সিনথিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল, বলল আমি নাকি ভারী মিষ্টি কথা বলি, সত্যি তো আমি যা বলছি তা চাই না।
আমি সিনথিয়াকে কিভাবে বিশ্বাস করাবো বুঝতে পারলাম না, তাকে আবারও কথাটা বললাম।
সিনথিয়া মিষ্টি করে হেসে আমাকে চুপ করতে বলল। একথাও বলল যে আমি যে কথাটা বলেছি সেটা নাকি আমি চাই না এবং সেও তা চায় না।
একথা বলে সে তাড়াতাড়ি গাছের আড়ালে পালিয়ে গেল, আমি বোকার মত দাঁড়িয়ে রইলাম, তারপর গ্রামের দিকে হাঁটতে লাগলাম।
আমার ইচ্ছা হল ডাঃ বরস্টিনকে একটু লক্ষ্য করি। একটা ছোটো কুঠুরির কাছে পৌঁছে দরজায় টোকা দিলাম, এই বাড়িতেই ডাঃ বরস্টিনের আস্তানা।
এক বুড়ি দরজা খুলল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ডাঃ বরস্টিন বাড়িতে আছেন কিনা। বুড়ি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল আমি কি কিছু শুনিনি। আমি বললাম কি শুনব। বুড়ি জানাল পুলিশ ডঃ বরস্টিনকে ধরে নিয়ে গেছে।
আমি কথাটা শুনে চমকে উঠলাম। বরস্টিনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে…।
বুড়ির কথা শোনার আর কোনো আগ্রহ আমার ছিল না। যা শুনেছি তাই যথেষ্ট। এখনই পোয়ারোকে তা জানানো দরকার। কোনোদিকে না তাকিয়ে গ্রামের রাস্তা ধরে ছুটলাম।
১০. পোয়ারোর আস্তানা
পোয়ারোর আস্তানায় পৌঁছতে বেশি সময় লাগল না আমার। কিন্তু পোয়ারোকে বাড়িতে না পেয়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর দিতে এলাম অথচ সে নেই।
পোয়ারোর এক প্রতিবেশী বেলজিয়ানের কাছে শুনলাম যে সে সম্ভবতঃ লণ্ডনে গেছে, কথাটা শুনে আমি রীতিমত বিস্মিত হলাম। লণ্ডনে আবার ওর কি কাজ পড়ল। চিন্তা করে কোনো হদিশ পেলাম না।
বিরক্ত হয়ে অগত্যা স্টাইলসের দিকেই হাঁটতে লাগলাম। পোয়ারোকে না পেয়ে মাথাটা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে মনে হল। বরস্টিনের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে পোয়ারোর কতটুকু জানা আছে কে জানে–তবে এটা যে ওরই চেষ্টায় সম্ভবপর হল এটা তো জানা কথা। ব্যাপারটাকে সবাইকে জানান উচিৎ হবে কিনা বুঝতে পারছি না, সত্যিই বড় সমস্যায় পড়ে গেলাম।
অনেক ভেবে ঠিক করলাম জনকেই বরস্টিনের গ্রেপ্তার হওয়ার খবরটা জানাব। তারপর ও যা ভালো মনে করবে তাই হবে। জন কথাটা শুনে খুব অবাক হয়ে গেল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম এখন কি করা উচিৎ। অবশ্য কাল সকলে জেনে যাবে।
একটু চিন্তা করে জন বলল এখন কাউকে কিছু না জানানোই ভালো, সকলে যখন জানার তখনই জানবে।
পরদিন সকালে খবরের কাগজে দেখে খুবই অবাক হলাম। পাতা উল্টে কোথাও গ্রেপ্তারের খবর দেখলাম না, শুধু এক কোণে ছোট করে স্টাইলসের বিষ প্রয়োগের ঘটনার বিবরণ রয়েছে মাত্র। মনে হল এটা হয়ত ইনসপেক্টর জ্যাপেরই কাজ। বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যেই হয়ত পুলিশ খবরটা চেপে গেছে। মনটা অবশ্য খুব খুঁতখুত করতে লাগল।
প্রাতঃরাশের পর ভাবলাম আরেকবার পোয়ারোর খোঁজ করতে যাব, দেখতে হবে পোয়ারো লণ্ডন থেকে ফিরল কিনা। হঠাৎ জানলার দিক থেকে অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে তাকিয়ে দেখি পোয়ারো। ছুটে গিয়ে হাত ধরে ওকে ঘরে নিয়ে এলাম। তাকে দেখে যে কি খুশী হয়েছি তা আর চেপে রাখতে পারলাম না। ওকে বললাম যে জনকে ছাড়া কথাটা আমি আর কাউকে জানাইনি।
পোয়ারো অবাক হয়ে কি কথা জানতে চাইল। আমি অধৈৰ্য্য হয়ে বললাম ডাঃ বরস্টিনের গ্রেপ্তারের কথা। পোয়ারো জিজ্ঞাসা করল ডাঃ বরস্টিন গ্রেপ্তার হয়েছেন? আমি বললাম মিসেস ইঙ্গলথর্পের খুনের অপরাধেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে।
পোয়ারো বাধা দিয়ে বলল একথা তোমাকে কে বলেছে? আমি আমতা আমতা করে বললাম যে এটা আমার ধারণা। পোয়ারো বলল ডাঃ বরস্টিন গ্রেপ্তার হয়েছেন গুপ্তচর বৃত্তির জন্য।
কথাটা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। নিজেকে সামলে নিতে কিছুটা সময় লাগল। শেষ পর্যন্ত বললাম, ডাঃ বরস্টিন তাহলে একজন গুপ্তচর।
পোয়ারো মাথা নেড়ে সায় দিল। সে প্রশ্ন করল আমার কি কখনও কোনো সন্দেহ হয়নি যে ডাঃ বরস্টিনের মত একজন নামী ডাক্তার এই অখ্যাত গ্রামে কেন বসে আছেন?
আমি স্বীকার করতে বাধ্য হলাম যে এরকম কোনো চিন্তাই আমার আসেনি।
পোয়ারো বলতে লাগল বরস্টিন জন্মসূত্রে একজন জার্মান। এ দেশে অনেকদিন ধরে উনি আছেন, সকলে তাই ওকে ইংরেজ বলেই জানে। বছর পনের আগে এখানকার নাগরিকত্বও উনি পেয়েছেন, কিন্তু লোকটা খুব চালাক এবং একজন ইহুদীও বটে।
আমি বলে উঠলাম, লোকটা একটা আস্ত শয়তান।
পোয়ারো আমাকে বাধা দিয়ে বলল আমি ভুল বলছি, আসলে লোকটা দেশপ্রেমিক, ওর পরিণতিটা ভেবে দেখলেই তা বোঝা যাবে।
পোয়ারোর এইসব দার্শনিক চিন্তাভাবনা আমার একটুও ভালো লাগল না। তাই এই কথাটার কোনো উত্তর না দিয়ে প্রসঙ্গান্তরে গেলাম, বললাম এরকম একটা লোকের সঙ্গে মেরী ক্যাভেণ্ডিস দিনের পর দিন এমন কোনো জায়গা নেই ঘোরেননি, এই কথাটা শুনে পোয়ারো বলল বরস্টিন মেরী ক্যাভেণ্ডিসকে বেশ ভালো করেই কাজে লাগিয়েছেন, ওদের নিয়ে যত কুৎসা রটেছে ততই বরস্টিনের আসল দোষ চাপা পড়ে গেছে।
পোয়ারোর কথাটা শুনে আমার আগ্রহ বাঁধ মানল না। জিজ্ঞাসা করলাম ডঃ বরস্টিন তাহলে মেরী ক্যাভেণ্ডিসের প্রতি অনুরক্ত নন। পোয়ারো বলল তা সে জানে না, তবে তার ধারণা ডঃ বরস্টিনের জন্য মেরী ক্যাভেণ্ডিসের কোনো মাথাব্যথা নেই। কথাটা শুনে মনের খুশী আর গোপন রাখা গেল না। পোয়ারো বলল সে নিশ্চিত যে তার ধারণাটাই ঠিক কারণ মেরী ক্যাভেণ্ডিসের নজর আরেকজনের দিকে।
