পোয়ারো বললো, বোধ হয় আপনার কথাই ঠিক।
বোধ হয় না আমার কথাটাই ঠিক, মিস উইলিয়ামস বেশ জোর দিয়ে বললেন কথাটা।
কিন্তু একটা কথা, আরো একটু গুরুতর ব্যাপারটা। জানা শুধু নয়, ও চায় প্রমাণও যে ওর মা নির্দোষ।
বেচারী, করুণভাবে মিস উইলিয়ামস কথাটা বললেন।
আপনি তো ঠিক ঐ কথাটাই বললেন, তাই না মিস উইলিয়ামস?
ও তাই আপনি একটু আগে বলেছিলেন ভালো হতো ওর কাছে সত্যটা গোপন রাখলেই। তবে আমার মতে যা হয়েছে সবচেয়ে ভালো সেটাই। খুবই স্বাভাবিক মাকে নির্দোষ জানতে চাওয়াটা, আর সুস্পষ্টভাবে সত্যের স্বরূপ জানাটা যে বেশ কঠিন ব্যাপার তাও অজানা নয় আমার। তবে কার্লা নিশ্চয়ই আপনার কথানুযায়ী মনের জোর নিয়ে স্বীকার করে নেবে সত্যকে।
তাহলে সত্য এটাই যে এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই আপনার?
ঠিক মতো আপনার কথাটা বুঝতে পারছি না যে?
এমন কোনো ফাঁক-ফোকর কি আপনি দেখতে পান না যা দিয়ে নির্দোষ প্রমাণ করা যায় মিসেস ক্রেলকে।
সে রকম কোনো সম্ভাবনাকে আদৌ খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা তো করা হয়নি।
মহিলা তৎসত্ত্বেও ঐ আত্মহত্যা কথাটার ওপর জোর দিয়ে গেছেন বরাবর।
মিস উইলিয়ামস শুকনো গলায় বললেন, ওঁর তরফ থেকে এছাড়া আর বলার কিছু তো ছিলো না।
জানেন কি আপনি মিসেস ক্রেল মারা যাবার আগে যে চিঠিটা তার মেয়ের উদ্দেশ্যে লিখে রেখে গিয়েছেন, উনি তাতে নির্দোষ বলেছেন নিজেকে।
মিস উইলিয়ামস প্রায় কটমট করে তাকিয়ে বলে উঠলেন, উনি খুব অন্যায় কাজ করে গেছেন।
তাই কি মনে হয় আপনার?
হা, হয়। আপনিও দেখছি বেশিরভাগ পুরুষের মতোই বড় বেশি আবেগপ্রবণ।
অসন্তুষ্ট হলো পোয়ারো, আবেগপ্রবণ নই আদৌ আমি।
অনেকেরই তো মিথ্যা ভাবপ্রবণতা থাকে। একটা ঐ রকম পবিত্র মুহূর্তে কি মিথ্যে কথা ওরকম লিখতে পারে? না লেখা উচিত, দুঃখ লাঘব করা মনের মেয়ের, হা, তা হয়তো অনেক মহিলা করতে পারেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয় না মিসেস ক্রেল তা করতে পারেন বলে। সাহস ছিলো ওঁর, সত্যবাদী তো বটেই। মেয়েকে যদি বিচার না করার উপদেশ দিয়ে যেতেন তাহলে মনে হয় সেটাই ঠিক হতো আমার মতো।
পোয়ারো একটু রাগতভাবে বললো, যা লিখে গেছেন ক্যারোলিন ক্রেল তা সত্যি কি না একথাটা বিচার করে দেখতেও কি চান না আপনি?
নিশ্চয়ই চাই না।
অথচ স্বীকার করেছেন আপনি যে ওঁকে ভালোবাসতেন আপনি?
বাসতাম। আমার ওঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর স্নেহ ছিলো।
তাহলে…।
মিস উইলিয়ামস অদ্ভুতভাবে পোয়ারোর দিকে তাকালেন, মিঃ পোয়ারো বুঝতে পারছেন না আপনি, আমি কি বলি না বলি আজ এতোকাল পরে সেটার কি কোনো মূল্য আছে? ধরুন যেমন, ক্যারোলিন ক্রেল যে অপরাধী আমি তা জানি।
কি বললেন? পোয়ারো চমকে উঠলো।
সত্যি কথাটা। সত্যি কথাটা তখন চেপে গিয়ে ভালো করেছিলাম কি মন্দ করেছিলাম সে কথা অবান্তর, তবে এটা সত্যি চেপে গিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমার কাছ থেকে এ কথাটা স্পষ্ট জেনে যান যে ক্যারোলিন ক্রেল অপরাধী আমি জানি…।
.
দশম অধ্যায়
উ…উ..উ কেঁদে উঠলো এই ছোট্ট শুয়োরছানাটি–
পরিষ্কার দেখা যায় অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেনের ফ্ল্যাট থেকে রিজেন্টস পার্ক। হু হু করে হাওয়া আসছে খোলা জানলা দিয়ে, ভয়ংকর গাড়ী ঘোড়ার শব্দ না থাকলে মনে হতো বসে আছি কোনো গ্রামাঞ্চলে।
পোয়ারো দরজা খোলার শব্দ পেয়ে মুখ ফেরালো জানলা থেকে, অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেন ঘরে ঢুকছেন।
পোয়ারো এর আগেও অ্যাঞ্জেলাকে দেখেছে। অ্যাঞ্জেলার বক্তৃতা শুনেছে রয়াল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটিতে। নীরস কিছু বিষয়টা হলেও পাণ্ডিত্য আর সুন্দর অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেনের বক্তৃতা অসাধারণ করে তুলেছিলো সেদিনের পরিবেশকে। নেই দ্বিধা, পুনরাবৃত্তি নেই, জটিলতা নেই বক্তব্যে, উল্টে সামান্য বিষয়কেই অসামান্য করে তোলার ক্ষমতা মানবিকতার ছোঁয়ায় মহিলার আছে। শিক্ষিত মনের এই ধরনের মানুষ খুব পছন্দ পোয়ারোর।
খুব কাছ থেকে আজকে দেখার পর মনে হলো পোয়ারোর ঐ কাটা দাগটা মুখে না থাকলে অ্যাঞ্জেলাকে অসাধারণ সুন্দরী বলা যেতে পারে। নিখুঁত সৌষ্ঠবের সঙ্গে অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোতে একটু শানিত ভাব আছে। চওড়া কাঁধটা আর কিছুটা পুরুষালি হাঁটার ভঙ্গীটা।
এমন কিছু নিশ্চয়ই নেই অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেনের মধ্যে যা দেখে মনে হতে পারে উউ করে কাঁদতে পারে এই ছোট্ট শুয়োর ছানাটি। কিন্তু ক্ষতচিহ্ন ডান গালের, কুঁচকানো দাগ পাশের চামড়াতে, খানিকটা বিকৃতি ডান চোখটার, বেশ খানিকটা সব মিলিয়ে সৃষ্টি করে রেখেছে বীভৎসতা। কেমন যেন মনে হলে পোয়ারোর, দীর্ঘদিন ধরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার ফলে মহিলা সম্পূর্ণ উদাসীন নিজের বিকৃতি সম্বন্ধে। তদন্ত করতে গিয়ে এই ব্যাপারে যে পাঁচজন সম্বন্ধে কেন্দ্রীভূত হয়েছে তার আগ্রহ, প্রথম জীবনে তারা বেশ ভালোভাবে শুরু করলেও তেমন কোনো কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করতে পারেননি পরবর্তী জীবনে। শুধু ব্যতিক্রম অ্যাঞ্জেলা। ধরা যাক প্রথমেই এলসা গ্ৰীয়ার, রূপ যৌবন, সম্পদ তার কোনো কিছুরই অভাব ছিলো না। অথচ কীটদৃষ্ট কুঁড়ির মতোই অকালে ব্যর্থ হয়ে গেছে তার জীবন যৌবন। এরপর সিসিলিয়া উইলিয়ামস আসে, তার কোনো অহংকার নেই পার্থিব ধনসম্পদের। অথচ ভিক্টোরিয়ার আমলের শিক্ষা-দীক্ষায় মানুষ। এ বিষয়ে কোনো আক্ষেপও নেই সিসিলিয়ার মনে। সব সময় তিনি কর্তব্যে অটল, মনে ঈর্ষা, অসন্তোষ বা দুঃখ নেই কিছুই। উল্টে এমন মানসিকতা নিয়ে অনীহা দূরের কথা জীবন সম্বন্ধে যেন একটু কমেনি সব কিছুকে ভালোবাসার আগ্রহ।
