জন চলে যাওয়ার পর আমারও মনটা ইভির সঙ্গে দেখা করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল, তাই আমিও হলঘরে গিয়ে উপস্থিত হলাম।
মিস হাওয়ার্ডের সঙ্গে দেখা হতেই একটা চাপা অপরাধবোধ আমার মনকে নাড়া দিল। দিন কয়েক আগেই তিনি আমাকে সাবধানী বাণী শুনিয়েছিলেন। কিন্তু দুভার্গ্যবশতঃ সেই কথাগুলোকে তখন অতটা গুরুত্ব দিইনি। আর আজ সেই সাবধান বাণী বাস্তব সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে। নিজের মনেই বেশ লজ্জা বোধ করলাম। মনে হল মিস ইভি স্টাইলসে থাকলে আজ হয়তো ঐ চরম দুর্ঘটনাটা এড়ানো যেত।
কিন্তু উনি যেই মাত্র এসে আমার হাত দুটো চেপে ধরলেন আমার মনটা বেশ হাল্কা হয়ে গেল। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেখানে কোনো ভৎর্সনার চিহ্ন নেই বরং চরম বেদনা ফুটে রয়েছে। তাকে দেখলেই বোঝা যায়, তিনি খুব কাঁদছিলেন। তিনি জানলেন তার পাওয়ার সাথে সাথেই তিনি যত শীঘ্র সম্ভব গাড়ি নিয়ে রওনা দিয়েছেন।
জন পোয়ারোর সঙ্গে ইভিকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো যে এই দুর্ঘটনার ব্যাপারে পোয়ারো তাদের সাহায্য করছেন।
জন জানাল পোয়ারো তদন্ত করছেন। ইভি বলে উঠল যে এতে তদন্তের কিছু নেই। সে জানতে চাইল পোয়ারো কি ব্যাপারে সাহায্য করছেন?
জন অবাক হয়ে জানতে চাইল কাকে জেলে নিয়ে যাবে। ইভি বিরক্ত হল জন তার কথা বুঝতে পারেনি বলে। সে বলল মিঃ ইঙ্গলথর্পের কথা ছাড়া আর কার কথা সে বলবে।
জন ধীরে ধীরে ইভিকে আশ্বস্ত করার জন্য বলল সে যেন চিন্তা করে কথাবার্তা বলে। লরেন্স যে এটাকে হার্টফেলের ঘটনা বলে মনে করে সেকথাও জন জানাল।
ইভি চিৎকার করে বলল লরেন্স একটা মূর্খ তাই সে হার্টফেলের কথা বলেছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, আলফ্রেড ইঙ্গলথর্প মিসেস এমিলিকে খুন করেছে।
জন তাকে অত চেঁচামেচি করতে বারণ করল। তাকে শান্ত হয়ে চুপচাপ বসতে বলল এবং তদন্তটার জন্য যে অপেক্ষা করা উচিত সে কথাও বলল।
মিস হাওয়ার্ড তবুও চুপ করলেন না, বলতে লাগলেন সকলের মতিভ্রংশ হয়েছে বলে সবাই তদন্তের জন্য অপেক্ষা করে আছে আর এই ইত্যবসরে মিঃ ইঙ্গলথর্প পালিয়ে যাবেন।
জন মিস হাওয়ার্ডের কথাগুলো শুনে অসহায়ভাবে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। মিস ইভি বলে যেতে লাগলেন মিঃ ইঙ্গলথর্পই তার স্ত্রীকে বিষ খাইয়ে হত্যা করেছেন। সে বহুদিন আগে জানতো যে এরকম ধরনের একটা ঘটনা ঘটবে।
জন বলল এখন কিছুই করার নেই। কোনো প্রমাণ ছাড়া তাকে তো আর থানায় নিয়ে যাওয়া যেতে পারে না।
মিস হাওয়ার্ড তবু বললেন একটা কিছু করা উচিৎ। ওঁর কথাবার্তা শুনে মনে হলো এই বাড়িতে উনি আর মিঃ ইঙ্গলথর্প একসঙ্গে থাকা মানে লঙ্কাকাণ্ড হওয়া।
জন আর কথা না বাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ইতিমধ্যে ডরকাস চা আনলো। পোয়ারো এতক্ষণ চুপচাপ জানলার পাশে দাঁড়িয়েছিল। এবার ধীরে ধীরে মিস হাওয়ার্ডের কাছে এসে বসল।
পোয়ারো গম্ভীর গলায় বলল সে কিছু কথা মিস হাওয়ার্ডকে জিজ্ঞাসা করতে চায়। মিস ইভি সম্মত হলেন। পোয়ারো বলল সে তার সাহায্য চায়। ইভি বললেন মিঃ ইঙ্গলথর্পপকে ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য সব সাহায্য করতে তিনি রাজী।
পোয়ারো বলল সেও চায় অপরাধীকে ফাঁসিতে ঝোলাতে।
ইভি বিস্ময়ের সুরে বললেন অপরাধী মানে মিঃ ইঙ্গলথর্প তো। পোয়ারো বলল যে কেউ অপরাধী হতে পারে।
মিস হাওয়ার্ড বলে উঠলেন অন্য কেউ অপরাধী হতে পারে না। ঐ লোকটা এখানে আসার পরই এমিলি খুন হয়েছে, আগে তো হয়নি। সে একথাও বলল যে বাড়ির যত লোক আছে তারাও সব হাঙর কিন্তু তাদের লক্ষ্য শুধু এমিলির টাকার ওপর, সেক্ষেত্রে প্রাণের ভয়টা ছিল না। কিন্তু মিঃ ইঙ্গলথর্প এখানে আসার মাস দুয়েকের মধ্যে এই অঘটন ঘটল।
পোয়ারো আন্তরিকতার সঙ্গে বলল যদি মিঃ ইঙ্গলথর্প প্রকৃত অপরাধী হন তাহলে তিনি কখনই নিস্তার পাবেন না, ফাঁসিকাঠে তাকে ঝুলতেই হবে। তাই পোয়ারা চায় মিস হাওয়ার্ড যেন তার ওপর বিশ্বাস রাখেন।
মিস হাওয়ার্ড মাথা নাড়ালেন। তিনি বললেন মিসেস ইঙ্গলথর্পকে তিনি সত্যি খুব ভালোবাসতেন যদিও এমিলি একটু স্বার্থপর ছিলেন। কাউকে কিছু দিলে প্রতিদানে কিছু আশাও করতেন। এবং সবসময়ই সকলকে বুঝিয়ে দিতে চাইতেন যে ওঁর কাছে সবাই ঋণী। এজন্যই কেউ তাকে ভালোবাসতে পারল না। মিস ইভি বলে যেতে লাগলেন তিনি তার ন্যায্য পাওনা থেকে এতটুকুও বেশি নেননি এমিলির কাছ থেকে। এতে অবশ্য এমিলি মাঝে মাঝে একটু মনঃক্ষুগ্নও হয়েছেন কিন্তু ইভি তার নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখেছেন। সেজন্য তিনিই বোধ হয় একমাত্র মিসেস ইঙ্গলথর্পপকে ভালোবাসতে পেরেছেন।
পোয়ারো মাথা নেড়ে সায় দিল।
এই সময় জন এসে মিসেস ইঙ্গলথর্পের ঘরে যাওয়ার জন্য আমাদের ডাকলো। ছোট ঘরটা ওদের ততক্ষণে পরীক্ষা করা হয়ে গেছে। বন্ধ দরজার সামনে আসতেই পোয়ারোকে জিজ্ঞাসা করলাম তার কাছে চাবিগুলো আছে কিনা, পোয়ারো চাবিগুলো বের করে দিল।
জন দরজা খুলতেই মিঃ ওয়েলস ডেস্কের কাছে এগিয়ে গেলেন, তার পেছনে পেছনে জন। সে বলল তার কাগজপত্রগুলো নথিপত্রের বাক্সেই থাকতো।
পোয়ারো এবার এগিয়ে এসে চাবি দিয়ে বলল সাবধানতার জন্য সে ওটাতে চাবি লাগিয়ে রেখেছিল। জন বলল যে বাক্সটা খোলাই আছে, তাতে কোনো চাবি দেওয়া নেই।
