আর এখন অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেনের সামনে বসে আছে পোয়ারো। শারীরিক বিকৃতি নিয়ে জন্মের কিছুকাল পর থেকেই হেয় হয়ে থাকতে হতো যাকে সবার সামনে। কিন্তু আজ সে আত্মবিশ্বাস এবং ধৈর্যের প্রতিমূর্তি। সেই অবাধ্য ছোট্টবেলার দুষ্টু মেয়েটি এখন অসাধারণ ধীশক্তিসম্পন্না, পরিণত হয়েছেন বিদূষী মহিলায়। মনে হলো পোয়ারোর খুব সুখী আর সফল মহিলা।
পোয়ারো খুব একটা পছন্দ করে না এই ধরনের মহিলাদের। নারীসুলভ সূক্ষ্ম কোমলতার মিশেল ঘটেছে তীক্ষ্ণবুদ্ধির সঙ্গে। পোয়ারো বেশ উদ্দাম, চঞ্চলা, ময়ূরীর মতো বর্ণাঢ্য মহিলাদের বেশ ভালোবাসে।
পোয়ারো কার্লা লেমারচেণ্টের সঙ্গে সংক্ষেপে সাক্ষাৎকারের বিবরণ বললো।
অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
সেই ছোট্ট কালা, এখানেও এসেছে না কি? ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে ওকে।
আপনি ওর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেননি, না?
উচিত ছিলো রাখা, রাখিনি, স্কুলে যাই আমি যখন, তখন ও চলে গিয়েছিলো কানাডাতে। মাঝে মাঝে দু-একবার বড় দিনের উপহার দেওয়া-নেওয়াই ছিলো একমাত্র যোগসূত্র আমাদের। ও নিশ্চয়ই এতদিনে খাপ খাইয়ে নিয়েছে কানাডার পরিবেশের সঙ্গে।
স্বাভাবিক এ রকম ধারণা করাটাই। নাম বদলানো, জায়গা পাল্টানো। নতুন জীবন, কিন্তু সব সময় তা হয় না বাস্তবে।
কার্লার সঙ্গে ধীরে ধীরে তার যোগাযোগ, মার চিঠি, ইংল্যান্ডে আসার উদ্দেশ্য পোয়ারো সব বললো।
একহাতে বিক্ষত গালটা চেপে একমনে ঘাড় কাৎ করে সব কথা শুনলেন অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেন, শান্তভাবে পোয়ারোর কথা শেষ হলে বললেন, ভালো কাজই করেছে কার্লা।
চমকে উঠলো পোয়ারো, এ ধরনের কথা সে এই প্রথম শুনলো। আপনি তাহলে কার্লাকে সমর্থন করছেন মিস ওয়ারেন?
নিশ্চয়ই। কামনা করছি ওর সাফল্যও। যা সাহায্য দরকার এর জন্যে আমি করবো। এ ব্যাপারে আমি নিজের থেকে কিছু করতে না পারার জন্যে নিজেকে অপরাধী মনে করি।
আপনি কি তাহলে মনে করেন একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না কার্লার ধারণাকে? ঠিক ওর ধারণাটা?
নিশ্চয়ই। ও কাজটা ক্যারোলিন করেনি। জানতাম আমি, সে কথা এখনও জানি।
আপনার কথা শুনে আমার খুব আশ্চর্য লাগছে। কথা বলেছি যার সঙ্গে, প্রত্যেকে তারা…।
অ্যাঞ্জেলা বাধা দিয়ে দুম করে বললেন, কান দেবেন না ওসব কথায়। ভীষণ জোরদার যে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির সাক্ষ্য প্রমাণগুলো এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই আমার। কিন্তু আমার বিশ্বাসের মূলে আছে দিদি সম্বন্ধে আমার ধারণা। তাকে যতোদূর আমি জেনেছি, ওকাজ করতেই পারে না দিদি।
অতো জোর দিয়ে কি মানুষ সম্বন্ধে একথা বলা যায়?
হয়তো অনেক ক্ষেত্রে যায় না। অনেক রকমের চমক থাকে যে মানুষরূপী প্রাণীদের মধ্যে এ বিষয়ে আমি একমত আপনার সঙ্গে। কিন্তু বিশেষ কারণ আছে ক্যারোলিনের ক্ষেত্রে যে কারণগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারি আমি।
অ্যাঞ্জেলা গালের দাগটা দেখিয়ে বললেন, দেখছেন এটা? মনে হয় এর কথাও শুনেছেন?
মাথা নাড়লো পোয়ারো, হা, ক্যারোলিনের কাজ এটা। আর আমি নিশ্চিতভাবে এই জন্যেই জানি, জানি যে খুন করতে ও পারে না।
অন্যদের কাছে কিন্তু আপনার যুক্তিটা ধোপে টিকবে না।
ঠিক বলেছেন, লোকে উল্টো ভাববে বরং। এবং সেই ভাবেই ঐ ঘটনাকে কাজে লাগানো হয়েছিলো। বদ মেজাজী যে ক্যারোলিন তারই প্রমাণ হিসেবে বার বার বলা হয়েছিলো ঐ ঘটনার কথা। যেহেতু ঐভাবে আমার মত বাচ্চা মেয়েকে আঘাত করতে পেরেছিলো, তাই খুন করাটা অবিশ্বাসী স্বামীকে তারপক্ষে সমানভাবে সম্ভব।
সূক্ষ্ম পার্থক্যটা যে আছে আপনার বক্তব্যে সেটা আর কেউ না বুঝুক বুঝতে পারছি আমি। প্রচণ্ড রগচটা যারা প্রথমে তাদের পক্ষে বিষ চুরি করা, পরে ঠান্ডা মাথায় কাউকে পরের দিন বিষ খাওয়ানোর ব্যাপারটা সু-যুক্তির কথা নয় খুব একটা।
অধৈর্য হয়ে উঠলেন অ্যাঞ্জেলা পোয়ারের কথায়, বললেন, আমি আদৌ ও কথা বলতে চাইনি। খুব সহজ করে দাঁড়ান বুঝিয়ে বলি আপনাকে আমার বক্তব্য। আপনি মনে করুন একজন সাধারণ স্নেহশীল, দয়ালু মানুষ। আবার তীব্র ঈর্ষাও থাকতে পারে আপনার মধ্যে। মনে করুন এমন একটা সময় এলো আপনার জীবনে যখন সংযত করে রাখা নিজেকে কঠিন, এমন তখন হতে পারে যে আপনি রাগের বশে এমন কিছু করে ফেলতে পারেন যা পড়ে খুনের পর্যায়ে। আপনার মনে তখন যে দুঃখ, শোক, অনুশোচনা আসবে একবার তার কথা ভাবুন। সহজে ক্যারোলিনের মতো কাতর মহিলার পক্ষে নিষ্কৃতি পাওয়া কঠিন সেই দুঃখ আর অনুশোচনার হাত থেকে। এবং সে কখনো নিষ্কৃতিও পায়নি। আমি যে তখন একথা বুঝেছিলাম তা নয়, অতীতের কথা পরবর্তীকালে চিন্তা করে সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। সব সময়ে আমাকে আঘাত করার ব্যাপারটা ওকে দগ্ধ করতে অনুশোচনায়। ও যেন অনুশোচনার হাত থেকে কখনো রেহাই পায়নি। চিরকালের মতো মনের শান্তি হারিয়ে ফেলেছিলো। প্রতিটি ঘটনার মধ্যে আমার সঙ্গে তার ব্যবহারের সেই ভাবটা জড়িয়ে থাকতো সব সময়ে। ও অ্যামিয়াসের সঙ্গে আমার জন্যে ঝগড়া করতো। কখনো ও আমার দোষ ধরেনি। বরং ঈর্ষা বোধ করতাম আমিই। অ্যামিয়াসকে নানাভাবে উত্যক্ত করতাম। অ্যামিয়াসের বিছানায় একবার তো কাটাচুয়া রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু ক্যারোলিন প্রত্যেকবারই ঝগড়া করেছে। আমার হয়ে।
