একটু শান্ত হয়ে আস্তে আস্তে সে বললো, কোনো মাত্রাজ্ঞান থাকে না মেয়ে জাতটারই। আমি না হেসে থাকতে পারলাম না, বললাম, ছাড়তো এখন এসব কথা, এতো নিজের কৃতকর্মের ফল তোমার।
আমি কি তা আর জানি না।…কিন্তু নিশ্চয়ই তুমি স্বীকার করবে একটা কথা ফিলিপ, যদি কোনো পুরুষের এলসাকে দেখে মাথা ঘুরে যায় তবে দোষ দেওয়া যায় না তাকে। অন্ততঃ তা বোঝা উচিত ছিলো ক্যারোলিনের।
জিজ্ঞেস করলাম আমি, ক্যারোলিন যদি খুব কড়া হয়ে গিয়ে রাজী না হয় বিবাহ বিচ্ছেদে। তাহলে কি হবে।
অ্যামিয়াস ততক্ষণে চলে গেছে এক কল্পনার জগতে, দ্বিতীয়বার বললুম আমার কথাটা, ওর কানে সেটাও ঢুকলো না, কিছুটা অন্যমনস্ক ভাবে বললো, কখনই কিন্তু ক্যারোলিন অতোটা প্রতিহিংসা পরায়ন হতে পারে না। বুঝতে পারছো না তুমি ভাই।
একটা বাচ্চা আছে তাছাড়া, আমি বললাম কালার কথা।
অ্যামিয়াস আমার হাত ধরে বলেছিলো, ভালো কথাই তুমি বলেছো ফিলিপ, কিন্তু ঘ্যানঘ্যান করে এইভাবে অমঙ্গলের কথা বলে লাভ কি। আমি সামলাতে পারবো আমার ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত সব কিছুই ঠিক হয়ে যাবে। না হলে তুমি দেখো।
আসলে অ্যামিয়াস হলো এই, উগ্রভাবে সব সময়ে আশাবাদী, যুক্তিতর্কের ধার পর্যন্ত ধারে না। তারপর হাসিখুশি মুখে সে বললো, ওদের ঝাড়ে বংশো নরকে পাঠানো উচিত।
আমাদের কোনো কথা তারপর হয়েছিলো কিনা মনে নেই, ক্যারোলিন ঘর থেকে কয়েক মিনিট পরে বেরিয়ে বারান্দায় এলো। একটা গাঢ় বাদামী রঙের অদ্ভুত ধরনের টুপি মাথায়।
কিছুই যেন ঘটেনি এমন স্বাভাবিক ভাবে বললো, ঐ রঙ লাগা কোটটা অ্যামিয়াস পাল্টে নাও। চায়ের নেমন্তন্ন আছে মেরিডিথের বাড়িতে, বসে আছে নাকি ভুলে?
তাকিয়ে রইলো বোকার মতো কিছুক্ষণ তারপর প্রায় তোতলাতে তোতলাতে বলেছিলো অ্যামিয়াস, ওহ,…হা ভুলেই গেছিলাম।..হ্যাঁ, হা…যাচ্ছি…নি…নিশ্চয়ই।
তাহলে যাও চেহারাটা একটু ভদ্র করে নাও পোযাক পাল্টে। গলার স্বর স্বাভাবিক হলেও ক্যারোলিনের, ও কিন্তু তাকাচ্ছিলো না অ্যামিয়াসের দিকে। কিছু ডালিয়া ফুল ফুটেছিলো সামনেই, ঝুঁকে পড়ে ক্যারোলিন তুলতে লাগলো খুব ফোঁটা ফুলগুলো।
ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতর অ্যামিয়াস চলে গেলো। আমার সঙ্গে ক্যারোলিন বকবক করতে শুরু করেছিলো আবহাওয়া সম্বন্ধে। মাছ ধরা যাবে কিনা এই সময়, যদি যায় তবে ও মাছ ধরতে যাবে অ্যামিয়াস আর অ্যাঞ্জেলাকে নিয়ে। সত্যিই এই ক্যারোলিন অসাধারণ মহিলা। ওকে দিতেই হবে এ মর্যাদাটা।
তবে মনে হয় আমার ওর আসল রূপটাকে এই ঘটনাটাই ফুটিয়ে তোলে। ক্যারোলিনের মনের জোর ছিলো দারুণ আর আত্মবিশ্বাস ছিলো অদ্ভুত। ও তখনই স্বামীকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো কিনা জানি না, তবে নিলেও কিছু নেই আশ্চর্য হবার। তৈরি করা নিজের পরিকল্পনা এবং তা কার্যকর করার ক্ষমতাও ঠান্ডা মাথায় তার ছিলো।
দারুণ বিপজ্জনক মহিলা ছিলেন ক্যারোলিন ক্রেল। তখনই আমার বোঝা উচিত ছিলো যে মুখ বুজে ব্যাপারটা ও সহ্য করবে না। অথচ বোকার মতো আমি ভেবেছিলাম হয়তো ও নীরবে মেনে নেবার জন্যে ভাগ্যকে তৈরি হচ্ছে, কিংবা ভেবেছিলো হয়তো অ্যামিয়াসের মন স্বাভাবিক ব্যবহার করলে পাল্টাতেও পারে।
সকলেই তৈরি হয়ে একটু পরে বেরিয়ে পড়লো। একটু উদ্ধত এলসা, কিন্তু বিজয়িনীর ভাব মুখে। ওর দিকে তাকালোই না ক্যারোলিন। অ্যাঞ্জেলা সামাল দিলো পরিস্থিতির। তর্ক করতে লাগলো মিস উইলিয়ামসের সঙ্গে কিছুতেই ও পাল্টাবে না নিজের পোষাক। এসব দিকে মেরিডিথ নজর দেন না।
হাঁটছিলাম আমরা। ক্যারোলিন আর অ্যাঞ্জেলা এক সঙ্গে। আমি আর আমিয়াস। একা একা এলসা, মৃদু হাসি মুখে।
কখনো আমাকে এলসা মুগ্ধ করতে পারেনি–উগ্র প্রকৃতির মেয়ে বড় বেশি মাত্রায়। কিন্তু স্বীকার করতেই হবে একথা যে তাকে সেদিন বিকেলে অপূর্ব সুন্দরী লাগছিলো। মেয়েদের মনের বাসনা পূর্ণ হলে যেমন দেখতে লাগে অসাধারণ।
বিকেলবেলার ঘটনাগুলো সেদিন আমার খুব ভালোভাবে মনে পড়ছে না। ঝাপসা হয়ে আছে সব ব্যাপারটা। তবে মনে আছে এটা যে বাড়ি থেকে মেরিডিথ বেরিয়ে এসেছিলেন আমাদের স্বাগত জানাবার জন্যে। প্রথমে মনে হয় আমরা বাগান ঘুরে হেঁটেছিলাম। অ্যাঞ্জেলার সঙ্গে টেরিয়ার কুকুরদের ট্রেনিং দিতে হয় কিভাবে এই নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। অ্যাঞ্জেলা আপেল খাচ্ছিলো পেটুকের মতো, আর জোর করছিলো আমাকেও খাবার জন্যে।
দেখলাম বাড়িতে ঢোকার পর বিরাট সিডার গাছের তলায় আয়োজন করা হয়েছে চায়ের। খুব বিব্রত লাগছিলো মেরিডিথকে। মনে হয় আমার, ক্যারোলিন বা অ্যামিয়াস কিছু বলেছিলো দাদাকে। সন্দেহের চোখে কেমন যেন একবার ক্যারোলিনের দিকে আর একবার তাকাচ্ছিলেন এলসার দিকে দাদা। মনে হয় খুব চিন্তিত হয়ে উঠেছিলেন।
কয়েকটা কথা দাদা চট করে চায়ের পর আমার সঙ্গে বলে নিয়েছিলেন, ফিলিপ দ্যাখ, এটা করতে পারে না অ্যামিয়াস।
আমি বলেছিলাম, আর কোরো না ও ভুলটা; ও করবেই।
ওই মেয়েটার সঙ্গে যাবার জন্যে নিশ্চয়ই ফেলে দিতে পারে না অ্যামিয়াস নিজের বৌ-মেয়েকে, তাছাড়া বড় জোর আঠার হবে ঐ মেয়েটার বয়স, ওর থেকে অনেক বড় অ্যামিয়াস।
দাদাকে আমি জানিয়েছিলাম পুরো কুড়ি বছরের মহিলা মিস এলসা গ্ৰীয়ার।
