সাইরাসের সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাধারা জাতি বা গোষ্ঠীগত শ্রেষ্ঠত্বের অহংবোধের বিপরীতে গিয়ে সবাইকে নিয়ে এবং সবার জন্য ভাবার চেষ্টা করে। যদিও তার শাসনব্যবস্থায় প্রায়ই শাসক ও শাসিতের বর্ণগত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে সামনে আনা হয়েছে, তা সত্ত্বেও সাইরাসের শাসনব্যবস্থাকে সকল স্থানের, সকল সময়ের মানুষের যৌথ অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি একক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। এই ব্যবস্থা অনুযায়ী মানবজাতি হল একটি বৃহৎ পরিবার- এখানে পিতামাতার প্রাধান্য যেমন আছে, তেমনি আছে সন্তানের কল্যাণের জন্য পিতামাতার দায়িত্বের নির্দেশ।
এই নতুন সাম্রাজ্যবাদী আদর্শ সাইরাস এবং পারসিয়ানদের হাত ঘুরে পৌঁছায় সম্রাট অালেকজান্ডার এর কাছে, তার থেকে এ আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে হেলেনীয় রাজা, রোমান সম্রাট, মুসলিম খলিফা ও ভারতীয় রাজবংশগুলোর কাছে এবং কালক্রমে এর প্রতিফলন দেখা যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের মাঝে। সাম্রাজ্যবাদের এই পরার্থপর রূপ কেবল যে সাম্রাজ্যের অস্তিত্বের ন্যায্যতা তুলে ধরে আর সাম্রাজ্যের অধীন মানুষের সামষ্টিক বিদ্রোহের সম্ভাবনা কমায় তাই নয়, এই ধ্যান-ধারণা স্বাধীন ব্যক্তি মানুষকে সাম্রাজ্য বিস্তারের বিপরীতে প্রতিবাদ করতেও নিরুৎসাহিত করে।
মূলত মধ্য আমেরিকা, আন্দিজ পর্বত সংলগ্ন এলাকা এবং চীনে স্বাধীনভাবে পারসিয়ান সাম্রাজ্যবাদী আদর্শের অনুরূপ আরেকটি সাম্রাজ্যবাদী আদর্শের জন্ম হয়। চীনের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, স্বর্গ (Tian) পৃথিবীর সকল কিছুর প্রকৃত অধিকর্তা। সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি বা পরিবারকে নির্বাচন করেন স্বর্গ এবং স্বর্গই সেই ব্যক্তি বা পরিবারকে শাসনের অনুমতি দেন। এরপর ওই ব্যক্তি বা পরিবার স্বর্গের অধীনস্থ সবকিছুর (Tianxia) আজ্ঞাবহ হয়ে সকল প্রজার কল্যাণের উদ্দেশ্যে রাজ্য শাসন করেন। সুতরাং, এখানেও দেখা যাচ্ছে ক্ষমতার চূড়ান্ত মালিকানার ব্যাপারটি বৈশ্বিক। যদি কোনও শাসক স্বর্গের অনুমতি হারান তবে তার পক্ষে একটি শহরও শাসন করা সম্ভব নয়। যদি কোনও শাসক স্বর্গের এই অনুমোদন বজায় রাখতে চান, তাহলে তাকে অবশ্যই ন্যায়বিচার এবং শান্তি-শৃঙ্খলার আদর্শকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। স্বর্গের এই অনুমোদন একই সাথে একের বেশি প্রার্থীকে দেয়া হবে না, সুতরাং একটি নির্দিষ্ট সময়ে একের বেশি আইনসঙ্গত, সুশৃঙ্খল স্বাধীন রাষ্ট্রের অনুমোদন দেওয়াও সম্ভব নয়।
চিন শি হুয়াংদি (Qín Shǐ Huángdì), একীভূত চীনের প্রথম সম্রাট, গর্বভরে ঘোষণা করেন যে, ‘মহাবিশ্বের ছয় দিকে যা কিছু আছে তার সবকিছু চীনা সাম্রাজ্যের অধীন, … পৃথিবীর যে প্রান্তে মানুষের পায়ের একটি ছাপও পড়েছে সেখানে এমন কোন মানুষ নেই যে এই সাম্রাজ্যের অধীন নয়, … সম্রাটের মহানুভবতা এমনকি গাভী এবং ঘোড়াদের কাছেও সুবিদিত। এমন কেউ নেই যে এই শাসনের ফলে উপকৃত হয়নি। সকলেই সম্রাটের শাসনের ছায়াতলে নিরাপদে এবং শান্তিতে আছে।’৪ চীনাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের মত চীনাদের রাজনৈতিক দর্শনও সাম্রাজ্যবাদী চীনকে ঐক্য এবং ন্যায়বিচারের এক স্বর্ণযুগ মনে করে। আধুনিক পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী একটি ন্যায়পরায়ণ পৃথিবী অনেকগুলো পৃথক জাতি রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত হওয়া উচিত। প্রাচীন চৈনিক বিশ্বে এই রাজনৈতিক বিভক্তকরণ ছিল অন্ধকার যুগের বিশৃঙ্খলা এবং অবিচারের মূর্ত প্রতীক। চীনের ইতিহাসে এরকম ভাবনা-চিন্তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। চীনে যখনই একটি সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে, তাদের বিরাজমান রাজনৈতিক ভাবধারা তাদের উদ্বুদ্ধ করেছে ছোট ছোট তুচ্ছ স্বাধীন রাষ্ট্র বা সরকার বানিয়ে থিতু না হতে, তাদের উৎসাহিত করেছে পুনরায় একীভূত হতে। এবং কোন না কোনভাবে তাদের এই একীভূত হবার প্রয়াস সবসময় সফল হয়েছে।
যখন ‘তারা’ ‘আমাদের’ অন্তর্ভুক্ত হল
সাম্রাজ্য অনেকগুলো ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর পৃথক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবসান ঘটিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অনুসরণ করা অল্প কিছু সাংস্কৃতিক পরিচিতির উদ্ভবের পেছনে প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন অনেকগুলো স্বাধীন এলাকার চেয়ে একটি সাম্রাজ্যে ধ্যান-ধারণা, মানুষ, পণ্য এবং প্রযুক্তি অনেক দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। কখনও কখনও সাম্রাজ্য নিজেই ধ্যান-ধারণা, প্রতিষ্ঠান, আইন এবং রীতি-নীতি প্রসারের দায়িত্ব নিয়েছে। সাম্রাজ্যের শাসকদের জীবন আরও আয়াসসাধ্য করা এ কাজের একটা প্রধান লক্ষ্য ছিল। প্রত্যেকটি ছোট ছোট এলাকার যদি নিজেদের আইন, নিজেদের লিখন পদ্ধতি, নিজস্ব ভাষা এবং নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা থাকে তাহলে সাম্রাজ্যের শাসকদের পক্ষে সবগুলো এলাকা শাসন করা সত্যিই কঠিন। সুতরাং, বিভিন্ন এলাকার এতসব ভিন্নতাকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় আনা সাম্রাজ্যের জন্য অপরিহার্য ছিল।
সাম্রাজ্যগুলো কেন সবার জন্য একটি সাধারণ আচরণবিধি বা সংস্কৃতির বিস্তার করেছিল তার দ্বিতীয় কারণটি হতে পারে- সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের প্রয়াস। অন্তত: সাইরাস এবং চিন শি হুয়াংদির সময় থেকে, সাম্রাজ্যগুলো জনগণকে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, রাস্তা বানানো বা গণহত্যা যাই করা হোক না কেন তা সবার ভালোর জন্যই করা হচ্ছে; একটি উন্নত সংস্কৃতির বিস্তারের জন্য এসব জরুরী এবং তাতে লাভ যত না সাম্রাজ্যের শাসকদের, তার চেয়ে ঢের লাভ বিজিতদের।
