বুঝতে পারি কালার কথা বলার সময় সব কথা বলে উঠতে পারছি না ঠিকমতো। অপর পক্ষের কাছ থেকে মেয়েটার প্রসঙ্গ উঠলে তেমন সাড়াও পাই না, না মনে করিয়ে দেওয়া পর্যন্ত ঠিক মতো যেন না চিনতেও পারে। অথচ ঠিক নয় এটা তো। মেয়েটা এসব ক্ষেত্রে নিজে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তেমন না হলেও পারিপার্শ্বিকতার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষভাবে অপরিহার্য হয়ে ওঠে সবকিছুর মূলে। পরিত্যাগ করা স্ত্রীকে বা পরিত্যাগ করতে না চাওয়ার পেছনে নিজস্ব কারণ থাকতে পারে অ্যামিয়াস ক্রেলের কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদের সাধারণ ক্ষেত্রে খুব বড় হয়ে ওঠে বাচ্চা ছেলেমেয়ের প্রশ্নটা। অথচ মেয়েটাকে এক্ষেত্রে কেউ পাত্তাই দেয়নি, আমার কাছে এটা খুব আশ্চর্য মনে হয়েছে।
চট করে মিস উইলিয়ামস বলে উঠলেন, আপনি ঠিক মতো খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটাই ধরতে পেরেছেন। মিঃ পোয়ারো আপনি ঠিক বলেছেন। আর একটু আগে সেইজন্যেই আমি বলছিলাম যে ভিন্নতর পরিবেশে কার্লাকে পাঠিয়ে দেওয়াটা ভালই হয়েছিলো একদিক দিয়ে। সাংসারিক জীবনে বড় হবার পর একটা কিসের অভাব থেকে যেতো তা না হলে।
বেশ সতর্ক হয়ে একটু ঝুঁকে বসে আবার শুরু করলেন বলতে মিস উইলিয়ামস, কর্মসূত্রে স্বাভাবিক ভাবেই মা-বাবা আর ছেলেমেয়েদের দেখতে হয়েছে নানা সমস্যার দিক আমাকে। বহু ছেলেমেয়ে বরং বলা উচিত ছেলেমেয়েরা বেশির ভাগ মা-বাবার কাছ থেকে আদর শাসন পেয়ে থাকে মাত্রাতিরিক্ত। ওদের ওপর বড় বেশি নজরদারি করা হয়, আদরের অত্যাচার হয় বড় বেশি। তাই তারা এই স্নেহ বন্ধন থেকে নিজেদের মুক্তি চায়। অলক্ষ্যে থাকতে চায় সবার। আর তো কথাই নেই এক সন্তান হলে, তাদের বড় বেশি ক্ষতি করে ফেলে মায়েরা। স্বামীর সঙ্গে তারা ঠিক পরবর্তীকালে মানিয়ে চলতে পারে না, বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। বোধ হয় একটু অবহেলার মধ্যে মানুষ হলেই ভালোভাবে গড়ে ওঠে ছেলেমেয়েদের মনের স্বাস্থ্য। বড় পরিবারের মধ্যে এটা দেখা যায়, আর ততো ভালো নয় যাদের অবস্থা, সব সময়ে মা-বাবারা ব্যস্ত থাকেন কাজে, ভালোবাসারও ঘাটতি হয় না সন্তানদের প্রতি।
আবার আছে অন্যদিকও। দেখা যায় অনেক সময় নিজেদের নিয়ে এমন ব্যস্ত থাকে। স্বামী-স্ত্রীরা যে সময়ই পায় না সন্তানের দিকে নজর দেবার। ছেলেমেয়েরা সে সব ক্ষেত্রে মনে করে যে তাদের পৃথিবীর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। মিঃ পোয়ারো একটা কথা কিন্তু মনে রাখবেন অবহেলার কথা আমি বলছি না, ধরা যাক মিসেস ক্রেলের কথা, সহজে দেখা যায় না ওরকম মা, ভীষণ ভালোবাসতেন কার্লাকে, তার যত্ন করতেন, দেখতেন খাওয়া-দাওয়া, খেলতেন, গল্প করতেন ওর সঙ্গে। অথচ অজ্ঞান ছিলেন স্বামী বলতে, সবচেয়ে বড় অংশটা স্বামীই তাঁর জীবন থেকে গ্রাস করে নিয়েছিলেন। যেন শুধু তার স্বামীর জন্য উনি বেঁচে থাকতেন আর নিজেকে স্বামীর মধ্যেই খুঁজে পেতেন। আবার একটু থেমে বললেন, মনে হয় আর যা পরে উনি করেছিলেন সেটা প্রমাণ করে আমার কথাই।
পোয়ারো বললো, ওদের মধ্যে তার মানে স্বামী-স্ত্রীর বদলে প্রেমিক-প্রেমিকার ভাবটাই থাকতো বড় হয়ে।
মিস উইলিয়ামস যেন এই ধরনের কথায় একটু অসন্তুষ্ট হলেন, হ্যাঁ চাইলে বলতে পারেন সে কথা। ভীষণ ভালোবাসতেন স্বামী-স্ত্রী দুজন-দুজনকে। তবে হাজার হোক স্বামীরা পুরুষ মানুষ তো।
যেমন করে ধনীরা বলশেভিক বলে, যেভাবে পুঁজিপতি বলে খাঁটি কমুনিস্টরা, ঠিক সেই রকম পুরুষ মানুষ কথাটা উচ্চারণ করলেন ঘৃণার সুরে সিসিলিয়া। আজীবন কুমারী থেকে গভর্নেস হিসেবে জীবন কাটিয়ে যাওয়ার ফলে তার যে অনীহা আছে পুরুষ জাত সম্বন্ধে এটা বোঝা যায় ঐ কথাটা শুনে।
পুরুষদের আপনি পছন্দ করেন না, না।
মিস উইলিয়ামস বিরস ভাবে বললেন, যা কিছু ভালো পৃথিবীর সব পুরুষদের ভোগে লাগে।
তবে চিরকাল তো আর এরকম চলতে পারে না।
পোয়ারো বললো মিস উইলিয়ামসের চরিত্রের গভীরতর দিকটা ভালোভাবে বোঝাবার জন্যে, আপনি আমিয়াস ক্রেলকে পছন্দ করতেন না?
করতামই না পছন্দ তো, বরদাস্ত করতাম না মিঃ ক্রেলের আচরণও। বহুকাল আগেই ওঁর স্ত্রী হলে আমি ছেড়ে ওঁকে চলে আসতাম। ব্যাপার আছে কতগুলো যা মেনে নিতে পারে না মেয়েমানুষেরা।
কিন্তু মেনে নিয়েছিলেন মিসেস ক্রেল তো?
হা।
তবে উনি কি ভুল করেছিলেন? হা করেছিলেন। মেয়েমানুষের কিছুটা আত্মসম্মান থাকা উচিত, সহ্য করা যায় না অপমান।
মিসেস ক্রেলকে কি আপনি এই ধরনের কোনো কথা বলেছিলেন?
না। আমার সেরকম কোনো অধিকার ছিলো না। আমায় চাকরী দেওয়া হয়েছিলো অ্যাঞ্জেলাকে পড়াবার জন্যে মিসেস ক্রেলকে উপদেশ দেবার জন্যে নিশ্চয়ই নয়।
আপনার পছন্দ হতো মিসেস ক্রেলকে?
ভালোবাসতাম ভীষণ, গলার সুর কেতাদুরস্ত দক্ষ গভর্নেসের নরম হয়ে এলো, ফুটে উঠলো স্নেহ ভালোবাসার আদ্রা। ওঁকে ভীষণ ভালোবাসতাম, ভীষণ দুঃখও হয়।
আপনার ছাত্রীকে–অ্যাঞ্জেলা ওয়ারেন?
যতো ছাত্রী ছিলো আমার তাদের মধ্যে ও সবার সেরা ছিল। বুদ্ধিমতী খুব, একটু রগচটা, বেপরোয়া, ওকে অনেক ব্যাপারে মনের মতো চালোনা করে যেতো না। তবে অমন অসাধারণ মেয়ে চরিত্রের দিক দিয়ে দেখা যায় না।
আবার বললেন একটু থেমে, সব সময়ে আমার আশা ছিল বিরাট একটা কিছু করবে। এবং করেওছে। ওর সাহারা সম্বন্ধে লেখা বইটা কি আপনি পড়েছেন? অ্যাঞ্জেলা ফাইয়ুমে খোঁড়াখুঁড়ি করে আবিষ্কার করেছে কিছু প্রাচীন সমাধি মন্দিরও। আমার গর্ব হয় এর জন্যে। অ্যাল্ডারবেরিতে আমি ছিলাম মাত্র আড়াই বছর। ঐটুকু সময়ের মধ্যে মনে হয় পুরাতত্ত্ব সম্বন্ধে আমি ওর আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে পেরেছিলাম।
