আমি পোয়ারোর যুক্তি খণ্ডন করতে পারলাম না। তবুও বললাম যদি তাই হয়, তাহলে ইঙ্গলথর্প ছটার সময় কোথায় ছিলেন বলতে চাইছেন না কেন।
পোয়ারো বেশ শান্তভাবে বলল সেটা একটা কথা বটে। তবে সেটা নিয়ে সে ভাবছে না। পোয়ারো বলল লোকটার মৌনতার পেছনে অদ্ভুত কিছু কারণ নিশ্চয়ই আছে। নিজের স্ত্রীকে খুন না করলেও লোকটা যে মহা ধুরন্ধর তাতে সন্দেহ নেই। তার গোপন করার মত একটা কিছু যে আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আমি জানতে চাইলাম, সেটা কি? পোয়ারো প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল। আমাকে জিজ্ঞাসা করল ইঙ্গলথর্পপকে বাদ দিয়ে তদন্তের ব্যাপারটা আমার কেমন মনে হচ্ছে। অদ্ভুত কিছু আমার চোখে পড়েছে কিনা।
আমার মনে হল মেরী ক্যাভেণ্ডিসের কথা। তবু জিজ্ঞাসা করলাম কি বিষয়ের কথা পোয়ারো বলছে।
পোয়ারো বলল লরেন্স ক্যাভেণ্ডিসের সাক্ষ্যের কথা বলছে সে। আমি বললাম যে সেরকম কিছু তো আমি লক্ষ্য করিনি। তবে বরাবরই একটু দুর্বল চরিত্রের।
পোয়ারো বলল তদন্তের সময় লরেন্স বলেছিল তার মা ভুল করে স্ট্রিকনিন মেশানো টনিক খেয়ে মারা যেতে পারেন। আমি বললাম ডাক্তারও তো লরেন্সের কথাটা হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। যে কোনো সাধারণ লোকই এরকম ধারণা করতে পারে।
পোয়ারো আমাকে বলল লরেন্স ক্যাভেণ্ডিস তো সাধারণ অজ্ঞ লোক নন। সে আমাকে মনে করিয়ে দিল যে আমিই তাকে একদিন বলেছিলাম যে লরেন্স ডাক্তারী পাশ করেছেন।
আমি চমকে উঠলাম। বললাম ব্যাপারটা সত্যিই চিন্তা করার মত।
পোয়ারো মাথা নাড়ল, বলল শুরু থেকেই লরেন্সের হাবভাব একটু অদ্ভুত ধরনের। বাড়ির লোকজনের মধ্যে স্ট্রিকনিনের মৃত্যুটা স্বাভাবিকভাবে হয়েছে বলতে চাইছেন। এই কথাটা জন বললে একটা অর্থ খুঁজে পাওয়া যেত, কিন্তু লরেন্স ডাক্তারী পাশ করে একথা কেন বলতে চাইছেন তা চিন্তার বিষয়।
আমি বললাম সত্যিই পুরো ব্যাপারটাই গোলমেলে লাগছে।
পোয়ারো বলল, এছাড়া আরও একটা ব্যাপার আছে। মেরী ক্যাভেণ্ডিস অনেক কিছুই বলেননি, চেপে গেছেন।
আমার কিছুই বোধগম্য হচ্ছিল না। পোয়ারো জানাল সে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে মেরী ক্যাভেণ্ডিস মিঃ ও মিসেস ইঙ্গলথর্পের ঝগড়ার কথাবার্তা অনেকটাই শুনেছিলেন, তা তিনি স্বীকার করুন বা না করুন।
আমি বললাম যে ওর মত মহিলার পক্ষে আড়ি পাতাটা আমার কাছে অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।
পোয়ারো বলল এইখানেই রহস্যটা দানা বেঁধেছে। তবে সাক্ষ্য থেকে একটা ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে গেছে যে ডরকাসের কথাই ঠিক, ঝগড়াটা বিকেলের আগে মানে প্রায় চারটের কাছাকাছি হয়েছিল।
পোয়ারোর দিকে আড়চোখে তাকালাম। এই একটা ব্যাপারে ও যে কেন এত চিন্তা করছে বুঝে উঠতে পারলাম না।
পোয়ারো বলল তার কাছে আরো একটা ব্যাপার আশ্চর্যজনক বলে মনে হচ্ছে। উনি অত সকালবেলায় কেতাদুরস্ত হয়ে কি করছিলেন। এই বিষয়ে কেউ যে কেন কোনো প্রশ্ন করেনি সেটাও চিন্তার বিষয়।
আমি হাল্কা সুরে বললাম ভদ্রলোকের হয়ত বা অনিদ্রা রোগ আছে। পোয়ারো হেসে বলল ব্যাখ্যাটা আমি বেশ ভালোই দিয়েছি। যাই হোক সে বলল এবার থেকে ওর ওপর নজর রাখতে হবে।
এবার আমি জানতে চাইলাম পোয়ারো আর কারো সাক্ষ্যে গলদ পেয়েছে কিনা। পোয়ারো বলল তার মতে তদন্তের সময় বেশি হলে একজন বা দুজন সত্যি কথা বলেছে।
আমি বললাম, আমার তো মনে হয় মেরী বা লরেন্সকে বাদ দিলে জন আর মিস হাওয়ার্ডের সাক্ষ্য নিয়ে কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। ওরা দুজনে নিশ্চয়ই সত্যি কথা বলেছে।
পোয়ারো বলল ওদের দুজনের মধ্যে একজন সত্যি কথা বলেছে, দুজন কখনই বলেনি।
পোয়ারোর কথাটা ভাবতে লাগলাম। মিস হাওয়ার্ডের সাক্ষ্যের কথা মনশ্চক্ষে দেখতে পেলাম। ওর সাক্ষ্যে নতুনত্ব কিছু ছিল না। সেজন্য আমি একবারের জন্যও ভাবিনি যে মিস হাওয়ার্ডের সাক্ষ্যে কোনো মিথ্যার ছোঁয়া আছে, অথচ পোয়ারোর মতামতের ওপর আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে।
আমি পোয়ারোকে জিজ্ঞাসা করলাম সে কি ভাবছে যে মিস হাওয়ার্ড সত্যি কথা বলেননি। আমার তো তাকে বেশ সরল বলেই মনে হয়েছে।
পোয়ারো অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকাল–যেন কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর কিছুই বলল না।
আমি একটুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললাম মিস সিনথিয়া মারডককেও তো অবিশ্বাসের কোনো কারণ দেখতে পাচ্ছি না।
পোয়ারো বলল এটা ভাববার বিষয় যে পাশের ঘরে থাকা সত্ত্বেও সে কোনো শব্দ শোনেনি অথচ মেরী ক্যাভেণ্ডিস বাড়ির অন্য প্রান্তে থেকেও টেবিলটা পড়ার আওয়াজ শুনেছিলেন।
আমি বললাম হয়ত সিনথিয়ার ঘুমটা একটু গাঢ়।
এই সময় নিচে দরজায় ধাক্কা শুনে বুঝতে পারলাম স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দা দুজন এসে গেছেন।
পোয়ারো তাড়াতাড়ি টুপিটা হাতে নিয়ে আমাকে তার সাথে নিচে যেতে ইশারা করল। সকলে একসাথে স্টাইলসে রওনা হলাম।
স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দা দুজনকে দেখে সকলেই যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, বিশেষ করে জন। যদিও সবাই জানতে এই ধরনের ব্যাপার হবেই, তবু এটা এত তাড়াতাড়ি যে হবে তা বোধহয় কেউ বুঝতে পারেনি।
দেখলাম পোয়ারো জ্যাপের সঙ্গে নিচু গলায় কিছু আলোচনা করছে। ইনসপেক্টর জ্যাপ বাড়ির সকলকে বসবার ঘরে জমায়েত হতে অনুরোধ জানালেন।
