আচ্ছা, যখন স্কুলে পাঠানোর কথা হয়েছিলো ওকে নিশ্চয়ই আপনি বাধা দিয়েছিলেন? প্রশ্ন করলো পোয়ারো।
মিঃ পোয়ারো আদৌ না। বরং প্রস্তাবটাকে আমি পুরোপুরি সমর্থন করেছিলাম। …ব্যাপারটা স্পষ্ট করে বলি আপনাকে। অত্যন্ত ভালো ছিলো অ্যাঞ্জেলা মেয়েটি। মন ওর খুব ভালো ছিলো, তবে সে চলতো একটু ঝোঁকের মাথায়। আর অবাধ্য ছিলো বড় বেশি, তবে কোনো কিছু মেনে চলতে চায় না ওই বয়সটাই তো। মেয়েরা কৈশোর আর যৌবনের সন্ধিক্ষণে খুব অস্থির থাকে নিজের সম্বন্ধে। তাই ছিলো অ্যাঞ্জেলাও, সে কখনো গম্ভীর আর পর মুহূর্তেই দুষ্টুমি করে বেড়াচ্ছে বাচ্চার মতো। স্কুলে যাওয়াটা খুব ভালো এই বয়সে। নিজের মতো আরো অনেকের সংস্পর্শে এসে বেশ ভদ্র হয়ে ওঠে নিয়মশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। বাড়ির পরিবেশ নিশ্চয়ই অ্যাঞ্জেলার ভালো ছিলো না। মিসেস ক্রেল অতি আদর দিয়ে বিগড়ে দিয়েছিলেন মাথা। ফলে সব সময় অ্যাঞ্জেলাও তার দিদিকে ধরে থাকতো আঁকড়ে। আর মিঃ ক্রেল সহ্য করতে পারতেন না এই ব্যাপারটাই। মিঃ ক্রেল চাইতেন স্বামী হিসেবে স্ত্রীর সোল আনা ভালোবাসা নিজের একান্ত করে পেতে। মিঃ ক্রেলও খুব স্নেহ করতেন অ্যাঞ্জেলাকে এটাও ঠিক। সম্পর্ক এমনিতেই ভালোই ছিলো, মিসেস ক্যারোলিন ক্রেলকে নিয়ে ঝাট হতো। অভিযোগ করতেন অ্যাঞ্জেলা আর মিঃ ক্রেল দুজনেই অন্যজনের ওপর মিসেস ক্রেল পক্ষপাতিত্ব দেখাচ্ছেন। মিঃ ক্রেলও সব পুরুষদের মতো ছিলেন অত্যন্ত জেদী আর খেয়ালী, সবাই ওঁকে নিয়ে হৈহৈ করুক ওঁর ইচ্ছে। অ্যাঞ্জেলার সাথে মাঝে মাঝে ওর ঝগড়া লাগলে, মিসেস ক্রেল আগলাতেন তার বোনকেই। ফলে মিঃ ক্রেল আরও চটতেন। আবার অ্যাঞ্জেলা কেঁদেকেটে একাকার করে দিতে স্বামীকে সমর্থন করলে। কখনো কখনো মিঃ ক্রেলের বিয়ারে দুষ্টুমী করে মিশিয়ে রাখতো নুন, বিছানায় ছেড়ে দিত এক গাদা গুগলি শামুক। মিঃ ক্রেল শেষ ঘটনাটা ঘটার পর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন স্কুল বোর্ডিংয়ে অ্যাঞ্জেলাকে পাঠাতেই হবে। অ্যাঞ্জেলা আগে নিজের থেকেই বলেছিলো স্কুলে যাবার কথা, কিন্তু কান্নাকাটি শুরু করে দেয় এবারে খুব ভয় পেয়ে। স্কুলে পাঠাতে রাজী ছিলেন না মিসেস ক্রেল, আমি খুব করে বোঝতে দিলেন মত। অ্যাঞ্জেলারই যে ওতে মঙ্গল হবে একথা শোনার পর দক্ষিণ উপকূলের বিখ্যাত হলস্টন স্কুলে পাঠাতে মিসেস ক্রেল রাজী হয়েছিলেন। তবে প্রসন্ন ছিলেন
মনে মনে, আর তো পাগল হয়ে উঠেছিলো অ্যাঞ্জেলা। একটা চাপা রাগের স্রোত বইছিলো ওই তিনজনের মধ্যে, মানে ঐ ঘটনাকে নিয়ে।
তার মানে এলসা গ্ৰীয়ার? জানতে চাইলো পোয়ারো।
সঙ্গে সঙ্গে মিস উইলিয়ামস বললেন ঝাঝালো ভাবে ঠিক তাই। এবং ঠোঁট বন্ধ করলেন কথাটা বলেই।
আপনার কি ধারণা এলসা গ্ৰীয়ার সম্বন্ধে?
আদৌ আমার কিছু বলার নেই। সম্পূর্ণ নীতি-জ্ঞানহীন যুবতী মাত্র।
ছিলেন তো খুবই কম বয়সী? নিশ্চয়ই বোঝবার মতো বয়স ছিলো। কোনো অজুহাত ওঁর তরফ থেকে ছিলো না। থাকার কথাও নয়। মিঃ ক্রেলকে তো ভালোবাসতো মেয়েটি। মনে হয় আমার…
দুম করে কথার মাঝখানে বলে উঠলেন মিস উইলিয়ামস, তা প্রেমে পড়েছিলেন বটে। আমাদের হৃদয়বৃত্তি মিঃ পোয়ারো যাই হোক না কেন, ভীষণ জরুরী নিজের কর্মের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা। নীতিটিতির বালাই ছিলো না মেয়েটির। উনি একেবারেই ভেবে দেখেননি যে মিঃ ক্রেল বিবাহিত, নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন্যে নির্লজ্জের মতো ঠান্ডা মাথায় এগিয়ে চলেছিলেন। ঠিক মতো শিক্ষাদীক্ষা ওঁকে ছোটবেলায় দেওয়া হয়নি এছাড়া আর কোনো যুক্তিই তো খাড়া করা যায় না।
উনি নিশ্চয়ই মিঃ ক্রেলের মৃত্যুতে খুব আঘাত পেয়েছিলেন।
পেয়েছিলেন তা। তবে ওই মেয়েটিকেই দায়ী করা যায় সব কিছুর জন্য। খুন যে উনিই করেছেন তা বলছি না। তবে তাই দাঁড়ায় ব্যাপারটা। ইচ্ছাকৃতভাবেই কোণঠাসা করা হয়েছিলো ক্যারোলিন ক্রেলকে। আপনাকে ভোলাখুলি ভাবেই বলছি মিঃ পোয়ারো, আমার ইচ্ছে হতো মাঝে মাঝে খুন করে ফেলি দুজনকেই। অন্য মেয়ের স্ত্রীর সামনে প্রশ্রয় দেওয়া ঐ মেয়েটা বড় বেশি নির্লজ্জও ছিলো। অ্যামিয়াস ক্রেলের শাস্তিটা সত্যি কথা বলতে কি ঠিকই হয়েছিলো। যারা ঐ ধরনের ব্যবহার করে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে তাদের ঐ রকমই পরিণতি হয়।
দৃঢ়ভাবে কী আপনি বিশ্বাস করেন… মিস উইলিয়ামস ঝাঝালো গলায় বলে উঠলেন পোয়ারোর কথার মাঝখানে, দৃঢ়ভাবেই আমি স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটাকে বিশেষ মর্যাদা দিই। দেশের সমাজের অধঃপতন হয় এটা না করলে। সত্যি সত্যিই মিসেস ক্রেল ভীষণ ভালোবাসতেন স্বামীকে এবং কখনো অবিশ্বাসের কাজ করেননি। অথচ স্বামী তারই সামনে নিজের প্রেমিকাকে বাড়িতে এনে তুলছেন। যেন বড় বেশি চাপ দেওয়া হয়েছিলো স্ত্রীর ধৈর্য্যের ওপর, এবং স্বামীকে তার ফল ভোগ করতেও হলো।
আপনি ঠিক বলেছেন, কাজটা মিঃ ক্রেল ভালো করেননি, কিন্তু উনি যে একজন নামকরা শিল্পী তা মনে রাখতে হবে।
উইলিয়ামস গরগর করে উঠলেন রাগে, হা, হা জানি তা, সবাই আজকাল দেখাতে চায় এই অজুহাতটা। মদ খাওয়া, চেঁচামেচি করা, অসৎ হওয়া দাম্পত্য জীবনে এইসব বেহিসেবী বেলেল্লাপনার জন্যে সুন্দর পথ আর কি সাফাই গাইবার। যাই বলুন না কেন বিচার করলে সবকিছু জানা যায় উনি কী ধরনের শিল্পী ছিলেন। ওঁর ছবি নিয়ে দু-চার বছর হৈ হৈ করা যায়। আর নয় তারপর। আরে উনি ছবি আঁকতেই জানতেন না। ফ্লোরেন্সে আমি একসময় ছবি আঁকা শিখেছিলাম কয়েকবছর। আমি পরিচিত বড় বড় শিল্পীদের হাতের কাজের সঙ্গে। না…আর যাই বলুন মিঃ পোয়ারো আমায় মিঃ ক্রেলের ছবির প্রশংসা করতে বলবেন না।
