অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই বসবার ঘরে এসে দাঁড়ালেন। ইনসপেক্টর জ্যাপ দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। পোয়ারো সবাইকে চেয়ার এগিয়ে দিল। সকলে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। আমার মনে হল এই প্রথম আমরা কঠিন বাস্তবের সম্মুখীন হয়েছি।
সরকারী গোয়েন্দার পরিবর্তে পোয়ারো কথা শুরু করায় সকলে মনে হল একটু আশ্চর্য হয়ে গেলেন।
বেশ নাটকীয় ঢঙে বক্তৃতা দেবার কায়দায় পোয়ারো বলতে শুরু করল যে একটা বিশেষ কারণে বাড়ির সকলকে এখানে জমায়েত হতে বলা হয়েছে, সেই কারণটা মিঃ অ্যালফ্রেড ইঙ্গলথর্পের সঙ্গে জড়িত।
ঘরের একপাশে ইঙ্গলথর্প বসেছিলেন। অন্যান্যরা হয়ত অজান্তেই তার চেয়ে একটু দূরে বসেছিলেন। পোয়ারো ইঙ্গলথর্পের নাম উচ্চারণ করার সাথে সাথেই মনে হল উনি যেন একটু চমকে উঠলেন।
পোয়ারো মিঃ ইঙ্গলথর্পপকে উদ্দেশ করে বলল এই বাড়ির ওপর একটা কালো ছায়া নেমে এসেছে। ইঙ্গলথর্প মাথা নাড়লেন, পোয়ারো বলতে লাগলেন যে ইঙ্গলথর্প মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন।
পোয়ারো প্রশ্ন করল ইঙ্গলথর্প ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন কিনা। ইঙ্গলথর্প জানতে চাইলেন পোয়ারো কি বলতে চাইছে।
পোয়ারো বলল সে বলতে চাইছে ইঙ্গলথর্প তার স্ত্রীকে বিষ খাইয়েছেন। পোয়ারোর দৃঢ় কণ্ঠের এই উক্তি শুনে ইঙ্গলথর্প চিৎকার করে উঠলেন, বললেন তিনি এই মিথ্যা অপবাদ সহ্য করতে পারছেন না, তিনি বলতে লাগলেন কেন তিনি শুধু শুধু এমিলিকে বিষ খাওয়াতে যাবেন।
পোয়ারো বলল ইঙ্গলথর্প যদি নিজের ভালো চান তাহলে তিনি যাতে বলেন গত সোমবার সন্ধ্যা ছটার সময় কোথায় ছিলেন।
পোয়ারোর প্রশ্ন শুনে ইঙ্গলথর্প দুহাতে মুখ ঢাকলেন, তার মুখ দিয়ে একটা অস্পষ্ট অব্যক্ত যন্ত্রণা ফুটে বেরোলো।
পোয়ারো ইঙ্গলথর্পের সামনে এসে দাঁড়িয়ে তীব্র কণ্ঠে প্রশ্ন করল।
ইঙ্গলথর্প পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
পোয়ারো বলল তাহলে মিঃ ইসলথর্প বলবেন না। ইঙ্গলথর্প বললেন যে তিনি ভাবতে পারছেন না কোনো মানুষ এভাবে অপবাদ দিতে পারে।
পোয়ারো বলল যে তাহলে সেই ইঙ্গলথর্পের হয়ে যা বলার বলবে। ইঙ্গলথর্প চমকে উঠল, প্রশ্ন করল, পোয়ারো এই ব্যাপারে কি জানেন।
পোয়ারো আমাদের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন, সে নিশ্চিতভাবে বলছে যে, গত সোমবার সন্ধ্যা ছটার সময় ওষুধের দোকানে যিনি স্ট্রিকনিন কিনতে ঢুকেছিলেন, তিনি অ্যালফ্রেড ইঙ্গলথর্প নন, কারণ সেদিন ঐ সময়ে মিঃ ইঙ্গলথর্প মিসেস রেইকস্ নামে এক মহিলাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিতে গেছিলেন। এই ব্যাপারে অন্তত পাঁচজন সাক্ষী সে হাজির করতে পারে বলে দাবী করল।
এবার পোয়ারো বলল যে সকলেই নিশ্চয়ই জানেন মিসেস রেইকসের বাড়ি অ্যাবী খামারে যা গ্রাম থেকে প্রায় আড়াই মাইল দূরে।
এই কথাটাই আসলে মিঃ ইঙ্গলথর্প বলতে চাইছিলেন না, আর এর ফলস্বরূপ সবাই ধরে নিয়েছিল ইঙ্গলথর্প মিথ্যা কথা বলছেন যে তিনি স্ট্রিকনিন কিনতে দোকানে যাননি।
০৮. সারা ঘরে মুহূর্তে স্তব্ধতা
সারা ঘরে মুহূর্তে স্তব্ধতা নেমে এল। ইনসপেক্টর জ্যাপের কণ্ঠস্বরে সকলের চমক ভাঙলো। পোয়ারোকে জ্যাপ ধন্যবাদ জানিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন সব সাক্ষীরা বিশ্বাসযোগ্য কিনা।
পোয়ারো জানাল সাক্ষীদের নাম ঠিকানা সে লিখে রেখেছে। জ্যাপ জানালেন তিনি পোয়ারোর কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ মিঃ ইঙ্গলথর্পপঁকে গ্রেপ্তার করলে কেলেঙ্কারির একশেষ হত।
এবার ইনসপেক্টর ইঙ্গলথর্পের দিকে তাকিয়ে বললেন তিনি ইঙ্গলথর্পের কাণ্ড দেখে অবাক হয়েছেন, জানতে চাইলেন কেন তিনি তদন্তের সময় ঐ ব্যাপারটা বলেননি।
পোয়ারো বলল, আসলে বাজারে একটা দারুণ গুজব চলছিল বলেই তিনি বলতে পারেননি। ইঙ্গলথর্প পোয়ারোকে বাধা দিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন যে সে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিদ্বেষ প্রসূত।
পোয়ারো বলে উঠল, মিঃ ইঙ্গলথর্প আবার কোনো কেলেঙ্কারীতে জড়িয়ে পড়তে চাননি। ইঙ্গলথর্প বললেন সত্যিই তাই। তিনি তার প্রিয় পত্নী এমিলিকে কবরস্থ করার আগে আবার কোনো বাজে গুজবের শিকার হতে চাননি।
ইনসপেক্টর জ্যাপ বললেন খুনের দায়ে ধরা পড়ার চেয়ে ওরকম হাজারটা গুজবে জড়ানো অনেক ভালো। জ্যাপ ইঙ্গলথর্পপকে এও বলেন যাতে তিনি পোয়ারোকে ধন্যবাদ জানান কারণ তিনি থাকলেই ইঙ্গলথর্প গ্রেপ্তারির হাত থেকে রেহাই পেতেন না। ইঙ্গলথর্প স্বীকার করলেন যে তিনি বোকার মত কাজ করেছেন।
জ্যাপ এবার জনকে বললেন তিনি মিসেস ইঙ্গলথর্পের ঘরটা একবার দেখতে চান, তবে এজন্য জনকে ব্যস্ত হতে হবে না, পোয়ারোই তাকে সব দেখিয়ে দেবে। এছাড়া তিনি চাকর বাকরদের কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান।
সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এলে পোয়ারো আমাকে ইশারা করে ওর পেছনে যেতে বলল। সিঁড়ির কাছে যেতেই পোয়ারো আমার হাত ধরে টেনে বলল আমি যাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঐ বাড়িটার অন্য দিকটাতে বড়ো দরজাটার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। সে ওখানে না পৌঁছনো পর্যন্ত আমি যেন এতটুকু না নড়ি, এ ব্যাপারে সে সাবধান করে দিল।
পোয়ারোর কথাবার্তা আমার কিছুই বোধগম্য হল না। তবুও ওর কথামতো বড়ো দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। পোয়ারো কি আমাকে শেষ পর্যন্ত পাহারা দেবার জন্য পাঠাল তা বুঝে উঠলে পারলাম না। বহুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে উল্টোপাল্টা ভাবতে লাগলাম, কাউকে কোথাও দেখলাম না।
