আপন মনে পোয়ারো বলতে লাগল ডেস্কে কোনো ডাকটিকিট থাকা উচিৎ ছিল। কিন্তু সে কোনো টিকিট দেখতে পেল না।
যাই হোক পোয়ারো আমাকে যাওয়ার জন্য তাড়া দিল আর একটা বহু পুরনো খাম আমার দিকে ছুঁড়ে দিল। দেখলাম, নোংরা ছোট একটা খাম, তাতে আড়াআড়িভাবে কি সব যেন লেখা আছে। কথাগুলো পড়ার চেষ্টা করলাম, দেখলাম তাতে লেখা আছে–আমার সম্পত্তি..আমার, অধিকার..অধিকার…তার সম্পত্তি–এই ধরনের কথা।
আমি যথারীতি এ সবের কিছুই বুঝলাম না।
০৫. এক টুকরো কাগজ
পোয়ারো এক টুকরো কাগজ আমার হাতে দিল। কাগজটাতে কিছু লেখা রয়েছে। আমি কৌতূহলবশতঃ পোয়ারোকে জিজ্ঞাসা করলাম যে সে এটা কোথায় পেয়েছে। পোয়ারো জানাল, ময়লা কাগজ রাখার ঝুড়িতে। লেখাটা কার হতে পারে আমাকে জিজ্ঞাসা করল সে। আমি দেখেই বললাম লেখাটা মিসেস ইঙ্গলথর্পের। কিন্তু লেখাটার অর্থ আমার বোধগম্য হল না। পোয়ারো শান্ত স্বরে বলল লেখাটার অর্থ হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে।
হঠাৎ একটা অদ্ভুত ধারণা আমার মনের মধ্যে উঁকি দিল, এমনও তো হতে পারে যে মিসেস ইঙ্গলথর্প মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন আর সেই অবস্থায় শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে বসেছেন। কথাটা পোয়ারোকে বলব কিনা ভাবতে ভাবতেই চমক ভাঙল ওরই ডাকে। সে কাপগুলো পরীক্ষা করে দেখার জন্য তার সাথে আমাকে যেতে বলল।
আমি বলে ফেললাম যে যখন জানাই গেছে কোকোতে বিষ ছিল তখন কফির কাপ পরীক্ষা আর কী হবে।
পোয়ারো ঠাট্টার সুরে বলল তার নাকি কোকোর কথা মনেই ছিল না। পোয়ারোর ওপর আমার রাগ হল, কারণে অকারণে ঠাট্টা করা ওর বিচিত্র খেয়াল। তবুও আমি শান্তভাবে বললাম মিসেস ইঙ্গলথর্প তো নিজের হাতে ওঁর কফির কাপ তুলে নিয়েই ওপরে গেছিলেন। সেই কাপ কি এখন আর আছে। শুধু হয়ত বেশি হলে ট্রেতে এক পুরিয়া স্ট্রিকনিন পাওয়া যেতে পারে।
পোয়ারো যাবার জন্য আমার হাত ধরে টানল। ওর ওপর রাগ করে থাকার উপায় নেই। তাই হেসে ফেললাম।
দুজনে এসে বসবার ঘরে উপস্থিত হলাম। কফির কাপগুলো যেমন দেখেছিলাম সেভাবেই রয়েছে। কফির কাপগুলো দেখতে দেখতে পোয়ারো বলল মিসেস ক্যাভেণ্ডিস তাহলে ট্রের কাছে দাঁড়িয়েছিলেন। এবং উনিই কাপে কফি ঢালছিলেন। জানলার সামনে মিসেস ক্যাভেণ্ডিস এগিয়ে গেলেন কফি নিয়ে, সেখানে সিনথিয়া আর আমি বসেছিলাম–পোয়ারো এই কথাগুলো বলে যেতে লাগল।
যেখানে আমরা বসেছিলাম সেখানে তিনটে কাপ রয়েছে আর তাপচুল্লীর ওপরের তাকে একটা কাপ রয়েছে। পোয়ারো জানতে চাইল তাকে ওপরের কাপটা কার। আমি বললাম ওটা লরেন্সের কাপ। আর ঐ তিনটে কাপ হল আমার সিনথিয়ার ও মিসেস ক্যাভেণ্ডিসের।
ট্রের ওপর যেকাপটা রয়েছে, পোয়ারো জানতে চাইল সেটা কার। আমি বললাম ওটা জনের কাপ।
পোয়ারো হিসাব করে বলল তাহলে মোট পাঁচটা কাপ। এবার সে মিঃ ইঙ্গলথর্পের কাপটা কোথায় জিজ্ঞাসা করল। আমি জানালাম মিঃ ইঙ্গলথর্প কফি খান না।
সুতরাং সব কটা কাপেরই হিসাব পাওয়া গেল।
এবার পোয়ারো প্রত্যেকটি কাপের তলানি কফি আলাদা আলাদা টেস্ট টিউবে রেখে মুখগুলো বন্ধ করে দিল। অবশ্য প্রত্যেক কাপের কফিই জিভে ঠেকালো। আমি এক দৃষ্টিতে ওর কাণ্ডকারখানা দেখছিলাম। লক্ষ্য করলাম ওর মুখে নানা ভাবের খেলা চলছে। কখনও একটু অবাক হল পোয়ারো, কখনও বা বেশ খুশী খুশী ভাব ফুটে উঠল ওর মুখে।
জন এসে জানাল চায়ের ব্যবস্থা হয়ে গেছে, আমাদের প্রাতঃরাশের আমন্ত্রণ জানাল সে। পোয়ারো আপত্তি করল না।
আমি জনকে লক্ষ্য করলাম, মনে হল গত রাতের শোকের ধাক্কাটাও সামলে নিয়েছে, এখানেই লরেন্সের সঙ্গে ওর পার্থক্য, জন চিরকালই কম চিন্তাভাবনা করে। সকাল থেকেই সে দারুণ ব্যস্ততার মধ্যে কাটিয়েছে–নানা জায়গায় টেলিগ্রাম পাঠানো, খবরের কাগজে খবর পাঠানো এমনকি ইভিলিন হাওয়ার্ডকেও খবর পাঠাতে ভোলেনি সে।
জন বলল মিঃ ইঙ্গলথর্প যে বাড়ি ফিরে এসেছেন সে খবর কি সে বলেছে। পোয়ারো মাথা নেড়ে সায় দিল।
জন বলতে লাগল যে তারা বেশ অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়েছে। একজন খুনীর সঙ্গে একসঙ্গে বসে কিভাবে খাবে তা সে ভেবেও পাচ্ছে না।
পোয়ারো ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। তারপর জানতে চাইল মিঃ ইঙ্গলথর্প গত রাত্রে না ফেরার কারণ কিছু বলেছেন কিনা। জন জানাল ল্যাচকিটা নিতে ভুলে গেছিলেন বলে তিনি ফিরতে পারেননি।
পোয়ারো জিজ্ঞাসা করল জনের কি মনে হয়, মিঃ ইঙ্গলথর্প ল্যাচকিটা সত্যিই নিতে ভুলে গেছিলেন। জন জানাল সে ঠিক বলতে পারবে না, কারণ ওটা দেখার কথা তার মনেই পড়েনি। সে বলল ল্যাচকিটা হলঘরের দেরাজের মধ্যেই রাখা থাকে। সে এখনই গিয়ে দেখাবে ওটা আছে কিনা।
পোয়ারো তাকে ব্যস্ত হতে নিষেধ করল। মৃদু হেসে বলল মিঃ ইঙ্গলথর্প যদি ল্যাচকিটা নিয়ে গিয়ে থাকেন তাহলে সেটাকে আবার ঠিক জায়গায় রাখারও যথেষ্ট সময় পেয়েছেন।
জন জানতে চাইল তাহলে এ ব্যাপারে পোয়ারোর অভিমত কি। পোয়ারো বলল সে কিছুই মনে করছে না। তবে আজ সকালে কেউ যদি ঐ দেরাজের চাবিটা দেখে থাকে তাহলে এটা ওর পক্ষে ভালো হতে পারে।
জন ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে একটু অবাক হয়ে তাকাল। পোয়ারো তাকে চিন্তা করতে নিষেধ করল।
যাই হোক সকলেই খাওয়ার ঘরে এসে হাজির হলাম। ঐ দুর্ঘটনার পর যথারীতি বাড়ির সকলেরই মুখ থম থম করছে।
