মেরী ক্যাভেণ্ডিসের আগুন ঝরা কথায় জনের মুখ লাল হয়ে উঠল। সে তীব্র কণ্ঠে মেরী বলে চিৎকার করে উঠল; জানতে চাইল এটাই মেরীর শেষ কথা কিনা। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে মেরী ডাঃ বরস্টিনের সঙ্গে মেলামেশা করবে কিনা।
মেরী বলল তার ইচ্ছা হলেই সে মিশবে। জন জিজ্ঞাসা করল তার অপছন্দ জেনেও মেরী এই কাজ করবে। মেরী উত্তরে বলল তার ইচ্ছাতে বাধা দেবার কোনো অধিকার জনের নেই। সে জানতে চাইল জনের কি এমন কোনো বন্ধু নেই যাকে মেরী অপছন্দ করে।
এই কথাটা শুনে জন বোধ হয় একটু ধাক্কা খেল। একটা দুশ্চিন্তার ছায়া খেলে গেল ওর মুখে। ধীরে ধীরে প্রশ্ন করলত মেরী কি বলতে চাইছো। শান্ত কণ্ঠে মেরী বলল সে শুধু বলতে চাইছে তার বন্ধুদের নিয়ে যাতে জন আর মাথা না ঘামায়।
জনের চোখেমুখে মিনতি ঝরে পড়ল এবার। সে জানতে চাইল সত্যি কি মেরীর ওপর তার আর কোনো অধিকার নেই। হাত বাড়িয়ে জন মেরীর হাত ধরে ফেলল।
আমার মনে হল মেরী হয়ত একটু নরম হয়ে পড়লেন। কিন্তু মুহূর্তেই সেই ভুলটা ভেঙে গেল যখন মেরী নিজের হাত ছিনিয়ে নিয়ে বলে উঠলেন, সত্যি তার ওপর জনের কোনো অধিকার নেই।
মেরী হনহন করে এগিয়ে যেতেই জন আবার পথরোধ করে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল যাওয়ার আগে মেরী যেন সত্যি কথাটা বলে যায় যে সে সত্যি বরস্টিনকে ভালোবাসে কিনা।
ঘুরে দাঁড়িয়ে ঋজু ভঙ্গীতে মেরী উত্তরে বললেন হয়ত তাই। তারপর দৃঢ় পায়ে একটা গাছের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
জনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একদম পাথর হয়ে গেছে সে। আমি খুব অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে গেলাম। স্বামী স্ত্রীর গোপন কথোপকথন আমাকে শুনতে হল অনিচ্ছাসত্ত্বেও। কি করি ভাবতে ভাবতে শুকনো পাতাগুলোর ওপর দিয়ে জনের দিকে এগোতে লাগলাম। আমার পায়ের শব্দে ঘুরে দাঁড়াল জন। আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল আমি পোয়ারোকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এসেছি কিনা। জন জানতে চাইল পোয়ারো কি সত্যি কিছু করতে পারবেন।
মনে মনে খুশী হলাম। জন ভেবেছে আমি এইমাত্র এসেছি। যাই হোক আমি তার প্রশ্নের উত্তরে বললাম একসময় পোয়ারোর চেয়ে বড় গোয়েন্দা আর কেউ ছিল না। বয়স হলেও ওর প্রতি শ্রদ্ধা আমার এতটুকু কমেনি।
জন বলল তাহলে তো ভালোই। কিন্তু তার একদম ভালো লাগছে না, মনে হচ্ছে পৃথিবীটাই একদম বিশ্রী। কিছু না জানার ভান করে জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে?
জন বলতে লাগল প্রথমেই তো এরকম একটা ভয়ানক কাণ্ড ঘটল, স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের লোকেরা জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে, তার ওপর খবরের কাগজগুলোর অত্যাচার তো আছেই। সবচেয়ে মারাত্মক কাণ্ড ঘটেছে সকালবেলা, দরজার সামনে এক দঙ্গল লোক জমা হয়েছিল, হয়ত তারা বিনা পয়সায় মজা দেখার জন্য এসেছিল।
আমি জনকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম যেন সে মুষড়ে না পড়ে, সব ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে।
জন বলল, কিছুই ঠিক হবার নয়। এবার তো ঘটনা আরও মারাত্মক দিকে মোড় ঘুরল। সে বলতে লাগল ইঙ্গলথর্প ছাড়া পেয়ে গেছে যখন তখন অপরাধী নিশ্চয় আমাদের মধ্যে কেউ।
জনের কথাটা শুনে সত্যিই চমকে উঠলাম। আমাদের মধ্যে হত্যাকারী লুকিয়ে আছে কথাটা ভাবতেই কেমন লাগল। হঠাৎ একটা কথা মাথার মধ্যে চকিতে জেগে উঠল; এই সম্ভাবনাটার কথা তো আমার একেবারেই মনে হয়নি। নিজেকে মূক বলে মনে হল। এবার মনটা অনেকটা হাল্কা হয়ে গেল।
জনকে বললাম আমাদের মধ্যে কেউ এই কাজ করতে পারে না। জন বলল তাহলে আর কে করবে? আমি বললাম সে কি সত্যিই বুঝতে পারছে না। জন মাথা নাড়ল। আমি চারদিক দেখে নিয়ে ফিসফিস করে জনকে ডাঃ বরস্টিনের নাম বললাম।
জন বলে উঠল অসম্ভব। আমি অসম্ভব কেন জিজ্ঞাসা করলাম। জন উল্টে প্রশ্ন করল তার মার মৃত্যুতে ডাঃ বরস্টিনের কি লাভ হবে?
আমি বললাম সেটা বলা কঠিন। তবে পোয়ারোও যে এই সন্দেহটাই করছে সেটা জনকে জানালাম।
জন জিজ্ঞাসা করল পোয়ারো আমাকে একথা বলেছে কিনা। আমি জনকে সেদিনের কথা বললাম–ডাঃ বরস্টিন সেই রাতে স্টাইলসে ছিলেন শুনে পোয়ারো কেমন উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। এমনকি পোয়ারো বেশ কয়েকবার বলেছিল সব কিছু বদলে গেল।
আমি জনকে মনে করাতে লাগলাম যে ইঙ্গলথর্প বলেছিলেন কফির কাপটা উনি হলঘরে রেখেছিলেন আর ঠিক সেই সময়েই ডাঃ বরস্টিন এসেছিলেন। আমি প্রশ্ন করলাম হলঘরের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় কাপে কিছু মিশিয়ে দেওয়া কি ওর পক্ষে অসম্ভব।
জন বলল ব্যাপারটা দারুণ ঝুঁকির ছিল। আমি বললাম অসম্ভব তো ছিল না।
জন জিজ্ঞাসা করল ওটা যে তার মার কফির কাপ ছিল সেটা ডাঃ বরস্টিন জানবেন কি করে? এই যুক্তিটা সে মানতে চাইল না।
আমি বললাম কথাটা ঠিক। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যাওয়ায় বললাম ওভাবে ঘটনাটা ঘটেনি। জনকে এবার বললাম পোয়ারো আবার কোকোর কিছু অংশ রাসায়নিক বিশ্লেষণের জন্য দিয়ে এসেছে।
জন অবাক হয়ে বলল সেটা তো ডাঃ বরস্টিন পরীক্ষা করেছেন। আমি বললাম যদি বরস্টিনই হত্যা করে থাকে তাহলে আসল কোকোর পরিবর্তে অন্য কোকোর কিছু অংশ পরীক্ষা করা ওর পক্ষে কত সহজ। ওতে তাহলে আর স্ট্রিকনিন পাওয়া যাবে না। কেউ বরস্টিনকে সন্দেহ করতে পারবে না বা আবার কোকোটা পরীক্ষা করার কথাও ভাববে না। একমাত্র পোয়ারো ছাড়া।
