যখন ও খাবার সময় একমাত্র বাড়ির ভেতরে আসতো তখন ঐ মহিলাদের বিষাক্ত আচরণে সে কাহিল হয়ে পড়তো, চরমে উঠেছিলো মহিলাদের শত্রুতা ১৭ই সেপ্টেম্বর তারিখে। আমরা সবাই দুপুরে খাবার সময় বেশ বিব্রত বোধ করছিলাম। এলসা ছিলো ভীষণ…এককথায় উদ্ধত বললেই বোধ হয় বোঝানো যায়। সে ক্যারোলিনকে খোলাখুলিভাবে উপেক্ষা করতো এমনকি ঘরে ক্যারোলিন থাকলেও অ্যামিয়াসের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতো যেন কেউ আর ঘরে নেই। অবশ্য ক্যারোলিন হেসেটেসে হালকাভাবে আমাদের সঙ্গে কথা বলতো, কিন্তু কায়দা করে এমনভাবে বলতো যে খোঁচা মারার যেখানে ঠিক বিধবো সেখানে। ক্যারোলিনের মধ্যে এলসা গ্ৰীয়ারের অসহ্য সতোর ছিটেফোঁটা ছিলো না। সবকিছুই ক্যারোলিনের একটু তির্যক, আভাস ইঙ্গিতে বলাটাই তার স্বভাব সোজাসুজি না বলে।
আমরা যখন ড্রইংরুমে বসে কফি খাচ্ছিলাম দুপুরের খাবার পর তখন চরমে উঠলো ব্যাপারটা। ঘরে খুব পালিশ করা একটা কাঠ খোদাইয়ের মূর্তি ছিলো, দেখতে ভারী অদ্ভুত। ওটার প্রশংসা আমি করতেই বলেছিলো ক্যারোলিন, ওটা নরওয়ের একজন ভাস্করের তৈরি। ওঁর শিল্পকর্ম অ্যামিয়াস আর আমি দুজনেই পছন্দ করি দারুণ। দুজনেই যাবো ভাবছি আগামী গ্রীষ্মে। নিশ্চিন্ত এই ধরনের অধিকারবোধ অসহ্য হয়ে উঠলো এলসার কাছে। সে এড়িয়ে যেতে দেয় না কোনো রকমের চ্যালেঞ্জকে। এলসা দু-এক মিনিট অপেক্ষা করার পর বেশ স্পষ্টভাবে বিশেষ জোর গলার ওপর দিয়ে বলেছিলো, এই ঘরটাই ঠিক মতো সাজালে কত সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। আসবাবপত্র বড্ড বেশি হয়ে গেছে। যখন এখানে থাকবো আমি তখন বাজে এইসব জঞ্জাল সরিয়ে দিয়ে মাত্র বাছা বাছা দু-একটা রেখে দেবো। তামাটে রঙের পর্দা লাগাবো যাতে অস্তগামী সূর্যের আলো পশ্চিমের জানলা দিয়ে এসে পড়ে তার ওপর। তারপর আমার দিকে ফিরে বললো, খুব সুন্দর হবে না? কি মনে হয় আপনার?
উত্তর দেবার সময়টুকু আমি পেলাম না। বলে উঠলো ক্যারোলিন, নরম আর মসৃণ তার কণ্ঠস্বর, বিপজ্জনক ছাড়া আর কিছু আমার কাছে মনে হয়নি। ক্যারোলিন বলেছিলো, বাড়িটাকে কেনার কথা তুমি চিন্তা করছো নাকি এলসা?
এলসার উত্তর, দরকার পড়বে না কেনার।
তুমি কি বলতে চাও? ক্যারোলিনের গলার স্বরে নরম ভাব সে আর নেই। কঠোর আর রুক্ষ হয়ে উঠেছে। হেসে উঠলো এলসা, আমাদের কি কোনো প্রয়োজন আছে বোঝার ভান করার, কেন আমার কথা কি ক্যারোলিন তুমি বুঝতে পারছো না? আমি কি বলতে চাইছি তা তুমি জানো।
না, আমি কিছুই জানি না। এলসা তখন বলে উঠেছিলো, চেষ্টা কোরো না উট পাখি হবার। আমি আর অ্যামিয়াস, দুজনেই পছন্দ করি দুজনকে। এই বাড়িটাও তোমার নয়, অ্যামিয়াসের ওর সঙ্গে বিয়ের পর এখানেই থাকবো আমি।
মাথা খারাপ হয়ে গেছে কি তোমার? বলেছিলো ক্যারোলিন। এলসা বলেছিলো, না, খারাপ হয়নি একটুও এবং তুমিও সেটা ভালো করে জানো। দুজনে যদি দুজনের কাছে আমরা খোলাখুলি সব কথা স্বীকার করি তাহলে বেশ সহজ হয়ে ওঠে জিনিসটা, তাই না? আমি আর অ্যামিয়াস পরস্পরকে ভালোবাসি–স্পষ্ট বুঝতেও পারছো এ ব্যাপারটা। সবচেয়ে শোভন কাজ হবে তোমার পক্ষ থেকে মুক্তি দেওয়া অ্যামিয়াসকে।
একটা কথাও তোমার বিশ্বাস করছি না। সেই দৃঢ়তা কিন্তু ক্যারোলিনের গলায় ছিলো না, ওর গোপন জায়গাতে এলসা আঘাত দিতে পেরেছে।
অ্যামিয়াস ক্রেল ঠিক সেই মুহূর্তে এসেছিলো ঘরের মধ্যে, ক্যারোলিনকে বললো হেসে এলসা, বিশ্বাস না হলে আমার কথা জিজ্ঞেস করে দেখো অ্যামিয়াসকে।
ক্যারোলিন বললো, করছি, অ্যামিয়াসের দিকে এই বলে ফিরে সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলো, অ্যামিয়াস, তুমি ওকে বিয়ে করতে চাও এলসা বলছে। সত্যি কি কথাটা?
আমার দুঃখ হয়েছিলো বেচারা অ্যামিয়াসের জন্যে। ঘাড়ে এই ধরনের পরিস্থিতি চাপিয়ে দিলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ বোকা হয়ে যায়। অ্যামিয়াস রাগে ফেটে পড়েছিলো লজ্জায় লাল হয়ে গিয়ে। প্রশ্ন করেছিলো এলসার দিকে তাকিয়ে কেন মনের কথা সে চেপে রাখতে পারেনি। জিজ্ঞেস করেছিলো ক্যারোলিন, সত্যি তাহলে কথাটা?
কোনো উত্তর না দিয়ে অ্যামিয়াস জামার কলারের তলাটা ঘষতে লাগলো, কোণঠাসা যে কোনো ভাবে হলে ওই রকম হাত বোলাতে কলারে ছোটবেলা থেকেই। অ্যামিয়াস সম্মান বজায় রেখে কথা বলার চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু বেচারা পারেনি। ও বলেছিলো, আলোচনা করতে চাই না ও নিয়ে।
ক্যারোলিন বলেছিলো, আলোচনা কিন্তু আমরা করতে চাইছি।
এলসা টুক করে টিপ্পনী কাটলো, সত্যি কথাটা ক্যারোলিনকে বলে দেওয়াই ভালো।
আবার শান্ত ভাবে ক্যারোলিন প্রশ্ন করলো? অ্যামিয়াস, সত্যি কি কথাটা?
অ্যামিয়াস লজ্জা পেয়েছে মনে হচ্ছিলো, সাধারণত স্বামী-স্ত্রীরা বেকায়দায় পড়লে লজ্জা পেয়ে থাকে যেভাবে।
আবার বললো ক্যারোলিন, দয়া করে উত্তর দাও। জানতেই হবে আমাকে।
কোণঠাসা ষাঁড়ের মতো হঠাৎ ঘাড় উঁচু করে অ্যামিয়াস দাঁড়ালো, হ্যাঁ, সত্যি, তবে এ নিয়ে এখন আলোচনা করবো না।
অ্যামিয়াস কথাটা বলেই ঘর থেকে বড় বড় পা ফেলে বেরিয়ে গেলো, সঙ্গে সঙ্গে ঘর ছাড়লাম আমিও, ঐভাবে থাকতে মেয়েদের সঙ্গে একটুও ভালো লাগছিলো না। ওকে ধরলাম আমার বাইরের বারান্দায় গিয়ে। শাপ-শাপান্ত করছিলো অ্যামিয়াস, আমি কখনো এভাবে রাগ করতে দেখিনি। গর্জে উঠলো তারপর, কেন থাকতে পারে না মুখ বন্ধ করে? কেন পারে না? আগুনে এবার তো ঘি পড়েছে। ঠ্যালা বোঝ। তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে ছবিটা।…ফিলিপ শুনছো আমার কথা? এটাই সবার সেরা আমার কাজ মতো ছবি জীবনে এঁকেছি তার মধ্যে কারুর সঙ্গে এটার তুলনা করা যায় না। আর মাথামোটা দুটো মেয়েমানুষ ঝগড়া করে নিজেদের মধ্যে ভণ্ডুল করতে চায় এটাকে।
