জন বলল আরেকটা ব্যাপার ভাবার আছে, কোকো তো স্ত্রিকনিনের ঐ তেতো স্বাদটা ঢাকতে পারবে না।
আমি বললাম এই কথাটা তো আমরা ডাঃ বরস্টিনের মুখেই শুনেছি। বরস্টিন হলেন পৃথিবীর সবচেয়ে নামী বিষ বিশেষজ্ঞ। আমার ধারণা কোনো উপায়ে তিনি স্ট্রিকনিনের তেতো স্বাদটা চাপা দিয়েছেন, এমনও হতে পারে বিষটা হয়ত স্ট্রিকনিন নয়, অন্য কোনো বিষ। বিষটার নাম হয়ত কেউ শোনেনি এর উপসর্গগুলো স্ট্রিকনিনেরই মত।
জন মাথা নেড়ে বলল তা হতে পারে কিন্তু উনি কোকোটা কেমন করে পেলেন, কাপটা তো নিচে ছিল না।
আমি বললাম তা ছিল না বটে–কথাটা বলার পরেই একটা সাংঘাতিক সম্ভাবনার কথা মাথায় খেলে গেল। সেটা হল ডাঃ বরস্টিনের কোনো সহকারী নিশ্চয়ই এ বাড়িতে রয়েছে। আর সেই সহকারী যে কে হতে পারেন বিদ্যুৎ চমকের মতোই তো খেলে গেল–তিনি মেরী ক্যাভেণ্ডিস ছাড়া আর কে? কিন্তু ভেবে কূল পেলাম না অমন সুন্দরী এক মহিলা কেমন করে খুনী হতে পারেন। মনটা বড় চঞ্চল হয়ে পড়ল। মেরী ক্যাভেণ্ডিসের উজ্জ্বল মুখচ্ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠল। সব কথাগুলোও একেক করে মনে পড়তে লাগল।
হঠাৎ জনের কণ্ঠস্বরে চমক ভাঙলো। সে বলল আরো একটা কথা ভাবার আছে। আমি জানতে চাইলাম, জন বলল ডাঃ বরস্টিন ময়না তদন্তের কথা বলেছিলেন। উনি ওটা না করলে ডাঃ উইলকিন্স অনায়াসেই ওটাই স্বাভাবিক মৃত্যু বলে ধরে নিতেন।
আমি বললাম কথাটা সত্যি। তবে বলা যায় না, উনি হয়ত এটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে ভেবেছিলেন ভবিষ্যতের কথা ভেবেই। এমনও তো হতে পারে স্বরাষ্ট্র দপ্তর শেষ পর্যন্ত যদি মৃতদেহ খুঁড়ে বের করতে চায়। তখন আর কিছুই গোেপন থাকত না। ডাঃ বরস্টিনও নিতান্তই বেকায়দায় পড়ে যেতেন। ওর মত লোক যে ভুল করে থাকতে পারে কেউই তা বিশ্বাস করতো না।
জন বলল যুক্তিটা খারাপ নয়, তবে ডাঃ বরস্টিনের উদ্দেশ্যটা কি হতে পারে তা তার বোধগম্য হচ্ছে না।
কথা বলতে বলতে জনের সঙ্গে পথ চলছিলাম। বাগানের দরজাটা পার হয়ে ঢুকতেই ডুমুর গাছটার দিকে নজর পড়ল। ওখানে চায়ের আসর বসেছে। অনেকেই সেখানে আছে।
সিনথিয়াও হাসপাতাল থেকে এসে গেছে। একটা চেয়ার টেনে ওর পাশে বসে বললাম পোয়ারো তার ডাক্তারখানাটা দেখতে চেয়েছে।
সিনথিয়া কথাটা শুনেই উচ্ছল হল, বলল নিশ্চয়ই সে পোয়ারোকে দেখাবে।
দুএক মুহূর্ত এবার চুপচাপ কাটালাম। সিনথিয়া হঠাৎ মেরী ক্যাভেণ্ডিসকে লক্ষ্য করে ফিসফিস করে বলল চা খাওয়ার পর সে কয়টা কথা আমাকে বলতে চায়।
হঠাৎ জন বেশ রেগেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল। চিৎকার করে বলতে লাগল গোয়েন্দারা ঘরে ঢুকে সব জিনিষপত্র ওলটপালট করে বিশ্রী কাণ্ড করে রেখেছে। একবার জ্যাপের সঙ্গে দেখা হলে সে তার মজা দেখাবে।
মিস হাওয়ার্ডও তাকে সায় দিলেন। লরেন্সও চুপ করে রইল না। শুধু মেরী ক্যাভেণ্ডিসকে দেখে মনে হলো তার এসব ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই। তিনি ভাবলেশহীনভাবে চুপচাপ বসে রইলেন।
চা খাওয়ার পর সিনথিয়াকে একটু বেরিয়ে আসার জন্য ডাকলাম। দুজনে সকলের চোখের আড়ালে চলে আসতেই সিনথিয়া টুপিটা খুলে একটা গাছের তলায় বসে পড়ল। পড়ন্ত সূর্যের আলো সিনথিয়ার মুখে ছড়িয়ে পড়ল। দারুণ সুন্দর লাগল সিনথিয়াকে, আমার মনটা হঠাৎ স্বপ্নিল হয়ে পড়ল।
সিনথিয়ার কণ্ঠস্বরে চমক ভাঙলো। সে বলল আমাকে নাকি তার খুব ভালো লাগে। সিনথিয়ার কথা শুনে মৃদু হাসলাম। সে আবার কথা বলল, বলল একটা ব্যাপার সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না, তাই আমার পরামর্শ তার প্রয়োজন।
আমি জানতে চাইলাম, কি ব্যাপার। সিনথিয়া বলতে লাগল এমিলি ঠাকুমা বলেছিলেন তার জন্য কিছু ব্যবস্থা করে যাবেন, কিন্তু তিনি হয়ত ভুলেই গেছেন, অথবা এভাবে মারা যাবেন একথা তো তিনি জানতেন না। তাই হয়ত কিছুই করে যাননি, এখন এখানে তার থাকা উচিৎ কিনা সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না। সে ভাবছে চলে যাবে।
আমি বললাম এই মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, তাছাড়া ওরাও তো তাকে ছাড়তে চাইবে না।
এক মুহূর্ত চুপ করল সিনথিয়া। হাত দিয়ে খাম ছিঁড়তে ছিঁড়তে আপন মনে বলল মিসেস ক্যাভেণ্ডিস চান যে সে এখান থেকে চলে যাক। এছাড়া আরো একজন চায়।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম সে কি জনের কথা বলছে। জন যে তাকে ভালোবাসে একথা তাকে বললাম।
সিনথিয়া বলল সে জনের কথা বলছে না, লরেন্সের কথা বলছে। তবে লরেন্স কি করল না করল তা সে তোয়াক্কা করে না। কারণ কারও কৃপার পাত্রী হতে সে চায় না।
সিনথিয়ার কথাগুলো শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি সান্ত্বনা জানিয়ে বললাম জন আর ইভিলিন যে তাকে ভালোবাসে একথাও তো তার মনে রাখা উচিৎ।
সিনথিয়া বলল একথা সে জানে। তবু মেরী আর লরেন্সের ব্যবহার সে সহ্য করতে পারে না। কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।
আমার কেমন যেন সব গোলমাল হয়ে গেল সিনথিয়ার কান্না দেখে। বড়ো একা মনে হল তাকে। ঝুঁকে পড়ে একটা হাত তুলে নিয়ে সিনথিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম সে আমার হবে কিনা।
আমার কথা শুনে সিনথিয়া ওর হাত সরিয়ে নিল, কান্না থেমে গেল ওর, বলল এসব ছেলেমানুষী এখন থাক।
খুব অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে গেলাম। তবু বললাম ছেলেমানুষী নয়, আমি সত্যি তাকে আমার স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চাই।
