পোয়ারো অসম্ভব বলে চিৎকার করে উঠল। সে হতভম্ব হয়ে গেল, বলল নিজের হাতে সে চাবি লাগিয়েছিল এবং সেই চাবি তার পকেটে রয়েছে। সে জোর দিয়ে বলল যে এই তালাটা কেউ জোর দিয়ে খুলেছে।
আমরা সকলেই প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলাম যে কে এটা খুলতে পারে আর কিভাবেই বা খুলল যখন দরজাটাও বন্ধ ছিল। আমরা পরস্পরের দিকে শুধু বোকার মত তাকালাম।
পোয়ারো এগিয়ে গিয়ে তাপচুল্লীর তাকের ওপরের সব জিনিষ নাড়াচাড়া করতে লাগল। বাইরে থেকে দেখে ওকে খুব শান্ত বলে মনে হলেও ওর মনের মধ্যে যে ঝড় বইছে তা বুঝতে পারলাম, দেখলাম ওর হাত দুটো থরথরিয়ে কাঁপছে।
একটু ধাতস্থ হয়ে পোয়ারো বলল যে এই নথিপত্রের বাক্সে এমন কোনো সূত্র ছিল যেটা হত্যাকারীর পক্ষে মারাত্মক, তাই কারও নজরে পড়ার আগেই যে ওটা সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। আর এই কারণেই সে এরকম একটা বিপজ্জনক ঝুঁকি নিয়েছে।
পোয়ারো হাত-পা ছুঁড়ে নিজেকে দোষারোপ করতে লাগল। বলতে লাগল সে মহা মূর্খ তাই বাক্সটা ঘরে ফেলে গেল, নিজে সঙ্গে করে নিয়ে গেলে সূত্রটা হাত ছাড়া হত না। হয়ত এতক্ষণে সেই সূত্রটা নষ্ট করাও হয়ে গেছে কিন্তু যদি নষ্ট করা না হয়ে থাকে তাহলে খুঁজে দেখা উচিৎ।
পোয়ারো একপ্রকার উন্মাদের মতই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত আমরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর বিস্ময়ের ঘোর কেটে যেতেই আমিও ওর পেছনে ছুটলাম। সিঁড়ির মাথায় পৌঁছে চতুর্দিকে তাকালাম, কিন্তু কোথাও পোয়ারোর কোনো চিহ্ন দেখতে পেলাম না।
সিঁড়ির বাঁকের মুখে মেরী ক্যাভেণ্ডিসের সঙ্গে দেখা হল। তিনি পোয়ারোকে উদ্ভ্রান্তের মত ছুটে যেতে দেখেছেন বলে আমার কাছে জানতে চাইলেন যে পোয়ারোর কি হয়েছে।
আমি বললাম যে একটা ব্যাপারে পোয়ারো একটু উত্তেজিত হয়েছে। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে আর সাহস হল না কারণ পোয়ারো আবার কিভাবে ব্যাপারটাকে নেবে কে জানে।
আমার কথা শুনে মেরী ক্যাভেণ্ডিস মৃদু হাসলেন। তারপর পেছনে ফিরে সিঁড়ি বেয়ে উনি উঠে গেলেন।
একটু পরেই শুনতে পেলাম নিচে বেশ চেঁচামেচি চলছে। পোয়ারো বেশ উচ্চস্বরে চিৎকার করছে। মনে মনে ভেবে লজ্জা পেলাম যে পোয়ারোটার কোনো বুদ্ধি নেই। অন্যের বাড়িতে এসে কেউ এভাবে চিৎকার করে। তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এসে পোয়ারোকে হাত ধরে একপাশে টেনে আনলাম। আমার দিকে তাকিয়ে পোয়ারো চুপ করে গেল।
পোয়ারোকে আমি মৃদু ভর্ৎসনা করলাম। পোয়ারো শান্ত কণ্ঠে জানাল সে খুবই লজ্জিত। তার এই শান্ত স্বর শুনে আমার কেমন যেন দুঃখ হল।
পোয়ারো এবার বলল যে তার কাজ আপাতত শেষ। সে এখন যেতে চায়। সে ছোট হাতব্যাগটা হাতে তুলে নিল। রাস্তা পর্যন্ত ওকে এগিয়ে দেবার জন্য আমি ওর সঙ্গ নিলাম।
ঘর থেকে বাইরে আসতেই সিনথিয়ার সঙ্গে আমাদের দেখা হয়ে গেল। পোয়ারো দাঁড়িয়ে পড়ে বলল তার একটা ছোট প্রশ্ন আছে। সিনথিয়া জানতে চাইল কি সেটা। পোয়ারো প্রশ্ন। করল সিনথিয়া কি কোনোদিন মিসেস ইঙ্গলথর্পের ওষুধ তৈরি করেছেন?
কথাটা শুনে সিনথিয়ার মুখ লাল হয়ে উঠল, ইতস্ততঃ করে জানাল যে সে কোনোদিন ওষুধ তৈরি করেনি। পোয়ারো এবার জিজ্ঞাসা করল যে সে শুধু পুরিয়া তৈরি করেছে কিনা।
সিনথিয়ার মুখ আরও রক্তিম হয়ে উঠল, বলল যে সে মাত্র একবার ঘুমের ওষুধ তৈরি করে দিয়েছিল।
কুড়িয়ে পাওয়া সেই নামবিহীন বাক্সটা পকেট থেকে বের করে পোয়ারো দেখাল এবং জানতে চাইল এটাই সেটা কিনা।
সিনথিয়া মাথা নেড়ে সায় দিল। পোয়ারো জিজ্ঞাসা করল এর মধ্যে সালফোনাল না ভেরোনাল ছিল? সিনথিয়া জানাল তাতে ব্রোমাইডের গুঁড়ো ছিল।
এবার পোয়ারো সিনথিয়াকে বিদায় জানাল।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আড়চোখে একবার পোয়ারোর দিকে তাকালাম। দেখলাম তার চোখের মণি দুটো অদ্ভুত সবুজ হয়ে জ্বলছে, বুঝলাম চরম উত্তেজনায় ভুগছে সে।
বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটার পর পোয়ারোই শেষ পর্যন্ত কথা বলল। সে জানাল মিঃ ওয়েলস একটা ব্যাপার আবিষ্কার করেছেন। আমি প্রশ্ন করলাম সে কি। পোয়ারো বলতে লাগল ছোট ঘরটার ডেস্কে রাখা মিসেস ইঙ্গলথর্পের উইল। ওই উইলে তিনি সম্পত্তিটা অ্যালফ্রেড ইঙ্গলথর্পপকে দিয়েছিলেন। উইলটা ওদের বিয়ের ঠিক আগের। ছাপানো ফর্মে লেখা উইল, সাক্ষী হিসাবে দুজন চাকর সই দিয়েছে। তবে কোথাও ডরকাসের সই নেই। ব্যাপারটা দেখে জন ও মিঃ ওয়েলস খুব অবাক হয়ে গেছে।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম মিঃ ইসলথর্প ঐ উইলের কথা জানতেন কিনা। পোয়ারো জানাল যে মিঃ ঈঙ্গলথর্প বলেছেন তিনি জানতেন না।
এরপর আমি পোয়ারোকে প্রশ্ন করলাম সে কিভাবে ছেঁড়া খাম দেখে বুঝল যে একটা উইল লেখা হয়েছে।
পোয়ারো হেসে বলল চিঠি লিখতে লিখতে প্রায়শই এরূপ হয় যে একটা বিশেষ কথার বানান মনে আসছে না। তখন সকলে কি করে একটা ছেঁড়া কাগজে ঐ বিশেষ বানানটা বারবার লিখে দেখতে চায় যে সেটা ঠিক হচ্ছে কিনা। এক্ষেত্রেও মিসেস ইঙ্গলথর্প ঠিক সেরকম করেছেন। ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে তিনি একটি বিশেষ শব্দের বানান নিয়ে চিন্তায় পড়েছিলেন। ঐ বিশেষ বানানটা সম্ভবত সম্পত্তির অধিকার সংক্রান্ত, মিসেস ইঙ্গলথর্প সেই রাতে নিশ্চয়ই সম্পত্তি কথাটা লিখতে চেয়েছিলেন।
