পোয়ারো বলল সে ঠাট্টাও করছে না, আর হেঁয়ালিও করছে না। তার কথা একেবারে সত্যি।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম যদি করোনারের জুরিরা আলফ্রেড ইঙ্গলথর্পকেই খুনী হিসাবে রায় দেয় তাহলে পোয়ারোর ধারণার কি গতি হবে।
পোয়ারো জানাল তাতেও তার মতের হেরফের হবে না।
পোয়ারোর জবাব শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এই ছোটখাটো মানুষটাকে আমি অবাক চোখে দেখতে লাগলাম। পোয়ারোর মুখে একসঙ্গে বিরক্তি ও আনন্দের অভিব্যক্তি দেখতে পেলাম।
পোয়ারো আমার কাঁধে হাত রেখে ছলছল চোখে বলতে লাগল যে সে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যেভাবেই হোক মিসেস ইঙ্গলথর্পের খুনীকে সে খুঁজে বের করবেই এবং যথাযোগ্য শাস্তি দেয়ার কারণ মিসেস ইঙ্গলথর্প জীবনে কখনও কারও ভালোবাসা পাননি। কিন্তু তিনি বেলজিয়ানদের জন্য যে উপকার করেছেন সেই ঋণ পোয়ারোকে শোধ করতেই হবে।
পোয়ারো আরো বলল যে সে এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে তার একটা মুখের কথায় অ্যালফ্রেড গ্রেপ্তারীর হাত থেকে রেহাই পেতে পারে। তখন সেটা না করলে মিসেস ইঙ্গলথর্পপ কখনও তাকে ক্ষমা করবেন না।
০৬. তদন্তের আগের সময়টা
তদন্তের আগের সময়টাতে পোয়ারো এতটুকু বিশ্রাম নেবার সময় পায়নি। দুবার গোপনে মিঃ ওয়েলসের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত রইল পোয়ারো, বেশ কয়েকবার গ্রামের বাইরেও ঘুরে এল সে। ব্যাপারটা আমার এতটুকু ভালো লাগছিল না, কারণ পোয়ারো ওর কাজকর্মের কথা আমাকে একটুও জানাল না।
তদন্তের নির্দিষ্ট দিন এবার এগিয়ে এল। শুক্রবার দিন গ্রামেরই একটা বাড়িতে করোনারের শুনানি বসল। শেষ পর্যন্ত পোয়ারোর দেখা মিলল, আমরা দুজনেও হাজির হলাম ওখানে। আমাদের সাক্ষ্যের প্রয়োজন না থাকায় আমরা পেছনেই বসে রইলাম।
প্রথমে খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো শেষ হল। জুরীরা মৃতদেহ দেখার পর জন ক্যাভেণ্ডিস সনাক্ত করে সাক্ষ্য দিল। প্রশ্নের উত্তরে জন ঐ দিনের ঘটনার একটা বিবরণ দিয়ে মিসেস ইঙ্গলথর্পের মারা যাওয়ার পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে দিল।
এরপর ডাক্তারী সাক্ষ্য গ্রহণ করা হল, সারা ঘরের লোক লণ্ডনের সর্বশ্রেষ্ঠ বিষ বিশেষজ্ঞ ডাঃ বরস্টিনের বক্তব্য শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। অল্প কথায় তিনি ময়না তদন্তের বিবরণ বুঝিয়ে দিলেন জুরীদের।
ময়না তদন্তের ফলাফল বিশ্লেষণ করে এটুকুই বোঝা গেছে মিসেস ইঙ্গলথর্প স্ট্রিকনিন বিষ প্রয়োগে মারা গেছেন।
ওঁর দেহে স্ট্রিকনিনের পরিমাণ দেখে জানা যায় উনি প্রায় পৌনে এক গ্রেন স্ট্রিকনিন খেয়েছিলেন।
এরপর করোনার প্রশ্ন করলেন মিসেস ইঙ্গলথর্প কি না জেনে ঐ বিষ গ্রহণ করে থাকতে পারেন?
ওঃ বরস্টিন জানালেন এটা অসম্ভব কারণ স্ত্রিকনিন সাধারণভাবে ওষুধে ব্যবহার করা হয় না, এর বিক্রির ওপরও বিধিনিষেধ আছে।
জুরী জিজ্ঞাসা করলেন ডাঃ কি পরীক্ষা করে বুঝতে পেরেছেন কিভাবে ঐ বিষ উনি গ্রহণ করেছেন।
বরস্টিন জানালেন যে তিনি বুঝতে পারেননি।
জুরী এবার প্রশ্ন করলেন ডাঃ উইলকিন্স আসার আগেই ডাঃ বরস্টিন স্টাইলস কোর্টে উপস্থিত হয়েছিলেন কিনা।
ডাঃ বরস্টিন জানালেন গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে তার দরজার কাছে দেখা হয়েছিল, সেখানে সব শুনে তিনি তাড়াতাড়ি ঘটনাস্থলে চলে যান।
জুরী এরপরের ঘটনাগুলো জানতে চান। ডাঃ বরস্টিন বলে যেতে লাগলেন যে মিসেস ইঙ্গলথর্পের ঘরে ঢুকেই তিনি দেখতে পান যে তার দেহটা ধনুষ্টংকারের রোগীর মত বেঁকে যাচ্ছে, তাকে দেখে মিসেস ইঙ্গলথর্প শুধু আলফ্রেড, আলফ্রেড বলে উঠলেন।
করোনার প্রশ্ন করলেন রাত্রের খাওয়ার পর মিসেস ইঙ্গলথর্প ওঁর স্বামীর এনে দেওয়া যে কফি পান করেছিলেন, তার মধ্য দিয়ে ওঁর দেহে বিষ প্রয়োগ করতে পারে কিনা।
ডাঃ বরস্টিন বললেন সেটা অসম্ভব নয়। তবে স্ট্রিকনিন খুব দ্রুত কাজ করে, সাধারণতঃ গ্রহণ করার দু এক ঘণ্টার মধ্যেই এর উপসর্গ দেখা দেয়। অবশ্য বিশেষ কোনো কারণে একটু দেরিও হতে পারে। যদিও বর্তমান ক্ষেত্রে এটা ঘটেনি। মিসেস ইঙ্গলথর্প খাওয়ার পরে রাত প্রায় আটটার সময় কফি পান করেছিলেন অথচ উপসর্গগুলো পরদিন ভোরের আগে দেখা দেয়নি। এতে সন্দেহ হয়, উনি বিষ গ্রহণ করেছিলেন আরও পরে।
করোনার বললেন মিসেস ইঙ্গলথর্পের অভ্যাস ছিল মাঝরাতে এক কাপ কোকো পান করা ওর মধ্য দিয়ে বিষ ওঁর শরীরে ঢুকে থাকতে পারে।
ডাঃ বরস্টিন বললেন তা হতে পারে না কারণ ঐ পাত্রের কোকো তিনি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, তাতে স্ট্রিকনিন নেই।
পোয়ারো যেন অস্ফুট স্বরে কিছু বলে উঠল। আমি পোয়ারোকে বলতে গেলাম ডাঃ বরস্টিন যা বলছেন সেও তো তাই বলেছিল।
পোয়ারো আমাকে বাধা দিয়ে চুপচাপ শুনতে বলল।
ডাঃ বরস্টিন জানালেন, স্ট্রিকনিনের স্বাদ অত্যন্ত তেতো। কোনো দ্রবণের ৭০,০০০ ভাগের এক ভাগ যদি স্ট্রিকনিন থাকে তাহলে এর উপস্থিতি বুঝতে পারা যায়, অত্যন্ত গন্ধযুক্ত কিছু দিয়ে স্ট্রিকনিনের স্বাদ অবশ্য দূর করা যায়, তবে কোকোর সে শক্তি নেই।
জুরীদের মধ্যে একজন জানতে চাইলেন কফিতে স্ট্রিকনিনের স্বাদ নষ্ট হয় কিনা।
ডাঃ বরস্টিন উত্তরে জানালেন কফির নিজস্ব স্বাদ যেহেতু তেতো, সেহেতু এর মধ্যে স্ট্রিকনিনের স্বাদ চাপা পড়তে পারে।
জুরী বললেন তাহলে ডাঃ বরস্টিনের মতে সম্ভবতঃ কফির মধ্য দিয়েই বিষ প্রয়োেগ করা হয়েছে, অবশ কোনো অজানা কারণে এর উপসর্গ ফুটে উঠতে দেরি হয়েছে।
