এরপর পোয়ারো আর কোনো কথা বলল না, একেবারে চুপ করে গেল।
পরদিন মিসেস ইঙ্গলথর্পের অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া অনুষ্ঠিত হল। তার পর দিন সোমবার–বেশ দেরি করেই সকালে চায়ের আসরে হাজির হলাম। খাওয়ার সাথে সাথেই জন আমাকে আড়ালে টেনে বলল মিঃ ইঙ্গলথর্প সেদিন সকালেই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। জন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল এবার তারা সত্যিই হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে। জন আরও জানাল যে মিসেস ইঙ্গলথর্প অর্থাৎ তার মা বাড়িটা মিঃ ইঙ্গলথর্পপকে দিয়ে যাননি।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম যে এই বাড়িটা রাখতে তার কোনো অসুবিধা হবে কিনা। জন বলল সেরকম কোনো অসুবিধা হবে না, তবে মৃত্যু কর দিতে হবে। তাহলেও তার বাবার রেখে যাওয়া টাকার অর্ধেকটাই তাদেরই থাকছে। লরেন্সও আপাতত তার কাছেই থাকবে, কারণ তারও একটা অংশ আছে।
ইঙ্গলথর্প বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে শুনে সকলকেই বেশ খুশী বলে মনে হতে লাগল। দুর্ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার ফলে বাড়ির আবহাওয়াটা খুব ভারী হয়ে পড়েছিল। সম্ভবতঃ সেদিনই সকলে বেশ ফুর্তির সঙ্গে প্রাতঃরাশ সারলো। শুধুমাত্র লরেন্সকেই অদ্ভুত গম্ভীর আর চিন্তিত মনে হতে লাগল।
সংবাদপত্রগুলোও এই দুর্ঘটনার বিবরণ ছেপে দিয়ে বেশ মেতে উঠেছিল। বাড়ির প্রায় সকল সদস্যের কথাই কাগজের পাতায় মুখরোচকভাবে পরিবেশন করা হচ্ছিল। পুলিশও কিছু সূত্র পেয়েছে বলে লেখা হচ্ছিল। আসলে যুদ্ধের হুজুগে ভাটা পড়ায় এই ঘটনাটা বেশ আলোচনার খোরাক হয়ে উঠেছিল। সংবাদদাতারা তো সময়ে অসময়ে স্টাইলসের লোকজনকে বিরক্ত করে ছেড়েছে। সুযোগ পেলেই বাড়ির সকলের ছবি তুলতে শুরু করল। এছাড়া স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দারাও আসা যাওয়া করছে বারবার, প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছে–সব মিলিয়ে প্রাণান্তকর এক অবস্থা।
সেদিন প্রাতঃরাশের পর একটা বিচিত্র ঘটনা ঘটল। ডরকাস হঠাৎ আমার কাছে এসে বলল তার কিছু কথা বলার আছে। আমি জানতে চাইলাম, ব্যাপারটা কি? সে জিজ্ঞাসা করল পোয়ারোর সাথে আমার আর দেখা হবে কিনা। আমি মাথা নেড়ে সায় দিতেই ও আবার বলল, পোয়ারো জানতে চেয়েছিল মিসেস ইঙ্গলথর্পের কোনো সবুজ রঙের পোশাক আছে কিনা।
আমি বেশ আগ্রহান্বিত হয়ে জানতে চাইলাম সে পোশাকটা খুঁজে পেয়েছে কিনা। ডরকাস জানাল সে খুঁজে পায়নি, তবে চিলেকোঠার ঘরে একটা মস্ত বড় সিন্দুক রাখা আছে যাতে অনেক রকম পোশাক আছে। সবাই সিন্দুকটাকে পোশাকের বাক্স বলে। তাই তার ধারণা ঐ সিন্দুকে একটা সবুজ রঙের পোশাক থাকতেও পারে। এই কথাটা আমি যাতে পোয়ারোকে বলি সেজন্য ডরকাস আমাকে অনুরোধ করল। আমি তাকে বলব বলে আশ্বস্ত করলাম।
ডরকাসের দেওয়া খবরটা পোয়ারোকে এখনই জানানো দরকার মনে করে ওর খোঁজে বের হলাম। বেশি দূর যেতে হল না, রাস্তার মাঝেই পোয়ারোর সঙ্গে দেখা হল। খবরটা তাকে বলতেই সে সিন্দুকটা দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল।
আবার আমরা দুজনে বাড়িতে ঢুকলাম। হলঘরে কাউকে দেখতে পেলাম না। সোজা আমরা চিলেকোঠার ঘরে উপস্থিত হলাম। বড়ো একটা সিন্দুক দেখতে পেলাম, খুব সুন্দর পেতলের কাজ করা সিন্দুকটা। ভেতরে বিভিন্ন ধরনের বিচিত্র পোশাক বোঝাই রয়েছে। পোয়ারো পোশাকগুলো এক এক করে বাইরে স্তূপীকৃত করতে লাগল। দুএকটা হাল্কা সবুজ রঙের পোশাক পেলেও পোয়ারো সন্তুষ্ট হল না।
হঠাৎ পোয়ারো সিন্দুকের মধ্যে আঙ্গুল তুলে আমাকে দেখতে বলল। দেখলাম প্রায় খালি সিন্দুকটার একেবারে তলায় একগোছা কালো কুচকুচে দাড়ি পড়ে আছে। পোয়ারো দাড়িটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখে বলল সেটা একেবারে নতুন বলে মনে হচ্ছে। কিছুক্ষণ দেখার পর সব কিছু আবার ঠিকমত রেখে দিল।
তারপর উঠে দাঁড়িয়ে কোনো কথা না বলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। আমিও পেছনে পেছনে নামলাম। পোয়ারো সোজা ভাড়ার ঘরে ঢুকলো। সেখানে ডরকাস কিছু রুপোর বাসনপত্র একমনে মুছে ঝকঝকে করে রাখছিল।
ডরকাস তাকাতেই পোয়ারো বলল তার দেওয়া খবর পেয়েই সে সিন্দুকটা দেখে এল, সেখানে সত্যিই অনেক সুন্দর পোশাক রয়েছে। পোয়ারো জিজ্ঞাসা করল ঐ পোশাকগুলো সকলে ঘন ঘন ব্যবহার করে কিনা।
ডরকাস জানাল আজকাল আর তেমন ব্যবহার হয় না। শুধু মাঝে মাঝে যখন সকলে পোশাক বিচিত্রা অনুষ্ঠান করেন তখন ব্যবহার হয়। ডরকাস বলল তখন বেশ মজা হয়–একবার মিঃ লরেন্স পারস্যের শাহ সেজেছিলেন, খুব মজা করে ছুরি হাতে লরেন্স নাকি ডরকাসকে বলেছিল তাকে না রাগাতে, রাগলেই সে এক কোপে মাথা দু-ফাঁক করে দেবে। ডরকাস আরও জানাল যে মিস সিনথিয়া এক খুনে গুণ্ডা সর্দার সেজেছিলেন, অত সুন্দরী মেয়েটাকে যে কী ভয়ানক দেখাচ্ছিল তা সে বলে বোঝাতে পারবে না।
পোয়ারো বলল তাহলে ঐ সন্ধ্যাগুলো তাদের বেশ ভালোই কাটত। সে জিজ্ঞাসা করল, মিঃ লরেন্স সিন্দুকে রাখা কালো দাড়িটা লাগিয়েছিল কিনা।
ডরকাস হেসে মাথা নেড়ে জানাল মিঃ লরেন্স তার কাছ থেকে খানিকটা কালো উল নিয়েছিলো দাড়ি বানাবার জন্য।
পোয়ারো ঘর থেকে বেরিয়ে আপন মনেই বলল তাহলে ঐ দাঁড়ির ব্যাপারটা ডরকাস জানে না।
আমি জানতে চাইলাম পোয়ারো কি এটাকে সেই দাড়িটা বলে ভাবছে। পোয়ারো মাথা নেড়ে সায় দিল এবং আমাকে জিজ্ঞাসা করল ওটা যে বেশ ছুঁচলো করে ছাঁটা হয়েছে সেটা আমি লক্ষ্য করেছি কিনা। আমি বললাম আমি তো সে রকম কিছু লক্ষ্য করিনি। পোয়ারো বলল কেউ ওটা মিঃ ইসলথর্পের দাড়ির মত করে হেঁটেছে, ওতে দু-এক গাছা চুলও লেগে রয়েছে।
