পোয়ারো এই ব্যাপারটা সম্বন্ধে তখনই নিশ্চিন্ত হয়েছে যখন সে তাপচুল্লীর ছাইয়ের মধ্যে থেকে ওই ছেঁড়া কাগজের টুকরোটা খুঁজে পেল। ওটা দেখেই তার মনে উইলের কথাটা জেগেছিল। একমাত্র কোনো উইল লিখতে গেলেই ঐ কথাটার প্রয়োজন হয়।
পোয়ারো জানাল আরও একটা কারণে তার ধারণাটা নিশ্চিত হয়। ঐ ঘরটাতে সেদিন কোনো কারণে ঝাড়ু দেওয়া হয়নি। ডেস্কের কাছে কিছু শুকনো মাটির গুঁড়ো পড়ে রয়েছে। ওগুলো থেকে এই ধারণাটা হওয়াই স্বাভাবিক যে সেদিন বৃষ্টি বাদল হয়নি। বাগানেও নতুন ফুলগাছের চারা বসানো হয়েছে। তাই ধারণা করা সহজ যে বাগানের দুজন মালিই কোনো কারণে ঐ ঘরে ঢুকেছিল, ওদেরই জুতোর তলার মাটির গুঁড়ো ঘরে ছড়িয়েছে, ওদের দুজোড়া পায়ের ছাপও ঘরে স্পষ্ট হয়ে রয়েছে।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম মালী দুজন কেন ঘরে ঢুকলো। পোয়ারো বলল মিসেস ইঙ্গলথর্প যদি শুধু ওদের সঙ্গে কথা বলতে চাইতেন তাহলে ওদের ঘরে ঢোকার প্রয়োজন হত না, জানলার ধারে এসেই কথা বলতে পারতেন, তাই খুব সম্ভব ওরা দুজন মিসেস ইঙ্গলথর্পের লেখা কোনো উইলে সাক্ষী হিসাবে সই করার জন্য ঘরে এসেছিল।
এই পর্যন্ত বলে পোয়ারো থামল। আমি পোয়ারোর তারিফ না করে পারলাম না। পোয়ারো মৃদু হাসল।
এবার আমি আরেকটা প্রশ্ন করলাম যে সে কিভাবে জানল যে নথিবাক্সের চাবিটা হারিয়েছে।
পোয়ারো বলল সেটা সে জানত না, শুধুমাত্র আন্দাজে ঢিল ছুঁড়েছিল। চাবিটাতে এক টুকরো তার জড়ানো দেখে সন্দেহ হয়েছিল চাবিটা কোনো মরচে ধরা চাবির থোকায় আটকানো ছিল, খুলে পড়ে গেছে। চাবিটা যদি প্রথমে হারিয়ে গিয়ে আবার খুঁজে পাওয়া যেত তাহলে মিসেস ইঙ্গলথর্প নিঃসন্দেহে সেটা চাবির থোকায় আটকে নিতেন। কিন্তু তার চাবির থোকাতে নতুন চকচকে একটা চাবি দেখে বোঝা গেল যে সেটা ঐ চাবির অন্য জোড়াটা। সুতরাং অন্য কেউ প্রথম চাবিটা নথি বাক্সে লাগিয়েছে।
আমি বললাম কেউ বলতে তো মিঃ ইঙ্গলথর্পৰ্প। পোয়ারো আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল যে আমি ঐ লোকটার অপরাধ সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ কিনা।
আমি বললাম ঘটনাপ্রবাদ তো সেদিকেই ইঙ্গিত করছে।
পোয়ারো মাথা ঝাঁকিয়ে বলল মিঃ ইঙ্গলথর্পেরও বলার মত অনেক কথা আছে। আমি বললাম আমি তো একটার বেশি কারণ দেখতে পাচ্ছি না। পোয়ারো সেটা কি জানতে চাইল।
আমি বলতে লাগলাম সেই রাত্রে যে লোকটা ঘরে ঢুকছিল সে জানলা দিয়ে বা কোনো যাদুমন্ত্রে ঢোকেনি। সুতরাং মিসেস ইঙ্গলথর্পপই দরজা খুলে দিয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে সেই লোকটি ওঁর স্বামী মিঃ ইঙ্গলথর্প কারণ নিজের স্বামীকে দরজা খুলে দিতে নিশ্চয়ই ওঁর আপত্তি থাকার কথা নয়।
পোয়ারো আমার সঙ্গে একমত হল না। সে বলল মিঃ ইঙ্গলথর্পপকে দরজা খুলে দিতে মিসেস ইঙ্গলথর্পের আপত্তি থাকার কথা। উনি ওঁর স্বামীর ঘরে ঢোকার দরজাটা সেদিন ভেতর থেকে বন্ধ করে রেখেছিলেন কারণ ঐ দিনই বিকালবেলায় ওদের মধ্যে খুব ঝগড়া হয়েছিল। সুতরাং মিসেস ইঙ্গলথর্প কখনই স্বামীকে দরজা খুলে দিতে পারেন না।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা ততক্ষণে পোয়ারোর আস্তানা লিস্টওয়েড কুটিরে পৌঁছে গেছি। পোয়ারোর আহ্বানে ওর শোবার ঘরে গিয়ে বসলাম। পোয়ারো দুটো চেয়ার জানলার সামনে এনে রেখেছিল–সেখান থেকে গ্রামের রাস্তাটা বেশ পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছিল।
জানলার বাইরে নজর পড়তেই দেখলাম অদ্ভুত চেহারার একটা লোক খুব জোরে রাস্তা দিয়ে ছুটে আসছে। লোকটার মুখ দেখে মনে হল খুব ভয় পেয়েছে সে। পোয়ারোকে তাড়াতাড়ি ডেকে দেখালাম।
পোয়ারো জানলা দিয়ে দেখে বলল লোকটা হল মিঃ মেস, ওষুধের দোকানে কাজ করে।
লোকটা ততক্ষণে দরজায় দমাদম ধাক্কা মারতে শুরু করেছে। পোয়ারো দরজা খোলার জন্য নিচে ছুটলো। মিঃ মেসের গলা পেলাম, সে বলছে সারা গ্রামে মিসেস ইঙ্গলথর্পের মারা যাওয়ার খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে। লোকে বলছে, ওঁকে নাকি বিষ খাওয়ানো হয়েছে। শেষের কথাটা বলার সময় গলাটা খাটো করল সে।
পোয়ারো অবশ্য স্বাভাবিক গলায় বললো সঠিক ব্যাপার অবশ্য ডাক্তারই একমাত্র বলতে পারবেন।
শেষ পর্যন্ত ছোকরাটা বিদায় নিতেই পোয়ারো দরজা বন্ধ করে দিল।
পোয়ারোর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সে বলল ছোকরাকে তদন্তের সময় সাক্ষী হিসেবে প্রয়োজন হবে।
পোয়ারোকে কিছু জিজ্ঞাসা করবো মনে করতেই বাধা দিল ও। সে জানাল তার মনটা এখন খুব বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে।
প্রায় দশ মিনিট চুপচাপ বসে রইল পোয়ারো। তার মুখের ওপর বিচিত্র ভাবের খেলা ফুটে উঠতে লাগল। শেষ পর্যন্ত একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার মুখ দিয়ে। তারপর বলল সে বড় ধাঁধায় পড়ে আছে। দুটো ব্যাপার নিয়ে সে খুব চিন্তিত।
আমি জানতে চাইলাম ব্যাপার দুটো কি। পোয়ারো জানাল একটা ব্যাপার হল গতকালের আবহাওয়াটা কেমন ছিল তা খুবই জরুরী ব্যাপার।
আমি বললাম গতকাল তো বেশ সুন্দর আবহাওয়া ছিল। পোয়ারো বলল গতকাল তাপমাত্রা প্রায় আশি ডিগ্রী উঠেছিল। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে রহস্যের চাবিকাঠি।
দ্বিতীয় ব্যাপারটি হল মঁসিয়ে ইঙ্গলথর্পের পোশাকটি বড় অদ্ভুতএবং সেই সঙ্গে ওর কালো দাড়ি আর চশমাও খুব অদ্ভুত।
আমি বললাম যে তার হেঁয়ালি আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
