌর্য সাম্রাজ্য সারা পৃথিবীর অন্ধকারাচ্ছন্ন মানুষকে গৌতম বুদ্ধের মহান শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে তোলবার প্রয়াসে ব্রতী হয়েছিল। মুসলিম খলিফারা সম্ভব হলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে, তা না হলে তরবারির শক্তিতে সারা বিশ্বে মহানবীর উপলব্ধি ও বাণী ছড়িয়ে দেবার এক স্বর্গীয় আদেশ পেয়েছিলেন। স্প্যানিশ এবং পর্তুগিজ সাম্রাজ্য ঘোষণা করেছিল, তারা ইন্দিজ পর্বতে ও আমেরিকায় ধন-সম্পদের সন্ধান করতে আসেনি, এসেছে মানুষকে সত্যিকারের বিশ্বাসের দীক্ষা দিতে, প্রকৃত ধর্মে তাদের ধর্মান্তরিত করতে। স্বাধীনতা ও মুক্ত বাজারের মত মহৎ ধারণার বিস্তার করার জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনও অস্ত যেত না। সোভিয়েতরা ধনতন্ত্র থেকে প্রলেতারিয়েত বা সাধারণ মানুষের হাতে কাল্পনিক ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ইতিহাসের নির্মম পথে যাত্রাকে তাদের অবশ্যকর্তব্য মনে করত। আজকের দিনের অনেক আমেরিকান মনে করেন ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করেই হোক আর এফ-১৬ বিমান থেকে বোমাবর্ষণ করেই হোক, তাদের সরকার বস্তুতপক্ষে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের সুফল দেয়ার মহান উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক রূপরেখা শাসক শ্রেণীর নিজেদের তৈরি ছিল না। যেহেতু সবাইকে নিয়ে এবং সবার জন্যই গড়ে উঠেছিল সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতি, তাই সাম্রাজ্যের অভিজাত সম্প্রদায় একে উগ্রভাবে একটি একক, বদ্ধ সামাজিক নিয়ম-কানুনের গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে প্রায়শই সাম্রাজ্যের অধীনস্থ জাতি-গোষ্ঠীর চিন্তা-ভাবনা, আচার-আচরণ এবং ঐতিহ্যকে সাম্রাজ্যের সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করতেন। যদিও কিছু কিছু সম্রাট সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক শুদ্ধতা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং তারা নিজেরা যাকে তাদের সংস্কৃতির শিকড় বলে জানতেন, সাম্রাজ্যেও সেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলই বজায় রাখার চেষ্টা করতেন। তবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাম্রাজ্যের সভ্যতা ছিল অধীনস্থ জাতি-গোষ্ঠীগুলির সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর মিশেল। রোম সাম্রাজ্যের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল গ্রিক আর রোমান সংস্কৃতির সমন্বয়ে; পারসিয়ান, গ্রীক আর আরবদের সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল আব্বাসিড (Abbasid) সাম্রাজ্যের সংস্কৃতি। সাম্রাজ্যবাদী মোঙ্গলদের সংস্কৃতি ছিল চৈনিক সংস্কৃতির প্রতিলিপি মাত্র। সামাজ্র্যবাদী যুক্তরাষ্ট্রে কেনিয়ান বংশোদ্ভুত একজন প্রেসিডেন্ট স্বচ্ছন্দে ব্রিটিশ চলচ্চিত্র ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ দেখতে পারেন যেখানে আরবরা তুর্কিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এমনকি চলচ্চিত্র দেখার সময় তিনি আয়েশে কুড়মুড় করে একটি ইতালিয়ান পিজায় কামড়ও বসাতে পারেন।
সাম্রাজ্যের সংস্কৃতি গড়ে ওঠার সময় অধীনস্থ জাতি-গোষ্ঠীগুলোর সাংস্কৃতিক উপাদানের এই মিশেল অন্তর্গত জাতি-গোষ্ঠীগুলিকে এই নতুন সংস্কৃতি আত্মীকরণে সহায়তা করেছে এমনটা ভাবার কারণ নেই। সাম্রাজ্যের সংস্কৃতিতে বিজিত জাতি-গোষ্ঠীদের অনেক সাংস্কৃতিক উপাদান অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে শেষমেশ সাম্রাজ্যের সংস্কৃতির যে সংকর রূপের সৃষ্টি হয়, তা বিজিত জনগোষ্ঠীর নিজেদের সংস্কৃতি থেকে ছিল অনেকটাই ভিন্ন। সুতরাং, বিজিত জাতি-গোষ্ঠীগুলোর কাছে সাম্রাজ্যের নতুন এই সংস্কৃতির আত্মীকরণ ছিল একটা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মত। একদিকে বহুদিনের অভ্যস্ত রীতি-নীতি ও আচরণগুলো ত্যাগ করা তাদের জন্য সহজ ছিল না, অন্যদিকে সংস্কৃতির নতুন উপাদানগুলোকে বোঝা, শেখা ও আত্মীকরণ করা তাদের জন্য ছিল আরও কঠিন এবং কষ্টসাধ্য। এর চেয়েও খারাপ ব্যাপার হল, বিজিত জাতি-গোষ্ঠী সাম্রাজ্যের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেলেও, সাম্রাজ্যের শাসকদের অনেক অনেক বছর লেগে যেত পরাজিত জাতি-গোষ্ঠীর মানুষজনকে নিজেদের অংশ ভাবতে। ‘তাদের’ কে ‘আমরা’ হিসেবে স্বীকার করতে। বিজিত জাতি-গোষ্ঠীগুলোর জন্য এই মধ্যবর্তী সময়টুকু ছিল ভয়াবহ। কারণ, তারা ততদিনে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় হারিয়ে ফেলেছে এবং নতুন সাম্রাজ্যে তাদের সমান অধিকার নিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগও নেই। আর এইদিকে, সাম্রাজ্যের যে নতুন সংস্কৃতিতে তারা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, সেই সংস্কৃতিতে তাদের পরিচয় বর্বর ছাড়া আর কিছু নয়।
