অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেন একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন, এ ধরনের কাজ আমার পক্ষে খুবই খারাপ ছিলো এ বিষয়ে সন্দেহ নেই কোনো। অবাধ্য হয়ে উঠেছিলাম ভীষণ আমি। কিন্তু এখন সে কথা বলা নিষ্প্রয়োজন। তার কি প্রভাব পড়েছিলো ক্যারোলিনের ওপর তাই নিয়েই তো আলোচনা করছিলাম। আমরা মনের মধ্যে একবার সেই যে হিংসের ভাব জেগেছিলো ক্যারোলিনকে তার স্মৃতি সচেতন করে রাখতো সব সময়ে যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় ঐ ধরনের ঘটনার। এবং সতর্ক প্রহরায় নিজেকে রাখবার নিজস্ব পদ্ধতিও সে বের করে নিয়েছিলো। একটা হলো সেই পদ্ধতির মধ্যে ভাষার অসংযম। ও মনে করতো আমার ধারণা যে মনের রাগটা যদি প্রকাশ করে নেয় ভাষার মধ্য দিয়ে তাহলে কাজের মধ্য দিয়ে তা করার আর দরকার পড়বে না। এবং পদ্ধতিটা যে কার্যকর সেটা তার নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই সে বুঝে নিয়েছিলো। ক্যারোলিনকে সেইজন্য মাঝে মাঝে বলতে শুনতাম এই ধরনের কথা, টুকরো টুকরো করে অমুককে কেটে আস্তে আস্তে ভাজবে ফুটন্ত তেলে। কখনো আমাকে বা অ্যামিয়াসকে বলতো, খুন করে ফেলবো তোমাকে, আমাকে চটালে। সহজেই এইভাবে সে ভীষণ রাগারাগি করে ঝগড়া করতো। ও নিজের চরিত্রের এই দুর্বলতার দিকটা জানতে এবং রাগটাকে ঝগড়াঝাটি করে ভিন্ন পথে চালিয়ে দিতো। প্রায়ই অবিশ্বাস্য ঘটনা নিয়ে অ্যামিয়াস আর ক্যারোলিন প্রচণ্ড ঝগড়া করতো।
হ্যাঁ, শুনেছি সে কথা। কুকুর-বেড়ালের মতো নাকি ওঁরা ঝগড়া করতেন, বললো পোয়ারো।
বললেন অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেন, ঠিকই করতো তবে বড় বাজেভাবে ব্যাপারটাকে আদালতে প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছিলো। ঝগড়া করতো ওরা, অকথ্য ভাষায় নিষ্ঠুরের মতো রাগ মেটাতে নিজেদের মনের আর যে ঝগড়াটাকে ওরা উপভোগ করতে একথা বোঝবার ক্ষমতা ছিলো না অন্যদের। অথচ আনন্দ পেতে ওরা, পেতেন অ্যামিয়াসও। ঐ ধরনের স্বামী স্ত্রী ছিলো ওরা। অভিনয় আর আবেগপূর্ণ দৃশ্য দুজনেই ভালবাসতো। সাধারণতঃ পুরুষেরা তা পছন্দ করে না, শান্তি চায় তারা। কিন্তু শিল্পী ছিলেন অ্যামিয়াস, উনি চিৎকার, চেঁচামিচি, ভয় দেখানো এমনকি আঘাত দিতে ভালোবাসতেন প্রচণ্ড। কিছু সামান্য হারালে বাড়ি তোলপাড় করে ফেলতেন। আর মনের মধ্যে এই সব করে রাগ বেরিয়ে যাবার একটা পথ খুঁজে পেতো। অবিশ্বাস্য মনে হলেও শুনতে এইভাবে অবিরাম ঝগড়া আর ভাব করার মধ্য দিয়ে ভীষণভাবে উপভোগ করতে জীবনটাকে অ্যামিয়াস আর ক্যারোলিন।
একটা অধৈর্যের ভাব ফুটে উঠলো অ্যাঞ্জেলার মধ্যে, যদি ওরা ওখান থেকে আমাকে তাড়াহুড়ো করে সরিয়ে না দিতো, ডাকতো সাক্ষ্য দিতে, আমি বলতাম এসব কথা।…তবে মনে হয় না আমার কথা বিশ্বাস করতে বলে। কিন্তু ঠিক এটাও সেদিন যে বলতে পারতাম এই কথাগুলোই, কোনো স্থিরতা তার ছিলো না। একটা চিন্তা মাথায় ছিলো এই ধরনের, ভাবিনি স্বপ্নেও কাউকে কোনো দিন বলতে পারবো।
দূরমনস্কভাবে পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে আবার অ্যাঞ্জেলা বললেন, যা বলতে চাইছি আমি নিশ্চয়ই তা বুঝতে পারছেন আপনি?
পোয়ারো জোরে জোরে মাথা নেড়ে বললো, বুঝতে পারছি স্পষ্ট আর আপনার কথাগুলো যে ঠিক অনুভব করতে পারছি সেটাও। এমনকিছু লোক আছে মতের মিল হওয়াটা যাদের কাছে খুব একঘেয়ে লাগে। নাটকীয়তার চমক তাদের জীবনযাত্রায় আনার জন্যে প্রয়োজন দেখা দেয় মতবিরোধ সৃষ্টি করার।
ঠিক তাই।
একটা কথা কি মিস ওয়ারেন জিজ্ঞেস করতে পারি, আপনার মনের ভাব তখন কি ছিলো?
অ্যাঞ্জেলা দীর্ঘশ্বাস চাপলেন, হতাশা আর বিভ্রান্তি। সে এক দুঃস্বপ্নের সময় গেছে। গ্রেপ্তার হলো ক্যারোলিন প্রায় তিনদিন পরে। আমার ঘৃণা, চাপা রাগ আর সবার ওপরে আমার ছেলেমানুষী ভাবটার কথা এখনও মনে আছে আমার। ভুল করে গ্রেপ্তার করেছে আমি ভেবেছিলাম। ঠিক হয়ে যাবে সবকিছু। আমার জন্যে ভীষণ ক্যারোলিন ভাবিত ছিলো, ও চাইত আমাকে এর থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে মিস উইলিয়ামসকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলো এক আত্মীয়ের বাড়ি। পুলিশ তাতে আপত্তি করেনি। তারপর ঠিক হলো যখন যে সাক্ষ্য দিতে হবে না আমাকে, সঙ্গে সঙ্গে বিদেশের স্কুলে তখন পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা হয়ে গেলো।
আমি অবশ্য একটুও যেতে চাইনি। বোঝানো হলো আমাকে যে মানসিক প্রচণ্ড ক্ষতি হবে ক্যারোলিনের যদি আমি থাকি সামনে। ফলে আমি বাধ্য হই চলে যেতে।
আবার একটু থেমে শুরু করলেন বলতে, মিউনিখে আমি চলে গেলাম। যেদিন বের হয় আদালতের রায়, তখন আমি সেখানে। ক্যারোলিনের সঙ্গে আমি দেখা করতে চেয়েছিলাম, যেতে দেয়নি ওরা। ক্যারোলিন এ ব্যাপারটায় বুঝতে ভুল করেছিলো।
ঠিক যে আপনি বুঝেছিলেন মিস ওয়ারেন একথা মনে করবেন না। ভালোবাসতেন খুব এমন একজন কাউকে দেখতে গেলে জেলখানায় কমবয়সী স্পর্শকাতর মেয়ের মনে ভয়ানক চাপ পড়তে পারতো।
হয়তো তাই।
হঠাৎ অ্যাঞ্জেলা উঠে দাঁড়ালেন, রায় বের হবার পর, আমাকে একটা চিঠি দিদি লিখেছিলো। আমি ওটা কাউকে দেখাইনি, তবে মনে করছি এখন আপনাকে দেখানো উচিত বলে। কী ধরনের মহিলা ছিলো ক্যারোলিন সেটা বুঝতে চিঠিটা সাহায্য করতে পারে। আপনি কার্লাকেও ওটা চাইলে দেখাতে পারেন। অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেন দরজা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে দাঁড়ালেন, আমার সঙ্গে আসুন, ক্যারোলিনের আমার ঘরে একটা ছবি আছে।
