মুখে না বললেও আমি মনে মনে বুঝেছিলাম এবার খুব খারাপভাবেই অ্যামিয়াস জড়িয়ে পড়েছে। অন্যদের মন্তব্য কয়েক সপ্তাহ পরে কানে আসতে লাগলো। কেউ বললো, একেবারে মজে গেছে এলসা মেয়েটা। অন্য একজনের মন্তব্য–একেবারেই গেছে অ্যামিয়াসের মাথাটা নইলে মেয়েটার বয়সের কথা চিন্তা করছে না একবারও। আবার নাকসিটকে অনেকে বললো নিজের পথটা এলসা গ্ৰীয়ার ভালোভাবে জানে। মেয়েটা বসে আছে টাকার গদিতে। অন্য একজনের বক্তব্য, যা চায়, তাই পায়। অনেক অশালীন কথা আরও বলাবলি করতো ওর সম্বন্ধে লোকেরা। কী ভাবতো এ ব্যাপারে অ্যামিয়াসের স্ত্রী এটা একটা বড় প্রশ্ন ছিলো এবং ক্যারোলিন ঐ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে যে ধরনের উত্তর দিতে বাধ্য হতো কেউ কেউ গম্ভীর হয়ে সে সম্বন্ধে বলতো যে মহিলা জ্বলে-পুড়ে মরতে ঈর্ষায় আর একেবারে নরক করে তুলেছিলো স্বামীর জীবন।
আমি প্রয়োজন মনে করছি এসব কথা উল্লেখ করা এই কারণে যে ওখানে আমি পৌঁছাবার আগে কী ধরনের ব্যাপার চলছিলো তা জানা দরকার সঠিকভাবে।
আমার দেখার আগ্রহও ছিলো মেয়েটাকে–সুন্দরী অসাধারণ আর দারুণ মোহময়ী স্বীকার করতে বাধ্য যে রুক্ষ ব্যবহার ক্যারোলিনের দেখে মনে মনে খুশি হয়েছিলাম আমি। এই খুশির মূলে এক ধরনের বিদ্বেষ ছিলো।
হালকা মেজাজে যতোটা থাকা উচিত অ্যামিয়াস জেল ততোটা ছিলো না। ওকে যারা ভালোভাবে চেনে না তারা কিন্তু স্বাভাবিকই মনে করতো ওর আচরণটাকে। কিন্তু এতো ঘনিষ্ঠভাবে ওকে চিনি বলেই বুঝতে পারছিলাম প্রচণ্ড চাপ পড়েছে ওর মনের ওপর, হঠাৎ হঠাৎ মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে, খুব খেয়ালী হয়ে পড়ছিলো মাঝে মাঝে, আর সব মিলিয়ে ভীষণ খিটখিটে।
অ্যামিয়াস ছবি আঁকার সময় প্রায়ই ভীষণ খেয়ালী হয়ে উঠতো, কিন্তু আঁকছিলো যে ছবিটা তার জন্যে মানসিক অতোটা চাপ হবার তেমন কোনো সঙ্গত কারণ দেখতে পাইনি আমি। ও খুব খুশি হয়েছিলো আমাকে দেখে যেই দুজন একা হয়েছি আমরা ও বললো আমাকে, ভালো হয়েছে খুব তুমি এসেছো ফিল। একটা বাড়িতে চারজন মেয়ে মানুষের সঙ্গে থাকতে হলে পাগল হয়ে যাবে যে কোনো মানুষ। ওরা মনে হচ্ছে পাগলাগারদে আমাকে না পাঠিয়ে ছাড়বে না।
খুব অস্বস্তিকর ছিলো সত্যিই পরিবেশটা। ক্যারোলিন ভীষণ রুক্ষ হয়ে উঠেছিলো তা আগেই বলেছি। আপত্তিকর কথা একটাও উচ্চারণ না করে অবিশ্বাস্যভাবে ক্যারোলিন শান্ত সংযত আর ভদ্র উপায়ে সবচেয়ে বেশি রুঢ় হয়ে উঠেছিলো এলসার ব্যাপারে। খোলাখুলি এবং অভব্য ক্যারোলিনের সঙ্গে এলসাও অভদ্র ব্যবহার করেছিলো। বিজয়িনী সেই যে, সেটা বুঝতো এলসা, এবং ভদ্র বংশের শিক্ষা-দীক্ষার রুচিও খোলাখুলিভাবে অভদ্র আচরণ করা থেকে তাকে পারেনি বিব্রত করতে। ফলে ছবি আঁকার সময়টুকু বাদ দিয়ে অ্যামিয়াস অন্য সময়ে অ্যাঞ্জেলার সঙ্গে খুনসুটি করতো। দুজনের মধ্যে সম্পর্ক এমনিতে ছিলো খুবই মধুর। অবশ্য ঠাট্টা ফোকুড়ি করা পরস্পরকে, ঝগড়াঝাটি যে মাঝে মাঝে না হতো তা নয়। কিন্তু অ্যামিয়াস যেন বড় বেশি মাত্রায় সেবারে ক্ষেপে গিয়েছিলো এবং তার প্রতিটি আচরণে তা প্রকাশ পাচ্ছিলো। বড় বেশি রেগে উঠেছিলো অ্যামিয়াস আর অ্যাঞ্জেলা দুজনেই দুজনের ওপর। গভর্নেস ছিলেন চতুর্থ ব্যক্তি। ওকে অ্যামিয়াস বলতো, খিটখিটে ডাইনী বুড়ী। ভীষণ ঘেন্না করতে আমাকে। চুপচাপ ঠোঁট চেপে বসে বসে লক্ষ্য করে আমায় আর সব সময়ে আমাকে অপছন্দ করে।
অ্যামিয়াস ঐ সময়েই আমাকে বলেছিলো, নরকের দরজা মেয়েমানুষ জাতটাই, যদি কেউ জীবনে সুখ শান্তি চায় তবে শত হস্তেন দূরে থাকতে হবে মেয়েমানুষ থেকে।
বলেছিলাম আমি, অ্যামিয়াস বিয়ে করাই উচিত হয়নি তোমার। ঠিক হয়নি ঘর সংসারের বন্ধনে জড়ানো।
ও বলেছিলো ওসব আলোচনা এতোদিন পরে না করাই ভালো। এটাও বলেছিলো অ্যামিয়াস যে ওর হাত থেকে নিষ্কৃতি পেলে ভালোই হবে ক্যারোলিনের। আমি তখনই আভাস পেয়েছিলাম যে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে অস্বাভাবিক।
আমি বলেছিলাম, কি হচ্ছে কি এসব! ব্যাপারটা কি তাহলে সুন্দরী এলসার সঙ্গে সত্যিই চলে গেছে গুরুতর পর্যায়ে।
খুব সুন্দরী ও, তাই না, মনে হয় মাঝে মাঝে ওর সঙ্গে দেখা না হলেই যেন ভালো হতো। যন্ত্রণার আভাস অ্যামিয়াসের গলায় ফুটে উঠলো।
আমি বলেছিলাম, শোন হে বুড়ো খোকা, এবার একটু নিজের রাশটা সামলাও। জড়িয়ে পোড়ো না যেন আর কোনো মেয়েমানুষের সঙ্গে।
অ্যামিয়াস আমার কথা শুনে হেসে বললো, কথাটা তোমার পক্ষে বলা সহজ। আমি মুক্তি পেতে পারি না মেয়েদের বাঁধন থেকে, কিছুতেই পারি না, চেষ্টা করি যদিবা আমাকে একা থাকতে দেয় না ওরা।
অ্যামিয়াস তারপর নিজের চওড়া কাঁধটা ঝাঁকিয়ে হাসলো বিষণ্ণভাবে, শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়ে যাবে সবই বন্ধু, থাকবে না কিছুই। তবে ভালো যে আঁকছি ছবিটা নিশ্চয়ই এটা স্বীকার করবে?
যে ছবিটা এলসার ও আঁকছিলো তার কথাই অ্যামিয়াস বলছিলো। ছবির পরিভাষাটা আমি বুঝি না তেমন, তবে দারুণ যে হচ্ছে ছবিটা সেটা অসুবিধা হয় না বুঝতে।
অ্যামিয়াস ভিন্ন মানুষ ছবি আঁকার সময়। তর্জন-গর্জন, আর্তনাদ, বেপরোয়া গালাগালি করতো, তুলি-টুলি ছুঁড়ে কখনো কখনো ফেলে দিতো, কিন্তু সে যে সুখের জগতে ডুবে আছে মনে মনে এটা বোঝা যেতো।
