প্রায় মিনিট কুড়ি পরে পোয়ারোর দেখা পেলাম। সে জানতে চাইল আমার নজরে কিছু পড়েছে কিনা। আমি জানালাম না। পোয়ারো এবার বলল আমি নিশ্চয়ই কোনো ভারী কিছু পড়ার শব্দ শুনেছি, আমি জানালাম কোনো আওয়াজ শুনিনি। পোয়ারো হতভম্ব হয়ে গেল, বলল সেটা কি করে সম্ভব হতে পারে। হাত দিয়ে সামান্য ধাক্কা দিয়ে সে একটা টেবিল ফেলে দিয়েছে।
পোয়ারোকে দেখে বুঝতে অসুবিধা হল না যে সে কোনো পরীক্ষা করতে চেয়েছিল, সফল না হাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছে। আমি তাকে বেশি উত্তেজিত হতে বারণ করলাম।
হঠাৎ জানলার বাইরের দিকে তাকাতেই ডঃ বরস্টিনকে দেখতে পেলাম। আমি পোয়ারোর দৃষ্টি আকর্ষণ করালাম সেদিকে। পোয়ারো বিড়বিড় করে বলল নোকটা বড় বেশি চালাক। আমি বললাম বরস্টিনকে আমার রীতিমত শয়তান বলে মনে হয়। পোয়ারোকে আমি মঙ্গলবার রাতের সেই দৃশ্যটার কথা বললাম, সারা শরীরে কাদা মাখা অবস্থায় বরস্টিনকে কেমন লাগছিল তার বর্ণনা দিলাম। একথাও বললাম যে বরস্টিন ঐ কাদামাখা পোশাকে ঘরের ভেতরে আসতে চাইছিলেন না, ইঙ্গলথর্প তাকে জোর করায় তিনি ভেতরে আসেন। তখন আমাদের রাতের খাওয়াদাওয়া হয়ে গিয়েছিল।
পোয়ারো কথাগুলো শুনে আমার ওপর আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার কাধ ধরে ঝাঁকুনি দিল।
আমি তার এই হাবভাবে চমকে গেলাম। পোয়ারো জিজ্ঞাসা করল আমি কেন তাকে একথা আগে বলিনি। আমি বললাম এই সামান্য ব্যাপারটা যে তাকে জানানো উচিত সেটা আমার একটুও মনে হয়নি। আমি ভেবেছিলাম ব্যাপারটা খুব একটা দরকারী নয়।
পোয়ারো বলল ব্যাপারটা সত্যিই খুব দরকারী। সে বলতে লাগল ডাঃ বরস্টিন তাহলে খুনের ঘটনার রাতে এই বাড়িতেই ছিল এই তথ্যটা জানার জন্য তার সব ধারণা বদলে গেল।
কোনোদিন পোয়ারোকে এত উত্তেজিত হতে দেখিনি। সে বলল আর দেরি করা উচিৎ নয়। জনকে তার এই মুহূর্তে দরকার।
জনকে ধূমপানের ঘরে পাওয়া গেল। পোয়ারো সোজা ঘরে ঢুকে জনকে বলল একটা বিশেষ প্রয়োজনে তাকে একবার ট্যাডমিনস্টারে যেতে হবে। সেজন্য একটা গাড়ি তার দরকার।
জন সঙ্গে সঙ্গে ঘন্টা বাজিয়ে লোক ডেকে গাড়ির ব্যবস্থা করে দিলে আমরা তৎক্ষণাৎ ট্যাডমিনস্টারের দিকে রওনা হলাম।
আমি ব্যাপারটা কি জানতে চাইলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর পোয়ারো আমাকে মাথা খাটাতে বলল। তারপর আবার নিজেই বলতে শুরু করল যে মিঃ ইঙ্গলথর্প ছাড়া পাওয়ার পর সমস্ত চিন্তাধারণাটাই বদলে গেছে। এখন জানতে হবে মিঃ ইঙ্গলথর্পের ছদ্মবেশে কে দোকান থেকে স্ট্রিকনিন কিনেছিল। মিসেস ক্যাভেণ্ডিস ছাড়া সকলকেই এই ব্যাপারে সন্দেহ করা যেতে পারে। মিসেস ক্যাভেণ্ডিস ঐ সময়ে আমার সঙ্গে টেনিস খেলছিলেন।
আরোও একটা জিনিষ জানতে হবে, সেটা হল মিঃ ইঙ্গলথর্প কফির কাপটা জলঘরে রেখে গেছিলেন ঐ কাপটা শেষ পর্যন্ত কে মিসেস ইঙ্গলথর্পের ঘরে পৌঁছে দেয়। এছাড়া কাপটা যতক্ষণ হলঘরে টেবিলে ছিল কে কে ঐ ঘরে এসেছিল। পোয়ারো জানাল আমার কাছে সব কথা শুনে সে নিশ্চিত যে মিসেস ক্যাভেণ্ডিস এবং সিনথিয়া কফির কাছে মোটেই যাননি।
পোয়ারো এবার আত্মগতভাবে বলে যেতে লাগল একটা ব্যাপার তার কাছে খুবই চিন্তার বলে মনে হচ্ছে–অ্যালফ্রেড ইঙ্গলথর্পপকে যে আর সন্দেহের তালিকায় রাখা হচ্ছে না সেটা হত্যাকারী বুঝতে পারলে সাবধান হয়ে যাবে। পোয়ারো হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল আমার কাউকে সন্দেহ হচ্ছে কিনা।
আমি একটু ইতস্ততঃ করতে লাগলাম, বুঝে উঠতে পারলাম না কি উত্তর দেব। তবুও আমি অভয় হয়ে বললাম আমার মনে হচ্ছে মিস হাওয়ার্ড অনেক কিছু গোপন করেছেন। মিস ওয়ার্ড যেহেতু ঘটনার দিন অকুস্থল থেকে অনেক দূরে ছিলেন সেজন্য তাকে আমরা সন্দেহের তালিকায় ফেলছি না। কিন্তু উনি স্টাইলস্ থেকে মাত্র পনেরো মাইল দূরে ছিলেন, ঐ পথ গাড়িতে মাত্র আধ ঘণ্টাতেই যাওয়া যায়, সেই রাত্রে মিস হাওয়ার্ড যে স্টাইলসে ছিলেন না সেকথা কেই বা বলতে পারে।
পোয়ারো মৃদু হেসে বলল সে বলতে পারে যে মিস হাওয়ার্ড সেই রাতে স্টাইলসে ছিলেন না, কারণ মিস হাওয়ার্ড যে হাসপাতালে কাজ করে পোয়ারো সেখানে ফোন করেছিল। আমি শুনে অবাক হলাম। পোয়ারো জানাল ফোন করে সে জানতে পেরেছে। মঙ্গলবার বিকালে মিস হাওয়ার্ড কাজে ব্যস্ত ছিলেন, কয়েকজন রোগী আসায় তিনি রাতে থাকতে চেয়েছিলেন এবং রাত্রেও কাজ করেছিলেন। সুতরাং তার সম্বন্ধে আর সন্দেহের অবকাশ রইল না।
এবার পোয়ারো আমার ওপর একটা কাজের ভার দিল, বলল, লরেন্স ক্যাভেণ্ডিসের সঙ্গে দেখা হলে আমি যেন তাকে বাড়তি কফির কাপটা খুঁজে বের করতে বলি এবং এও বলি যে তাহলে আর কোনো চিন্তা থাকবে না।
দারুণ অবাক হয়েই পোয়ারোর কথার পুনরাবৃত্তি করলাম। পোয়ারো বলল আমি যাতে ঠিক এইভাবেই কথাটা লরেন্সকে বলি। আমি কথাটার অর্থ জানতে চাইলাম। পোয়ারো আমাকে চিন্তা করে দেখতে বলল।
কথাটা বলতে বলতে আমরা ট্যাডমিনস্টারে পৌঁছে গেলাম। পোয়ারো একটা রাসায়নিক পরীক্ষাগারের সামনে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। পোয়ারো ফিরে আসতেই আমি জানতে চাইলাম ওখানে তার কি দরকার ছিল।
পোয়ারো জানাল শোবার ঘর থেকে যে কোকোটা পাওয়া গেছিল সেটা সে রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য দিতে গেছিল। আমি খুব অবাক হয়ে বললাম ঐ কোকো তো ডঃ বরস্টিন পরীক্ষা করেছেন। পোয়ারো বলল ব্যাপারটা সে জানে, তবুও আরেকবার পরীক্ষা করলে তো কোনো ক্ষতি নেই।
